ফলন বাড়াতে হাইটেক ও সফটওয়্যার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ ফসলের ফলন বাড়াতে বিজ্ঞানীরা সব সময়ই গবেষণা করে যাচ্ছেন। ফসলের ফলন বাড়াতে বেশির ভাগ সময়ই উন্নত জাতের কথা ভাবা হয়। কিন্তু তাতে খুব বেশি ফল পাওয়া যায় না। জার্মানির বিজ্ঞানীরা হাইটেক স্ক্যানার ও সফটওয়্যার দিয়ে নতুন পদ্ধতিতে শস্যের প্রজনন ঘটানোর উদ্যোগ শুরু করেছেন। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করে, আগামী দশকগুলোয় ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য খাদ্যের সংস্থান করতে হলে কৃষি উৎপাদন আরো অনেক বাড়াতে হবে। কিন্তু পরিবেশের ক্ষতি করে কৃষি উৎপাদন বাড়ানো চলবে না। অতএব, চাই এমন শস্য, যার উৎপাদন ক্ষমতা বেশি। জার্মানির বন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হাইনার গন্ডবাখ বলেন, ‘আমাদের ধারণা, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ৯০০ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে হবে। তার জন্য বছরে গড়ে কমপক্ষে ১ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে।’
উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ভিদ প্রজনন করতে আজকাল হাইটেক প্রযুক্তি কাজে লাগানো হয়। কারণ এমন শস্য শনাক্ত করতে হয়, যেগুলো সুস্থ এবং তাদের কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। শুধু সেগুলোই বেছে নিয়ে আরো প্রজনন করতে হবে। বন ইউনিভার্সিটির কৃষি বায়োলজিস্ট হেইনার গোল্ডবাক এ লক্ষ্যে ইঞ্জিনিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও কৃষি বিজ্ঞানীদের নিয়ে একটি দল তৈরি করেছেন। তাদের উদ্দেশ্য এমন এক সেন্সর তৈরি করা, যার সাহায্যে প্ল্যান্ট ব্রিডিং আরো দক্ষ ও দ্রুত করে তোলা সম্ভব। অধ্যাপক গোল্ডবাক বলেন, ‘ প্রজননের সময় সেন্সর বৈশিষ্ট্যগুলো দ্রুত সঠিকভাবে চিনতে পারে। মানুষও সেটা পারে বটে, কিন্তু ঘণ্টা দু-এক পর সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তখন ভুলের অবকাশ বেড়ে যায়, শস্যগুলোর মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ক্রটি ঘটে। কিন্তু সেন্সর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে সে কাজ সঠিকভাবে করে চলে। ফলে প্রজননের গতি বেড়ে যায়।’
পাতার রোগ যত দ্রুত সম্ভব শনাক্ত করতে গবেষকরা এক হাইপার স্পেকট্রাল ক্যামেরা ব্যবহার করেন। সেটি স্ক্যানারের মতো পাতার ওপর প্রতিফলিত আলো বিশ্লেষণ করে। ২১০টি আলাদা তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে তথ্য নিয়ে স্পেকট্রাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট তৈরি করা হয়। কৃষিবিজ্ঞানী ড. আনে-কাটরিন মালাইন পর্দার ডান দিকে হাইপার-স্পেকট্রাল ফলাফল দেখেন। ফলস কালার ডিসপ্লেতে হলুদ রঙের মাধ্যমে সুস্থ টিস্যু দেখা যায়। অন্যদিকে নীল-সবুজ রঙের অংশে পাতার রোগগ্রস্ত অংশ দেখা যায়। সফটওয়্যারের মাধ্যমে পাতার নানা রোগ পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা যায়। ভবিষ্যতে মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে শস্য ক্ষেতেও তা কাজে লাগানো যাবে। অধ্যাপক গোল্ডবাক বলেন, ‘এ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে আমরা প্রজননের অগ্রগতি আরো দ্রুত করে তুলতে পারি। অর্থাৎ এ মুহূর্তে নতুন করে কোনো প্রজাতির প্রজনন যদি ১০-১২ বছর লাগে, সেখানে আমরা সময়টা ২ বছর কমিয়ে দিতে পারি। ফলে আরো দক্ষতার সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারব।’
বায়োলজিস্ট বির্গিট ফ্রিকে এক হাইপার স্পেকট্রাল সেন্সর দিয়ে উদ্ভিদের ভেতরের অবস্থাও দেখতে পারেন এবং সুগার বিটের মেটাবলিজম ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে তথ্য পান। বির্গিট ফ্রিকে বলেন, পরিমাপের পদ্ধতি খুব সহজ। সূর্যের আলো পাতার ওপর পড়ে, তারপর তার প্রতিফলন ঘটে। উদ্ভিদ অসুস্থ হলে তার মেটাবলিজম বদলে যায়, যার ফলে প্রতিফলনের চরিত্রও বদলে যায়। সেন্সর তখন এই পরিবর্তিত প্রতিফলন ধরতে পারে। তখন শুধু সুস্থ উদ্ভিদ নিয়েই প্রজনন চালানো হয়। তাদের সহ্যশক্তি বাড়ানো হয়। বার্লি ও ধানের ক্ষেত্রেও এ প্রযুক্তি প্রয়োগ করা সম্ভব। উদ্ভিদের আকার বা একই জায়গায় কত উদ্ভিদ আছে, এক টেরেস্ট্রিয়াল লেজার স্ক্যানার তা মেপে দেখে। সেটি ক্ষেতের এক ত্রিমাত্রিক ছবি ফুটিয়ে তোলে।
কোলোন ইউনিভার্সিটির নোরা টিলি বলেন, বীজ বপনের সময় থেকেই স্ক্যানিং শুরু হয়। তখনো কিন্তু চারা গজায়নি। এর মাধ্যমে গোটা এলাকার একটা হাই-ডেফিনিশন মডেল পাওয়া যায়। প্রতি দুই সপ্তাহ অন্তর স্ক্যান করা হয়। এভাবে বিভিন্ন অবস্থার মধ্যে তুলনা করে উদ্ভিদের বৃদ্ধির হার স্পষ্ট বোঝা যায়। বিষয়টি একেবারে নিখুঁতভাবে মাপা সম্ভব। এর জন্য ক্ষেতের চারপাশে মাত্র চারটি বিন্দুর প্রয়োজন, যেখান থেকে পরিমাপ চালানো হবে। উচ্চতা বিচার করে সেরা উদ্ভিদ বাছা হবে, যার উৎপাদন ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।

আরো খবর...