ফাহাদের মায়ের সাথে দেখা না করেই পুলিশ প্রহরায় দ্রুত সটকে পড়লেন

নিহত বুয়েট ছাত্র ফাহাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তোপের মুখে বুয়েট উপাচার্য
এসপির নির্দেশনায় ধৈর্য্যরে পরিচয় দেয় পুলিশ

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের নির্যাতনে নিহত শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামের বাড়িতে ঢোকার সময় এলাকাবাসীর তোপের মুখে পড়েন বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। গতকাল বুধবার বিকেল ৪টা ৫০ মিনিটের দিকে ঘটনাস্থল  থেকে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যের পাহারায় দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন তিনি। এ সময় স্থাণীয় লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠলে পুলিশ, র‌্যাব সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতারা সবাইকে শান্ত থাকার আহবান জানান। আবরার ফাহাদের ছোট ভাই ও তার পরিবারের লোকজনের অভিযোগ পুলিশের কয়েকজন সদস্যের হামলায় আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ ও তার ফুফাতো ভাবী তমা আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শী পরিবার সূত্র জানায়, আবরার হত্যার দুইদিন পর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম। গতকাল বুধবার বিকাল চারটায় কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার রায়ডাঙ্গা গ্রামে আবরারের কবর জিয়ারত করতে যান তিনি। তার আগে বিকেল ৪টায় সড়ক পথে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউজে পৌঁছান। সেখান থেকে জেলা প্রশাসক মো: আসলাম হোসেন, পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারন সম্পাদক আজগর আলী, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতাসহ যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

বুয়েটের ভিসি আবরার ফাহাদের বাড়ির সামনে আসার আগেই কয়েক’শ নারী সেখানে অবস্থান নেয়। তারা আবরার হত্যাকারীদের ফাঁসি চেয়ে মিছিল করেন। ভিসি গাড়ি নিয়ে বাড়ি প্রবেশ করার সময় নারীদের বাঁধার মুখে পড়েন। এ সময় আবরার হত্যার প্রতিবাদ করেন তারা। নারীরা ভিসির কাছে জানতে চান, ৩৬ ঘন্টা পর কেন আপনি আবরারের বাড়িতে আসলেন, কেন জানাযায় গেলেন না’ এমন প্রশ্ন করে ভিসির গাড়ী ঘিরে ধরেন। এ সময় বিক্ষোভ প্রদর্শন ও জনগন উত্তেজিত হয়ে মারমুখী হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে শঙ্কায় পুলিশ ও র‌্যাবের পাহারায় ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।

তিনি চলে যাওয়ার সময় ভূয়া ভুয়া বলে মিছিল করে এলাকার লোকজন। কিছু সময় মিছিল করার পর এলাকার লোকজন শান্ত হয়ে যান। বিক্ষোভকারীরাও চলে যান। পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা চলে যায় এলাকা থেকে।

এসময় আবরারের বাবা তার সঙ্গে ছিলেন। এর আগে থেকেই পুলিশ ও র‌্যাব যৌথভাবে নিরাপত্তা বলায় তৈরী করেন বুয়েট উপাচার্যের আগমন উপলক্ষে। পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাঁদরে ঘিরে ফেলে। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের বিপুল সংখ্যাক নেতা-কর্মিও উপস্থিত ছিলেন। কবর জিয়ারত করে উপাচার্য কুষ্টিয়ার এসপি এস এম তানভীর আরাফাতকে সঙ্গে নিয়ে আবরার ফাহাদের গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। এসময় ফাহাদের ফুফাতো ভাবী তমা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিসিকে বহনকারী গাড়ী ভেবে পুলিশ সুপারের গাড়ির  গতিরোধ করে। পরে তিনি রাস্তার ওপর শুয়ে পরে বিক্ষোভ জানান। মহিলা পুলিশ সদস্যরা তাকে রাস্তার ওপর থেকে তুলে পার্শ্ববর্তী স্থানে রেখে আসেন। এরপর উপাচার্যকে প্রতিরোধ করতে রাস্তায় বিক্ষোভ শুরু করেন হাজারো নারী-পুরুষ। একপর্যায়ে উপাচার্যকে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন নিহত আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ। এসময় উৎসুক জনতার ভীড় সামাল দিতে কুষ্টিয়া জেলা ডিবি পুলিশের সাথে ধস্তাধস্তির মধ্যে পুলিশের এক কর্মকর্তার হাতের কনুইতে আঘাতপ্রাপ্ত হয় আবরার ফাহাদের ছোট ভাই আবরার ফায়াজ। এতে এলাকাবাসি ক্ষিপ্ত হয়ে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে। এসময় এলাকাবাসীর হাতে বিভিন্ন ব্যানার ফেস্টুন দেখা যায়। বিষয়টি ভিন্নভাবে উপস্থাপন করায় এলাকার লোকজন মারমুখী হয়ে উঠলে পুলিশ বাঁশি মেরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনে। এ সময় লোকজন আতঙ্কে দৌঁড় দেয়। পরে এলাকাবাসীর ক্ষিপ্ততায় পুলিশ ও র‌্যাবের সহযোগীতায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন বুয়েট উপাচার্য।

