প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের পৃথিবী বদলে গেছে

 ॥ মোহাম্মদ নজাবত আলী ॥

প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের বসবাস। গাছ-গাছালি, লতা-পাতা, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত, প্রকৃতির এক অপার মহিমা। এই প্রকৃতির মধ্যেই মানুষের বেড়ে ওঠা। কিন্তু এর মধ্যেই মানুষ  যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে প্রকৃতি না থাকলে মানুষ সে পরিবেশ পেত না। তাই প্রকৃতির মধ্যেই মানুষ বেড়ে ওঠে তার আপন স্বভাবে। তাই প্রকৃতির দিকে তাকানোর সময় পায়নি। কিন্তু সময় এখন প্রকৃতির। প্রকৃতি জানান দিচ্ছে তার আধিপত্য। মহামারি করোনার দাপটে প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের পৃথিবীর রূপ আজ বিবর্ণ। পৃথিবী বদলে গেছে। প্রকৃতি মানুষকে বাঁচার অধিকার এবং পরিবেশ দিয়েছে। খাদ্য সংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। মানুষ তার জীবন-জীবিকা নির্বাহের সব উপকরণ প্রকৃতি থেকেই পেয়ে থাকে। কিন্তু আমরা পরিবেশ ও প্রকৃতির সঙ্গে ভালো আচরণ করিনা কখনো। আমরা কখনো ভাবিনি প্রকৃতির কথা। কেননা মানুষ ছাড়া প্রকৃতির আরও সন্তান আছে তা আমরা কখনো ভাবিনি। পুকুর, নদ-নদী, পাহাড়-পর্বত সবকিছু মানুষ ধ্বংস করে দিচ্ছে। বর্তমানে পাহাড়ের বুকে কান্না নেই, নদীর চোখে-মুখে আনন্দোচ্ছ্বাস আর দুরন্ত বেগে ছুটে চলা। গাছ-পালা  কেটে বন উজাড় করে আমরা প্রাসাদ তৈরি করছি। কিন্তু কখনো ভাবিনি জলজ প্রাণীর কথা, কখনো ভাবিনি পাখির কথা। প্রকৃতির ওপর আমরা মানুষ অনেক অত্যাচার-নির্যাতন করেছি। প্রকৃতির ওপর মানুষ যে অবিচার করেছে প্রকৃতি আর কতদিন তা সহ্য করবে। মানুষ নিষ্ঠুর, স্বার্থপর। মানুষের মধ্যে মানবিকতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। আমরা নদী দখল ও বায়ুদূষণ করেছি। আমরা পাখির নীড় ভেঙেছি,  সে পাখি আজ মুক্ত আকাশে উড়ছে। আর আমরা ঘরবন্দি হয়ে জীবন রক্ষার চেষ্টা করছি। আমরা অর্থ, ক্ষমতার দাপটে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়েছি, সমাজ সভ্যতা ধ্বংস করতে ক্ষমতাধর মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের এত ক্ষমতা, এত দম্ভ, অহংকার আজ কোথায় গেল। এ অদৃশ্য শক্তির সঙ্গে পৃথিবীর সব অস্ত্র আজ অসাড়, অকেজো। বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র আজ একটি ক্ষুদ্র জীবাণুর বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না। মানুষ এত স্বার্থপর ও প্রকৃতির ওপর যে স্পর্ধা দেখিয়েছে সে প্রকৃতি আজ নীরব ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। প্রকৃতি তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখতে যা করণীয় তাই করবে এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম। প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের যে পৃথিবী সে প্রকৃতিকে আমরা ভালোবাসিনি। আপন করে নিইনি। প্রকৃতির মধ্যে আমরা বাস করি অথচ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করিনি। প্রকৃতি সে ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিশোধ নেবে এটা স্বাভাবিক। কোভিড-১৯ বা করোনা রহস্যময় এক অদৃশ্যময় জীবাণু থমকে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে। লকডাউনে গোটা বিশ্ব আজ অচল। ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থ-উপার্জনের ক্ষেত্র, মানুষের কর্মস্থল আজ স্থবির করে দিয়েছে করোনা। মানুষ এখন ঘরবন্দি। এমন অবস্থায় গোটা বিশ্ব হতবাক। কবির কবিতা  লেখা বন্ধ। মানুষ প্রাণ ভরে নিশ্বাস নিতে পারছে না। কিন্তু প্রকৃতি ঠিকই নিশ্বাস নিচ্ছে, নতুন করে সাজাচ্ছে আপন ভুবন। প্রকৃতি সাজুক তার আপন রঙে। আপনি আমি শুধু অপেক্ষায় আছি কবে আমরা মুক্ত হবো, কবে আমরা সচেতন হবো। প্রকৃতি বিষাক্ত পৃথিবীকে লকডাউন করে দিয়েছে। পৃথিবীর গতিকে থমকে দিয়েছে। এ লকডাউন আমাদের  মেনে নিতে হবে, ঘরবন্দি হয়ে থাকতে হবে এর কোনো উপায় নেই। এটাই প্রকৃতির খেলা, প্রতিশোধ। কিন্তু আমরা লকডাউন মানছি