পিরামিড পদ্ধতিতে শিম চাষ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ দেশি শিম একটি গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন সবজি। যা বাংলাদেশে অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং দেশের সর্বত্রই বসতবাড়িতে ও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে। এ সবজিটি ভাজি, ভর্তা, তরকারি হিসেবে খাওয়া যায়। শিমের ভ্রণযোগ্য অংশ হলো কচি শুটি বা পড এবং পরিপক্ব বীজ যার উভয় অংশেই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন-সি, ক্যারোটিন বিদ্যমান বিশেষত প্রোটিনের সমৃদ্ধতা এবং আঁশজাতীয় উপাদান সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত শীতকালীন সবজি তবে ইদানীং গ্রীষ্মকালে এর চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। শিমের অঙ্গজ বৃদ্ধি ও প্রজনন পর্যায়ের জন্য তাপমাত্রা ও দিবস দৈর্ঘ্য যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। এ সবজির অঙ্গজ বৃদ্ধির জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এবং দীর্ঘ দিবস প্রয়োজন। আবার প্রজনন ধাপের জন্য নিম্ন তাপমাত্রা সংবলিত জলবায়ু এর সঙ্গে ছোট দিবস প্রয়োজন। লক্ষ্য করা যায় যে, শিম যখনই বপন করা হউক না কেন শীতের প্রভাব না পড়লে পুষ্পায়ন ঘটে না। তবে গ্রীষ্মকালীন জাত তাপ ও দিবস নিরপেক্ষ হওয়ায় বছরের যে কোনো সময় বপন/রোপণ করলে পুষ্পায়ন ঘটে। সব ধরনের মাটিতেই শিম জন্মে। তবে সুনিষ্কাশিত দোঁ-আশ ও বেলে দোঁ-আশ মাটি ভালো ফলনের জন্য উপযুক্ত।
বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় শিমের চাষ হয়। বৃহত্তর বরিশাল এলাকায় সর্জান ও ভাসমান পদ্ধতিতে শিমের চাষ হয়। যশোর এলাকায় গ্রীষ্মকালে শিমের বেড উঁচু করে, চট্টগ্রামে মাঠে ও জমির আইলে এবং রাস্তার পার্শ্বে বাঁশের কঞ্চি পুঁতে এর ওপর গাছ উঠিয়ে শিমের চাষাবাদ করা হয়। কিন্তু পাবনা জেলার ঈশ্বরদী, আটঘরিয়া ও চাটমোহর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় পিরামিড পদ্ধতিতে শিমের চাষাবাদ হয়। চাষিরা সাধারণত এপ্রিল মাসে (বৈশাখ) জমির মাটি কোদাল দিয়ে কেটে পিরামিড আকৃতির ঢিবি তৈরি করে। এরপর মৌসুমের প্রথম বৃষ্টি হলে অথবা বৃষ্টি হওয়া দেরি হলে চাষিরা কৃত্রিম উপায়ে ঢিবির ওপরের মাটি ভিজিয়ে ‘ ‘জো’ অবস্থায় এনে প্রতিটি ঢিবিতে ৭-৮টি করে বীজ বপন করেন। জাত হিসেবে ব্যবহার করে ‘রহিম’ (সবুজ) ও রূপবান (রঙিন)। চারা একটু বড় হলে ঢিবিতে ‘ডিবিং’ পদ্ধতিতে সার প্রয়োগ করে। গাছ যখন মাটির ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শুরু করে তখন মাচার ব্যবস্থা করা হয়। তবে চারাগাছ মাচায় ওঠা পর্যন্ত গোড়ার দিকে যেন না পেঁচাতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। গোড়া পেঁচাতে না দিলে গাছের বৃদ্ধি ও ফলন প্রায় ১০-১৫% বেশি হয়। শিমচাষের জন্য শতক প্রতি ৪০ কেজি গোবর সার, ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ৩৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমপি, ২০ গ্রাম জিপসাম এবং ২০ গ্রাম বোরিক সার প্রয়োজন হয়। লিগুমিনোসি পরিবারভুক্ত বিধায় এতে ইউরিয়া সার কম লাগে। কারণ লিগুমোনাস ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিকভাবে শিমের শিকড়ে নাইট্রোজেন নিবন্ধন করে থাকে। বীজ বপন বা চারা রোপণের ৪-৫ দিন আগেই জমিতে সম্পূর্ণ গোবর সার ও টিএসপি, ইউরিয়া ও এমপি সারের অর্ধেক মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হয়। বীজ বপন বা চারা রোপণের ২৫-৩০ দিন পর বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ও এমপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হয়। এতে সর্বদা আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। মাটির রস যাচাই করে ১০-১৫ দিন পর সেচ দিতে হবে। পুরাতন পাতা ও ফুলবিহীন ডগা/শাখা কেটে ফেলতে হবে।
