প্রবৃদ্ধির বড়াই : কড়াইয়ে স্বাস্থ্য-কৃষি

এই প্রজন্ম কেন? শত বছরে দুনিয়াবাসীও দেখেনি এমন অর্থনৈতিক ধকল। করোনা মহামারী তা দেখিয়ে দিয়েছে। গত শতাব্দীতে দুই-দুটি বিশ্বযুদ্ধ, মহামন্দা, শীতলযুদ্ধ, টেররিস্ট দমনসহ কত কিছু দেখেছে! কিন্তু দুর্দশায় এমন নাজুক হয়নি। ওইসব বিপর্যয়েও মৃত্যু ভয়ে মানুষ এত বিচ্ছিন্ন-অসামাজিক হয়নি। করোনাযুদ্ধ মানবিক আবেগ-সম্পর্ক, ধারণা, প্রথা, এমনকি বিশ্বাসও ভেঙে ছারখার করে দিয়েছে। প্রাণহানির সঙ্গে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজেটের দেশ আমেরিকার অর্থনীতিতেও রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন, শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারত, এশিয়ার স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ জাপান, ইউরোপের শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ জার্মানি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্সÑ কাকে না খাদে  ফেলেছে? বাংলাদেশ এ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বাংলাদেশের অবস্থাটা আরও নাজুক। অসংখ্য মানুষ হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে পথে, ঘাটে, হাসপাতালের বাইরে, দরজায়, মেঝেতে, হুইলচেয়ারে, অ্যাম্বুলেন্সে, নিজের বাড়িতে, যেখানে- সেখানে মারা যাচ্ছেন। খুব অল্পসংখ্যক মানুষÑ যারা চিকিৎসার সুযোগ পাচ্ছেন, তারা মহাভাগ্যবান। এর মধ্যেই যথানিয়মে দিতে হয়েছে নতুন বাজেট। এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় বাজেট হলেও বাজেট বক্তৃতা বড় ছিল না। সীমিত বাজেট বক্তৃতায় এর বিশালত্বের পাশাপাশি দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে করোনাকালেও প্রবৃদ্ধি ৮.২-এর বড়াই। অবশ্য আগে থেকেই অর্থনীতির বেসামাল দশা ও করোনায় বেহাল অবস্থা সামলে ওঠা যাবে কীভাবে, তা নিয়ে ছিল জোর আলোচনা। এর ছাপই পড়েছে বাজেটে। এই মহামারীতে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট যা-তা ব্যাপার নয়!  গেলবারের চেয়ে এবার ৪৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজেট ঘোষিত হলেও ওই অনুযায়ী কৃষি, স্বাস্থ্য, জনসুরক্ষা, শিক্ষা, গবেষণা, কর্মসংস্থান খাতে উলে¬খযোগ্য বরাদ্দ বাড়েনি। বেড়েছে জনপ্রশাসন, সুদ পরিশোধ, সামরিক, আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে। এই চার খাতে মোট বাজেটের ৪২ দশমিক ২ শতাংশ টাকা ব্যয় হবে। আর শিক্ষা ও প্রযুক্তি, কৃষি, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তাÑ এ চারটি প্রধান খাতে ব্যয় হবে ৩১ দশমিক ১ শতাংশ টাকা। বরাদ্দের নমুনাতেই রাষ্ট্রের নেক নজরস্থল স্পষ্ট। করোনা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ভেতরের অবস্থাকে দিগম্বর করে দিয়েছে। এ কারণে এ খাতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের তাগিদ আসছিল বাজেটের আগ থেকেই। কিন্তু বাস্তবে সেটি হয়নি। বেড়েছে সামান্য কিছু। গেলবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ছিল ২৩ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এবার হয়েছে ২৯ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। অথচ স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আলোচনা বেড়েছে শতভাগের চেয়ে বেশি। এর পরও যে বরাদ্দ  দেওয়া হয়েছে, সেটি স্বাস্থ্য খাতের কোন অংশে যাবে? ওই প্রশ্ন থেকেই যায়। ন্যূনতম বুঝজ্ঞানের মানুষ মাত্রই জানে, এ বরাদ্দের বেশিরভাগই যাবে ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ানদের বেতন ভাতায়। চিকিৎসা ব্যয়ের ১০০ টাকার মধ্যে ৬৮ টাকাই আসে জনগণের পকেট থেকে। রোগীর সঙ্গে ডাক্তারেরও করোনায় মৃত্যু ও ডাক্তারসহ বহুসংখ্যক