না। ঘরে থাকলে জীবিকা সংকট, বাইরে  গেলে জীবনের সংকট এমন অবস্থায় মানুষ জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে অথবা নানা অজুহাতে, ছলচাতুরিতে ঘরের বাইরে যাচ্ছে। সরকার ইতিমধ্যে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে লকডাউন শিথিল করেছে। পোশাক কারখানা খুলেছে। উপচেপড়া শ্রমিক ও মানুষের ঢল। এভাবে চললে এবং স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব না মানলে করোনার দাপট আরও বেড়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। তবে একদিন না একদিন এ ভাইরাস চলে যাবে; কিন্তু তার ক্ষতচিহ্ন থাকবে এ পৃথিবীতে। করোনা ইতিহাস হয়ে থাকবে। ছোট্ট একটি ভাইরাস যাকে খালি চোখে দেখা যায় না তার কী ক্ষমতা! এ যান্ত্রিক পৃথিবীতে প্রচন্ড অহমিকায়  বেড়ে ওঠা মানবজাতি অমানবিক আচরণ করেছে প্রকৃতির ওপর। অথচ প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানের ইতিহাস সুপ্রাচীন। প্রকৃতি ও মানুষ হাতে হাত রেখে চলেছে। এত কাছাকাছি থেকেও মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। তাই তো মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে এ অদৃশ্য শক্তি। করোনাভাইরাস প্রকৃতির মারণাস্ত্র। এ ভাইরাস স্থবির করে দিয়েছে পুরো বিশ্ব ও মানচিত্র। মানুষের শেকড় প্রকৃতির সঙ্গে জড়িত। এ শেকড় ছিঁড়ে পালানোর আমাদের কোনো পথ নেই। কিছুদূর গেলেও মুখ থুবড়ে পড়তে হয়। প্রকৃতিও মুচকি হেসে আমাদের অসহায়ত্ব  দেখে। ধরে নিতে হবে এটা আমাদের প্রকৃতির ওপর অত্যাচারের প্রতিদান। কেননা প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য আমরাই দায়ী। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে আমরা প্রতিনিয়ত প্রকৃতির ক্ষতিসাধন করে চলেছি। ফলে প্রকৃতির অবাধ ছুটে চলায় বারবার ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। আমরা ঘটা করে পরিবেশ দিবস পালন করি। এ খাতে বরাদ্দও রয়েছে। তবে হিসাব করলে দেখা যায় পরিবেশবাদী বা প্রকৃতিপ্রেমিক সচেতন নাগরিকদের কোনো ¯ে¬াগানই কাজে আসে না। নদী দখল, দূষণ, বন উজাড় করা, ইটভাটাসহ নানা কারণে প্রকৃতি রাজ্য দূষণে পরিণত হয়। দিন যতই যায় বায়ুদূষণের পরিমাণ ততই বেড়ে চলে। আমরা প্রকৃতিকে মেরে আরাম আয়েশে থাকতে চাই। বিলাসিতা করতে চাই। আমরা বুঝতে চাই না পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গোটা বিশ্বের পরিবেশকে সুন্দর করতে পারি। বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো ক্ষেপণাস্ত্র, মারণাস্ত্র তৈরি করে প্রতিপক্ষ, প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা দৃশ্যমান শত্রম্নকে ঘায়েল করে ভাবছি আমাদের কে দাবিয়ে রাখতে পারে? কিন্তু অদৃশ্য জীবাণুকে ধ্বংস করা বা তার বিস্তার রোধ করতে পারছে না শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। প্রকারান্তরে করোনার কাছে গোটা বিশ্ব অসহায়। খোদ আমেরিকায় করোনাভাইরাসকে আনকোরা ভাইরাস, যেটা মানুষের তেমন ক্ষতি করতে পারবে না বলে যে আস্ফালন করেছিল সেটা আজ মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে। সেই আমেরিকা আজ  কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের চেয়ে শীর্ষে। হায়রে! বোকা মানুষ। আমরা ভুলে যাই প্রকৃতি ক্ষুদ্র নয়, বরং মানুষই প্রকৃতির কাছে ক্ষুদ্র। আমাদের প্রকৃতির ভেতরেই বিচরণ করতে হয় বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিজ্ঞানীরা ঘুড়িস্বরূপ যত বড়ই আবিষ্কার করুক না কেন সুতা তো প্রকৃতি বা বিধাতার হাতে। তাই বিধাতাই জানেন ভবিষ্যতে কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। আমাদের অবিবেচনা প্রসূত কর্মকান্ড যেন আমাদের ক্ষতি ও সর্বনাশের কারণ হয়ে না দাঁড়ায় সেটাই আমাদের মূল চিন্তা হওয়া উচিত। করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর কোনো স্থান, কাল, পাত্রভেদ নেই। ধর্ম, বর্ণ নেই। কেননা করোনার হাত থেকে  কোনো ধর্মের মানুষই রেহাই পাচ্ছে না। কী হিন্দু, কী মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান। কোনো দেশই করোনামুক্ত নয়। সব ধর্মের মানুষ ও গোটা বিশ্ব আজ করোনার কাছে হার  মেনেছে। করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে গোটা বিশ্ব হিমশিম খাচ্ছে। হিমশিম খাচ্ছে ডাক্তার, নার্স তথা স্বাস্থ্যকর্মীরা। তবে সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে- চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। শুধু চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীরাই নয়, পুলিশ সদস্য, সাংবাদিকসহ সমাজের সর্ব  শ্রেণি এবং পেশার মানুষ কেউই রেহাই পাচ্ছে না। কেউ  কেউ আক্রান্ত হচ্ছে আবার মারাও যাচ্ছে। তবুও চিকিৎসক, নার্স বা করোনা রোগের চিকিৎসায় সম্মুখ সারির যোদ্ধারা জীবন বাজি  রেখে চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছেন। স্বাস্থ্যকর্মী বা সংশি¬ষ্ট কর্মী বাহিনীর সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য পিপিই। কিন্তু এ পিপিই পর্যাপ্ত পরিমাণে সরবরাহ ও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিদিন  যেসব চিত্র ফুটে উঠছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে অথবা পিপিইর গুণগতমান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে সেগুলোর কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা নেই। সরবরাহকৃত কিছু পিপিই কেন স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রামণ থেকে রক্ষা করতে পারছে না তার সঠিক উত্তর আমাদের জানা নেই। করোনার হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু লকডাউন শিথিল করা নিয়ে বিজ্ঞ মহলে নানান প্রশ্ন  দেখা দিয়েছে। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে কীভাবে? পুলিশও অনেকটা নিষ্ক্রিয়। এমন অবস্থায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। আমাদের  দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যু  যেভাবে বাড়ছে তাতে এ পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই ভালো বলা যাবে না। তবে প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে সমগ্র পৃথিবী দূষিত হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য নেই। পৃথিবীর অনেক উন্নতি হয়েছে। আমরাও উন্নয়ন করেছি। কিন্তু প্রকৃতি, পরিবেশকে বাঁচিয়ে রেখে উন্নয়ন করতে হবে এ কথা আমরা ভুলে গেছি। আর সে ভুলেরই মাশুল দিতে হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, করোনাভাইরাস মানুষের তৈরি দুর্যোগ। মানুষের কারণে এ ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। চীনে উহান প্রদেশ থেকে এ ভাইরাস উৎপত্তি হয়ে গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র এ ব্যাপারে চীনকে দোষারোপও করে। তবে এখন দোষারোপের সময় নয়। বৈশ্বিক এ সমস্যা একক  কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তাই সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালকও একই কথা বলেন। বৈশ্বিক এ সমস্যা সমাধানের জন্য ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাস অনেকদিন থাকবে। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে এ সংক্রমণ বাড়ছে। যদি তাই হয় তাহলে করোনাপরবর্তী বিশ্ব হবে মানবজাতির জন্য বহুমাত্রিক হুমকিস্বরূপ। প্রকৃতির মধ্যে আমাদের অবাধ বিচরণ, অপ্রতিরোধ্য গতিতে চলা এবং আমাদের খামখেয়ালিপনায় রসে ভরা পৃথিবীর রূপ আজ বিবর্ণ। একদিন করোনা মহামারি থাকবে না সেটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। আবার স্বাভাবিক হবে আমাদের চলাচল। লাখো মানুষের মৃত্যু আমাদের স্বজন হারানোর দুঃখ, কষ্ট,  বেদনা প্রকৃতি তার আপন সত্তা দিয়ে অনুভব করছে। আবারও অতীতের মতো রূপ, রস, গন্ধে ভরপুর প্রকৃতি ও মানুষের সহাবস্থানে সুন্দর হয়ে উঠবে পৃথিবী। প্রতিটি সভ্যতা গড়ে উঠবে প্রকৃতির প্রকৃত বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করে, প্রকৃতিকে ধ্বংস করে নয়- এ শিক্ষা আমাদের নিতেই হবে। লেখক ঃ শিক্ষক ও কলাম লেখক।

 

আরো খবর...