ক্ষতিকর রোগ-বালাই ও প্রতিকার ঃ জাব পোকা :- জাব পোকা শিমের একটি প্রধান ক্ষতিকারক পোকা। অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রাপ্তবয়স্ক উভয় অবস্থাতেই গাছের নতুন ডগা, পাতা, ফুল, ফল ইত্যাদির রস চুষে খায় এবং গাছের বৃদ্ধি এবং ফলনে মারাত্মক ক্ষতি করে। সরাসরি ক্ষতি করা ছাড়াও এ পোকা মোজাইকজাতীয় ভাইরাস রোগ ছড়িয়ে রোগের বিস্তার ঘটিয়ে থাকে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ প্রাথমিক অবস্থায় আক্রান্ত পাতা ও ডগার জাব পোকা হাত দিয়ে পিষে মেরে ফেলা যায়। নিম বীজের দ্রবণ (১ কেজি পরিমাণ অর্ধভাঙ্গা নিম বীজ ১০ লিটার পানিতে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হবে) বা সাবান গোলানো পানি (প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২ চা চামচ গুঁড়া সাবান মেশাতে হবে) ¯েপ্র করেও এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কমানো যায়। লেডিবার্ড বিটলের পূর্ণাঙ্গ পোকা ও কীড়া জাব পোকা খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে দমন করে। সুতরাং উপরোক্ত বন্ধু পোকাগুলো সংরক্ষণ করলে এ পোকার আক্রমণ অনেকাংশে কম হয়। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শুধু আক্রান্ত স্থানগুলোয় কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি বিষ ক্রিয়া সম্পন্ন কীটনাশক, যেমন- ম্যালাথিয়ন ৫৭ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ২.০ মিলি হারে অথবা পিরিমর ৫০ ডিপি প্রতি লিটার পানিতে ১.০ গ্রাম হারে মিশিয়ে ¯েপ্র করতে হবে। ফল ছিদ্রকারী পোকা ঃ ডিম থেকে বের হয়ে কীড়া ফুল, ফুলের কুঁড়ি, কচি ফল ছিদ্র করে ভিতরে ঢোকে এবং ভিতরের শাঁস খেয়ে নষ্ট করে। ফলে এগুলো ঝরে পড়ে। আক্রান্ত শিম অনেক সময় কুঁকড়ে যায় এবং অসময়েই ঝরে পড়ে। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে শিমের ফলন মারাত্মকভাবে হ্রাস পেতে পারে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ প্রতি একদিন পর পর আক্রান্ত ফুল ও ফল হাত দিয়ে সংগ্রহ করে কমপক্ষে একহাত গভীর গর্ত করে পুঁতে ফেলতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন চাষাবাদ করা ও ঝরা ফুল, ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে নষ্ট করে ফেলা। আক্রমণের মাত্রা বেশি হলে কীটনাশক প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে বিষ প্রয়োগের দুই সপ্তাহের মধ্যে খাওয়ার জন্য কোনো শিম সংগ্রহ করা যাবে না।
এনথ্রাকনোজ বা ফলপচা রোগ ঃ পাতায় বৃত্তাকার বাদামি দাগ ও তার চারপাশে হলুদাভ বলয় দেখা যায়। পরিণত ফলে প্রথমে ছোট গোলাকার পানি ভেজা কালো দাগ পড়ে এবং দাগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। ফলে দাগের কিনারা বরাবর চারপাশে কালো রঙের বেষ্টনী দেখা যায়। কাঁচা অবস্থায় এ রোগের সংক্রমণ শুরু হয় এবং পাকার সময় ফলে বসানো দাগ দেখা যায়। পাকা ফল বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আক্রান্ত বীজ থেকে গজানো চারায় এ রোগ দেখা যায়। শুকানোর সময় শিমের খোসা কালচে দেখা যায়। বীজ মরিচা রং ধারণ করে। দমন ব্যবস্থাপনা ঃ রোগমুক্ত ভালো বীজ ব্যবহার করতে হবে। রোগে আক্রমণের শুরুতে ব্যাভিস্টিন/নোইন বা একোনাজল প্রতি লিটার পানির সঙ্গে ২.০ গ্রাম হারে প্রয়োগ করতে হবে।
ফসল সংগ্রহ ঃ জাতভেদে বীজ বপনের ৯৫-১৪৫ দিন পর শিমগাছ থেকে উঠিয়ে বাজার জাত করা যেতে পারে। ফুল ফোটার ২৫-৩০ দিনের মধ্যে শিম তোলার উপযুক্ত সময়। পাঁচ থেকে সাতদিন অন্তর গাছ থেকে শিম ওঠালে গুণগতমানসম্পন্ন শিম সংগ্রহ করা যায়।
লেখক ঃ প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, ঈশ্বরদী, পাবনা।

আরো খবর...