পৃথিবীর সুস্থতার অপেক্ষায় মানুষ

 ॥ অঘোর মন্ডল ॥

অসুস্থ পৃথিবী। নোভেল করোনা ভাইরাসের ঘাত-প্রতিঘাতে তার সুস্থ হয়ে ওঠার আপাত লক্ষণ নেই। কোভিড যুগের বাসিন্দাদের করোনা ভাইরাসকে সঙ্গী করেই বাঁচতে হবে! কবে অবসান হবে এই যুগের? এই মুহূর্তে বিশে^র কঠিনতম প্রশ্ন। যার উত্তর বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার কর্তাদেরও জানা নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একটা কথাই বলছেন, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে পৃথিবীকে করোনামুক্ত করা যেতে পারে। তার আগ পর্যন্ত অসুস্থ পৃথিবী। তার অসুখ সারার ওষুধ নেই। তারই পারস্পরিকতায় এই পৃথিবীর মানুষও অসুস্থ। সংক্রমণ, শনাক্ত, মৃত্যু সুস্থ, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন,  ভেন্টিলেটর- কত শব্দ সাধারণ মানুষের মুখস্থ হয়ে গেছে এই  কোভিড যুগে। কিন্তু এই শব্দমালার অভিঘাতে মানুষের মস্তিষ্কে চিন্তা-দুশ্চিন্তা। এ রকম অবস্থায় মানুষের কাছে এখন খুব প্রার্থিত শব্দ একটাইÑ নেগেটিভ! হ্যাঁ, পজিটিভ শুনলেই মানুষের হৃদকম্পন থেমে যাওয়ার অবস্থা। করোনা ভাইরাসের এই সংক্রমণের সময় বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে বারবার বলা হচ্ছে, টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট সেই টেস্ট করার ক্ষেত্রে আমরা কী সাধারণ মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছি! সাধারণ মানুষ মানে দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের কথা বলছি। করোনা টেস্ট বিনা পয়সায় করানো যাবে না। হাসপাতালের বুথে গিয়ে ২০০ টাকা ফি দিলে তার পর টেস্ট। এতে হয়তো কিছু মানুষ টেস্ট করাতেই গেলেন না। কিন্তু তারা যদি সংক্রমিত হয়ে থাকেন, তা হলে? তারা তো আরও কয়েকশ মানুষকে সংক্রমিত করবেন! সেটা কি করোনাকালে জনস্বাস্থ্যের জন্য কল্যাণকর কোনো বার্তা বয়ে আনবে? মোটেও না। যাদের পয়সা আছে তারা দুইশ কেন, দুই হাজার টাকা ফি হলেও টেস্ট করাবেন। করানোর সামর্থ্য তাদের আছে। কিন্তু সরকারকে তো গরিব মানুষগুলোর কথা ভাবতে হবে। সড়ক পরিবহনমন্ত্রী এবং ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অবশ্য সে কথাটা বলেছেন। তার এ চিন্তাটা অন্তত ইতিবাচক। কিন্তু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যারা চালাচ্ছেন তাদের কথা এবং কাজ সরকারকেই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলছে। করোনা চিকিৎসা দিতে ঢাকা মেডিক্যালের ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার বিল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে গণমাধ্যমে সমালোচনার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। যার ঢেউ জাতীয় সংসদেও আছড়ে পড়েছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘২০ কোটি টাকা খাওয়ার বিল! এটা একটু অস্বাভাবিক!’ এবং সরকার প্রধানের এটা বলাই স্বাভাবিক। তিনি সেটা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টা খতিয়ে  দেখার কথাও বলেছেন। কিন্তু সেদিনই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব কাজ ঠিকঠাক চলছে। গণমাধ্যমে সব সঠিক তথ্য আসছে না! ঢাকা মেডিক্যালের পরিচালক আবার সেই গণমাধ্যমকর্মীদের ডেকে বলেছেন, ‘ডাক্তাদের থাকা-খাওয়া নিয়ে অসত্য তথ্য এসেছে গণমাধ্যমে। ভালো কথা। সত্য তথ্যটা গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে তুলে দিলেই তো সব ভুল ভেঙে যায়।  