প্রসঙ্গ ঃ মানবপাচার প্রতিবেদন

যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক বৈশ্বিক মানবপাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এক ধাপ অগ্রগতি হয়েছে। এই বছরের প্রতিবেদনে ‘টায়ার-টু ওয়াচ লিস্ট’ থেকে বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। গত বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ‘টায়ার-টু ওয়াচ লিস্টে’ ছিল। সেবারসহ ওয়াচ লিস্টে বাংলাদেশ ছিল টানা তৃতীয়বারের মতো। এ বছর সেই ওয়াচ লিস্ট থেকে  বেরিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড.  মোমেন বলেছেন, এটা আমাদের জন্য বড় একটি সুখবর। আমরা যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেদনে আরও এক ধাপ নিচে যাই, অর্থাৎ টায়ার থ্রিতে চলে যাই, তাহলে আমরা নানা সমস্যায় পড়ে যাবো। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এইড, ঋণ সুবিধা, সাংস্কৃতিক বিনিময় ইত্যাদি ক্ষেত্রে সমস্যা হয়ে যেত। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ মানবপাচার প্রতিরোধে সচেষ্ট। আমরা মানবপাচার প্রতিরোধে ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছি। সাতজন বিচারক এই ট্রাইব্যুনালে নিযুক্ত রয়েছেন। গত বছর ৪০৩টি মানবপাচার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩১২টি মামলা আমরা প্রসিকিউট করি। ২৫ জনের সাজা হয়। মানবপাচারে জড়িত থাকার জন্য প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ১৬২টি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স সাসপেন্ড করেছে। এটা স্বীকার করতেই হবে, সরকারের নানা ধরনের উদ্যোগ ও তৎপরতা সত্ত্বেও মানবপাচার কিছুতেই বন্ধ হচ্ছে না। সাগরপথে থাইল্যান্ড কিংবা মালয়েশিয়ায় মানবপাচার হচ্ছে। মানবপাচার হচ্ছে লিবিয়ায়। সম্প্রতি লিবিয়ার মিজদাহ শহরে ২৬ বাংলাদেশিসহ ৩০ জন অভিবাসীকে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি মামলা হয়েছে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। উল্লেখ্য, লিবিয়ার অপহরণকারীদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে বাংলাদেশ ও সুদানের অভিবাসন প্রত্যাশীরা স্থানীয় এক অপহরণকারীকে মেরে ফেলে। এর জেরে পরদিন মিলিশিয়ারা নির্মমভাবে বাংলাদেশের ২৬ জন অভিবাসীকে হত্যা করে। আহত হন আরও ১১ জন বাংলাদেশি। একই হামলায় লিবিয়ার মিলিশিয়াদের হাতে প্রাণ হারান আরও চার সুদানি নাগরিক। ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশে  দেশ ত্যাগ করা বেশকিছু বাংলাদেশি এখনো লিবিয়ার মানবপাচারকারীদের হাতে জিম্মি। তারা লিবিয়ার দুর্গম মরু এলাকায় রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ত্রিপোলিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, বিভিন্ন সময় এ ধরনের তথ্য আসে। এখনো কত বাংলাদেশি আটক, এটা নিশ্চিতভাবে জানা নেই। যেহেতু দুর্গম মরু এলাকা দিয়ে পাচারকারীরা  লোকজনকে নিয়ে যায়, তাই এ নিয়ে নিশ্চিতভাবে তথ্য জানতে সময় লাগে। আরও বাংলাদেশি আটকে থাকার বিষয়ে দূতাবাস খোঁজ নেবে। ঢাকার বাংলামোটরের একটি ট্র্যাভেল এজেন্সির মালিকসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ট্র্যাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক, কর্মচারী ও দালালরা ওই পাচারকারী চক্রে জড়িত। তারা ভালো বেতনের চাকরির ‘প্রলোভন দেখিয়ে’ বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভিকটিমদের লিবিয়ায় পাচার করে কম টাকায় কঠিন শ্রমে নিয়োজিত করত বলে অভিযোগ করা হয়েছে মামলার এজাহারে। সেখানে বলা হয়, লিবিয়ায় পাচারের পর বাংলাদেশি ওই দলটিকে এক জায়গায় জড়ো করে আটকে রাখা হয়। তারপর মিজদাহে ‘লিবিয়ান সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সহযোগিতায় অপহরণের নাটক সাজিয়ে’ বাড়তি টাকা দাবি করা হয়। টাকা আদায়ের জন্য ভিকটিমদের ওপর নির্যাতন চালায় পাচারকারীরা। পরে সেই অডিও এবং ছবি বাংলাদেশে স্বজনদের কাছে পাঠিয়ে আট থেকে দশ লাখ টাকা দাবি করা হয়। মানবপাচার বাংলাদেশের অন্যতম শিরঃপীড়ায় পরিণত হয়েছে। জল-স্থল-আকাশপথে প্রতিদিন মানবপাচার চলছে। মূলত জীবন ও জীবিকার কারণে, দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে, দারিদ্র্যের পীড়নে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। এসব মানুষের বেশির ভাগই প্রতারিত হচ্ছে, হচ্ছে সর্বস্বান্ত। অবৈধভাবে দেশের বাইরে যাওয়ায় বাংলাদেশের অনেক অভিবাসী মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছেন। চলাচলে সীমাবদ্ধতা, ঋণের চক্রে পড়া, জোরপূর্বক শ্রম, যৌন নির্যাতন, জোরপূর্বক বিবাহ এবং দাসত্বের মতো শোষণমূলক আচরণের শিকার হচ্ছেন অভিবাসীরা। দরিদ্র ও প্রান্তিক নারী ও পুরুষ এবং শিশুরাই মানবপাচারকারীদের লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছেন। আমরা মনে করি, মানবপাচার বন্ধ করতে হলে কোস্ট গার্ড, পুলিশ ও বিজিবিসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও নজরদারি বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনে বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সীমান্তের সক্ষমতা বাড়িয়ে, পাচার বন্ধ করতে হবে এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

 

 

 

আরো খবর...