চিকিৎকর্মীর আক্রান্তের মধ্য দিয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রকৃত অবস্থাটাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেছে। বাংলাদেশে ৩ হাজারের বেশি মানুষের জন্য ডাক্তার একজনেরও কম। ১৮ কোটি মানুষকে সেবা দিতে সরকারি হাসপাতাল ছয়শরও কম। করোনা সংক্রমণের পর  থেকে দুই-চারজন করে এখন বহুসংখ্যক ডাক্তার-নার্স সংক্রমিত। অনেকে  কোয়ারেন্টিনে। আইসোলেশনে থাকার সংখ্যাও কম নয়। এর মধ্যেই সংক্রমণ বাড়ছে, ডাক্তার কমছে। এরই মধ্যে অর্ধশতের  বেশি ডাক্তারের জীবন কেড়ে নিয়েছে ঘাতক করোনা। মৃত্যু, আক্রান্ত, চিকিৎসা, সুস্থ করে তোলার প্রচুর কেস স্টাডি এখন ডাক্তারদের হাতে। নতুন অভিজ্ঞতায় ভরপুর তারা। তথ্য-উপাত্তগুলো কম্পাইল করে তারা কি গবেষণায় যাবেন? একটু ভাববেন কেন বাংলাদেশে ডাক্তারসহ চিকিৎসাকর্মীরা এত বেশি আক্রান্ত হলেন? ইতালি, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ব্রাজিল করোনা রুখতে সাফল্য কেন দেখাতে পারেনিÑ সেটি নিয়ে দেশে  দেশে গবেষণা চলছে? বাংলাদেশ কেন সাফল্য দেখাতে পারেনি? সেটি নিয়ে ভাবনার দাবি রাখে। কিউবা-ভিয়েতনাম তা হলে কীভাবে পেরেছে? ভারত না পারলেও কেরালা রাজ্য কীভাবে পারল? তাদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের নিজেদেরও এ নিয়ে ভাবা দরকার। করোনার এই কঠিন সময়ে যেখানে স্বাস্থ্যসেবাকে প্রস্তুত রাখা দরকার, ওই সময় জনে জনে ডাক্তার আক্রান্ত হওয়া, হাসপাতাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা  দেশের জন্য খুব খারাপ বার্তা দিয়েছে। যে হারে ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হচ্ছেন- তা চলতে থাকলে সামনে কী অবস্থা হবে? চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ডাক্তার পাওয়াই কঠিন হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ যে আগে থেকেই দুর্নীতিগ্রস্ত, তা অতীতের নানা ঘটনায় প্রমাণিত। করোনার এই দুর্বিপাকে মাস্ক, পিপিই নিয়ে যা হচ্ছে- সেটি দুর্নীতির আরেকটা পর্ব মাত্র। কিন্তু এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর কোনো বার্তা নেই, বরং তা যেন বিভাগটির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। দুর্নীতির নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। কারোরই জানার বাকি নেই, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বাড়তি কামাইয়ের জায়গা। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর চাঁদকপাল। করোনার পরে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিল, স্বাস্থসেবা খাতে বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ অনেক বাড়ানো হবে। আশানুরূপ না বাড়লেও আগের বছরের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া কোভিড ১৯-এর জন্য জরুরি প্রয়োজন মেটাতে দশ হাজার কোটি টাকার একটা জরুরি ফান্ড রাখা হয়েছে। সমস্যা আসলে অন্য জায়গায়। ওই সমস্যা হলো স্বাস্থ্যসেবা খাতে অপচয়, দুর্নীতি। হাসপাতালগুলোয় আগের সরঞ্জাম খরিদের দুর্নীতির বিষয় শেষ না হতেই এলো পিপিই, মাস্কসহ সরঞ্জাম খরিদে অনিয়ম আর দুর্নীতির খবর। সেটির রেশ কাটতে না কাটতেই দেশের মানুষ অবাক হয়ে জানল স্বাস্থ্যসেবার জন্য ডেটাবেজ  তৈরিতে পুকুর চুরির খবর। তারা বুঝতে অক্ষম এই করোনা প্যান্ডেমিকে মানুষ  যেখানে চিকিৎসা না পেয়ে দিশাহারা, সেখানে এই বিভাগের লোকজন একের পর এক এমন অপকর্ম কীভাবে করে যেতে পারছে? স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ পাঁচগুণ বাড়ানো হলেই বা কী। কার লাভ? জনগণের নয়। লাভ হলো লুটেরা ঠিকেদার, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক, আমলা আর স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজনের। অনেকের