দেশের মানুষ জানতে পারেন, আসলে ডাক্তারদের থাকা-খাওয়ার জন্য জনপ্রতি কত টাকা খরচ হয়েছে। একটা ডিমের দাম কত, দুই স্লাইস রুটির দাম কত, একটা কলার দাম কত, টিস্যুর দাম কত? কোন হোটেল কত করে রেখেছে। কত টাকায় একেকজন চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের থাকা-খাওয়ার জন্য কোন হোটেলের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল? তারা কত করে টেন্ডার দিয়েছিলেন? কর্তৃপক্ষ কত টাকা করে অনুমোদন দিয়েছে, সেই সঙ্গে হোটেলের বিলের কপি  দেওয়া হলে তাতে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার কথা; সংখ্যাটা ২০  কোটি না ২ কোটি। কোভিডকালে চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়ার টাকার অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে চিকিৎসদের জন্য কেনা সুরক্ষাসামগ্রী নিয়ে! এসব প্রশ্নে বিব্রত হচ্ছে চিকিৎসক সমাজ। যারা বৈশি^ক এই মহামারীর সময় দিন আর রাতের পার্থক্য বুঝে ওঠার সময় পাচ্ছেন না।  রোগীর সেবা দিতে নিজেরা আক্রান্ত হচ্ছেন। নাম লেখাচ্ছেন মৃত্যুর মিছিলে। তাদের থাকা-খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠল কেন? কারণ এটাই আমাদের সমাজব্যবস্থা। এখানে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা, সাম্যের বড্ড অভাব। এই সংকটকালেও সেটা প্রকট হয়ে ফুটে উঠছে। এসব প্রশ্ন যারা তুলেছেন তারা সমাজের শক্র নন। চিকিৎসকদের শক্র নন। রাষ্ট্র কিংবা সরকারেরও শক্র নন। হয়তো তারা সমাজের নিদ্রিত বিবেককে কিছুটা জাগিয়ে তুলতে চান। কিন্তু চাইলেই কি জাগানো যায়! কোভিড-১৯ কত বড় মহামারী  সেটা আক্রান্ত, মৃত্যুর পরিসংখ্যান দিয়ে এখন বিশে^ কাউকে  বোঝানোর দরকার পড়ছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই অদরকারি বিষয়টাও বারবার বলতে হচ্ছে আমাদের দেশে! বিশে^র অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চিকিৎসক-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মী বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন। মৃত্যুর মিছিলে যোগ দেওয়া চিকিৎসকের সংখ্যাটাও পতিদিন বাড়ছে এবং আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে! কিন্তু তাদের আক্রান্ত হওয়া নিয়ে স্বয়ং স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে বক্তব্য দিয়েছেন,  সেটা আরও বিপজ্জনক। সঠিকভাবে পিপিই-মাস্ক ব্যবহার না করতে পারার কারণে চিকিৎসকরা আক্রান্ত হয়েছেন! এটা কি যুক্তির জাল বোনা কোনো বক্তব্য হতে পারে? নাকি ঘুণে ধরা সমাজের প্রভাবশালী-ক্ষমতাবান কিন্তু বিবেকহীন কোনো মানুষের বক্তব্য! সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। এটাকে অবশ্য তথ্যমন্ত্রী বলেছেন ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’। শাসক দলের লোকজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এটাও এ দেশের রাজনীতির ঐতিহ্য। তবে করোনাকালে চিকিৎসকদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য যে মাস্ক কেনা হয়েছে, সেটা ক্রমেই বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। যে কারণে দুর্নীতি দমন কমিশন তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেটা পরের ব্যাপার। কিন্তু মাস্ক কেনাকাটায় দুর্নীতির প্রমাণ না মিললেও জনমানসে সন্দেহের যে ছায়া পড়েছে, তা চট করে সরে যাবে না। ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দুর্নীতি-অনিয়মের অভিঘাত যদি মানুষের মনে আছড়ে পড়ে, তাতে বেশি বিব্রত হয় শাসক দল। চিকিৎসকদের থাকা-খাওয়া, মাস্ক কেনা, ত্রাণের চাল চুরিÑ এসব খবর যখন শিরোনাম হয়ে যায়, তাতে দলের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, সেটা বুঝতে সময় লাগেনি প্রধানমন্ত্রীর। তাই বাজেট অধিবেশনে তিনি নিজেই বিষয়টা খতিয়ে দেখার কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে এটা প্রত্যাশিত। স্বাধীন দেশের বয়স তিন বছর পার হতে না হতেই এ দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছিলেন, ‘… চরিত্রের পরিবর্তন অনেকের হয় নাই। এখনো ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরাকারবারি, মুনাফাখোরি, বাংলার দুঃখী মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত এদের আমি অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, হুমকি দিয়েছি।  চোরা নাহি শুনে ধর্মের কাহিনি। কিন্তু আর না…।’ বঙ্গবন্ধুর এই কথা এখনো আমাদের সামাজের জন্য সমকালীন বক্তব্য মনে হয়। বঙ্গবন্ধুর কথায় শুধু স্বাধীনতা-উত্তরকালে আমাদের রাষ্ট্র-সমাজের  চেহারা বেরিয়ে পড়েছিল, তা নয়। এখনো এ সমাজে দরিদ্র মানুষকে অনেকে মানুষ মনে করে না। দিনে দিনে তারা সমাজের বস্তুতে পরিণত হচ্ছে। গরিব মানুষের কথা ভেবে সরকার ত্রাণ দিল। চাল দিল। ডাল দিল। সেটা সরকারদলীয় জনপ্রতিনিধি চুরি করলেন। সেই চোরের সংখ্যা যদি শ’খানেকও হয়, তাতে বঙ্গবন্ধুর কথাটাই ফিরে আসে। চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনি! বঙ্গবন্ধু এ  দেশটা দিয়েছেন বাঙালি জাতিকে। মেধা-মনের জোরে বাঙালি বিশে^ অনেক দূর এগিয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অনেক স্বীকৃতিও মিলেছে। কিন্তু এই দেশের একজন মন্ত্রী যখন বলেন চিকিৎসকরা পিপিইর সঠিক ব্যবহার জানেননি বলে করোনা আক্রান্ত বেশি হয়েছেন! সেটা লজ্জার। দুঃখের। আমাদের মানবিক মূল্যবোধের দীনতার বহিঃপ্রকাশ। একজন চিকিৎসক নিজের মেধা আর মননের বিকাশ ঘটাতে কী পরিমাণ নিদ্রাহীন রাত পার করেন,  সেটা একজন হঠাৎ রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা কঠিন। আর এই উপলব্ধির অভাব যে কোনো সংকটকে আরও কঠিন করে তোলে। গোটা মানবসমাজে এই উপলব্ধির অভাবই আজ প্রকট। কোভিড আমাদের জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার কঙ্কাল চেহারাটা দেখিয়ে দিয়ে গেল। অনেকে বলতে পারেন, গোটা বিশে^ কোভিডের কোনো চিকিৎসা নেই। আপাতত তাই। কিন্তু অনেক দেশে স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। কেউ ভ্রান্তনীতি অনুসরণ করতে চাননি বলে।  কেউ নীতি নিয়ে সমালোচিত হয়ে। সংকটকালে দৃষ্টি অনেক পরিষ্কার হয়ে যায়। অনেকের চেহারা  বেরিয়ে পড়ে। রাজনীতিবিদ-জনপ্রতিনিধি, জনপ্রশাসনে থাকা সবার চেহারা কমবেশি  দেখে ফেলছে মানুষ। তবে এই বৈশি^ক বিপদে মানুষ আরও একটা জিনিস দেখে ফেলেছে। সেটা করোনা ভাইরাস বা  কোভিড-১৯ এর সৌজন্যে। সংক্রমণ এমন এক জিনিস, যা সম্পন্ন সমাজ থেকে অভাবী সমাজ সব জায়গায় ছড়ায়। গরিব-দরিদ্র মানুষের অসুস্থতায় ধনী সমাজেরও বিপন্নতা ডেকে আনে। মানুষ যদি আগামীতেও এই উপলব্ধির কথা ভুলে যায়, তা হলে সবচেয়ে বিপদে পড়বে সভ্যতা। কোভিড যুগ আজ হোক, কাল হোক একদিন  শেষ হবে। সেদিন পৃথিবীর বুকে মানুষকে যেন সভ্যতার স্মৃতিস্মারক নিয়ে বাঁচতে না হয়। সামাজিক বিভাজনের  রেখা  কোভিড কিন্তু প্রতীকীভাবে মুছে দিয়ে যাচ্ছে। মানুষ নিজেদের সীমাহীন স্বার্থপরতার জন্য সেখানে আবার বৈষম্যের দেয়াল না  তৈরি করে। আগামীতে আমাদের জনস্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাড়বে। কিন্তু জনপ্রতিনিধি আর জনপ্রশাসকরা কি কোভিড যুগের কথা মনে রাখবেন! আগামীর পৃথিবী তাকিয়ে থাকবে এই বৈশি^ক মহামারী  থেকে বিশ^নেতারাই বা কী শিক্ষা পেলেন, তা দেখার জন্য। লেখক ঃ সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

 

আরো খবর...