ভিসি কবর জেয়ারতের আগে ঈদগাহে অবস্থান করা আবরার ফাহাদের দাদা ও বাবার সাথে কথা বলেন। এ সময় তার দাদা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। ভিসির কাছে জানতে চান, আমার নাতিকে কারা মারলো, আমার নাতি খুব ভালো ছেলে, কেন তাকে মারা হলো। ভিসি এ সময় দাদাকে শান্তনা জানান। এ সময় এলাকার উত্তেজিত লোকজন ভিসিকে নানা প্রশ্ন করেন। ভিসি এ সময় এড়িয়ে যান এসব প্রশ্ন।

সাংবাদিকরা ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামকে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করেন। তিনি পদত্যাগ করবেন কি-না এ প্রশ্নের জবাবে বুয়েট ভিসি বলেন, এখন পদত্যাগের বিষয়ে কথা বলতে চাই না। আমি বুয়েট শিক্ষার্থীদের সবগুলো দাবির সঙ্গে একমত। এগুলো নিয়ে কাজ করছি। আমি না আসলেও কাজ করেছি। আমি শিক্ষকদের সাথে সভা করেছি। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই মোতাবেক কাজ করছি। ছাত্রদের সব দাবির সাথে আমি একমত। সব দাবি মেনে নেয়া হবে। কোন খুনি ছাড় পাবে না। সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময়ই এলাকাবাসী বিক্ষোভ শুরু করেন। তবে ব্যাপক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মুখে আবরার ফাহাদের মা রোকেয়া খাতুনের সাথে দেখা না করেই চলে যান তিনি।

ফাহাদের ছোট ভাই ফায়াজ অভিযোগ করেন, একজন পুলিশ কর্মকর্তা তার সাথে অসৌজন্যমূলক আচরন করেছেন। তার হাতের গুতোই আমার বুকে আঘাত লেগেছে। আমি এর প্রতিবাদ জানায়। আমার ভাই মারা গেছে, আমরা ব্যাথিত। এ ধরনের আচরন কাম্য নয়।’

আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল্লাহ বলেন, আমার ছেলে মারা গেছে। সে আর ফিরে আসবে না। ভিসির ভূমিকা আরো শক্ত হওয়ার দরকার ছিল। দেরিতে হলে তিনি এসেছেন এ জন্য তাকে ধন্যবাদ। তিনি আমাদের অতিথি। তবে সবার মধ্যে ক্ষোভ ছিল। এ থেকে কেউ কেউ নিজের ক্ষোভের কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে দায়িত্ব নিয়ে সব কিছু দেখছেন। তার ওপর আস্থা রয়েছে। আশা করছি আবরার ফাহাদের হত্যার কঠোর বিচার হবে।

পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন,‘ ভিসি আমাদের অতিথি। তাকে সম্মান জানানো উচিত ছিল। আবরার ফাহাদের মৃত্যুতে আমরা সবাই ব্যাথিত। এলাকার একটি মহল বুয়েটের ভিসি আসাকে ঘিরে পরিস্থিতি তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। তবে আইন-শৃংখলা বাহিনী ধর্য্যরে সাথে সব কিছু মোকাবেলা করেছে। পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত রয়েছে। আর পুলিশ কারো উপরই হামলা বা লাঠিচার্জ করেনি। এমন ঘটনা ঘটেনি। হুড়োহুড়িতে কেউ আহত হয়ে থাকতে পারেন।’

জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন বলেন, ভিসি আবরার ফাহাদের এলাকা থেকে ফিরেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। তিনি শহরে এসে আর কোথাও অবস্থান না করে ঢাকায় চলে যান।

আরো খবর...