মতে, সমস্যাটা মানসিক। রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের মনোজগতের সমস্যা। তাই রসিকতা করে কেউ কেউ জাতিসংঘ কর্তৃক করোনা মোকাবিলায় মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রসঙ্গে গুরুত্বারোপের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। রাষ্ট্রীয় যে কোনো পরিকল্পনায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতকে প্রধান্য দিয়ে যে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস। আমাদের কৃষি খাতও কড়াইয়ে ভেজে লুটে-পুটে খাওয়ার জুতসই খাত। করোনাকালে দেশের খাদ্য সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি কৃষক বাঁচাতে দ্বিতীয় অগ্রাধিকার খাতে উঠে এসেছে কৃষির অবদান। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। এখানে ভর্তুকি থাকবে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। সারের মূল্য অপরিবর্তিত রাখার পাশাপাশি প্রণোদনাও চলমান থাকবে কৃষি খাতে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বৈশ্বিক মহামারীর মধ্যেও দেশ খাদ্য সংকটে পড়েনি। গেল তিন মাসে অনাহারে থাকেনি দেশের কোনো অঞ্চলের মানুষ।  বৈশ্বিক এ দুরবস্থায় সীমিত আমদানি কার্যক্রমেও প্রয়োজন মিটিয়েছে এ কৃষি খাত। অবদানটা কৃষকদের। ১৭ কোটি মানুষের খাদ্য সংস্থান আর পৌনে ও  কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের খাত কৃষির জন্য এই বরাদ্দ কৃষির ভিত্তি শক্ত করবে, না আঘাত করবেÑ সেটি প্রশ্ন হয়েই থাকছে। বাজেটের কারণে চালের দাম কমার কথা। সেখানে ঘটছে উল্টোটা। বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে বিআর-২৮ চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ৬-৭ টাকা । মিনিকেট কেজিতে ৩-৪ টাকা। এক হিসাবে দেশে বর্তমানে কৃষি উপকরণ সহায়তাপ্রাপ্ত কার্ডধারী কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭। তাদের উপকরণ সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কৃষি খামার যান্ত্রিকীকরণে ৩ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কৃষি ভর্তুকি ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, কৃষি পুর্নঅর্থায়ন স্কিমে ৫ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব ও বরাদ্দকে মন্দের ভালো বলা যায়। বর্তমান সরকার ২০০৯ সাল থেকেই কৃষিতে ভর্তুকি দিয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিবছরই এ বিনিয়োগের পরিমাণ কমছে। লক্ষণটা খারাপ। এদিক- সেদিক বা নয়-ছয় কমলে তাও ভালো ফল দিতে পারে। কিন্তু পারে না ভাজাভাজি-লুটোপুটির কারণে। কৃষিতে দেওয়া বরাদ্দের অপচয়  রোধ হলে, দক্ষভাবে তহবিল ব্যবস্থাপনা হলে চিত্র অন্যরকম হতে পারত। বর্তমান স্বাস্থ্যগত সংকট মোকাবিলায় যে অস্থিরতা, অদক্ষতা, সক্ষমতার অভাব  দেখা যাচ্ছেÑ তা একদিনে হয়নি। এটা দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ফলাফল। যে বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হলো, সেটিকে অবশ্যই সাধুবাদ জানাই। তবে পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত করতে হবেÑ স্বাস্থ্য খাতের ব্যবস্থাপনার যে বেহাল অবস্থা, সেটির উন্নয়ন করা হচ্ছে। ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না ঘটলে এ বর্ধিত বরাদ্দ সত্যিকার অর্থেই কতটুকু কার্যকর হবে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। সংসদে বাজেট অধিবেশনে যে বিভিন্ন রকমের দাবি করা হচ্ছেÑ বিভিন্ন হাসপাতালকে কোভিড-১৯ হাসপাতাল হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে, আসলেই তারা প্রস্তুত কিনা? লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন।

 

আরো খবর...