পল্লী উন্নয়ন, শিক্ষা বিস্তার ও মানবসেবায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শীর্ষপুরুষ রবীন্দ্রনাথ এক অপার বিস্ময়ের নাম। বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি পসাপানে রয়েছে তার সমান পদচারনা। তিনি শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয়, বিশ্ব সাহিত্যের এক অমর ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বসভায় তুলে ধরেছেন পূর্ন মর্যাদায়। তার লেখনীতে মানব জীবনের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, গভীর জীবনবোধ, সাম্য, সম্প্রীতি ও মানবতাবোধের প্রতিফলন ঘটেছে। এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে তিনি কি পতিসর-শিলাইদহ-শাহাজাদপুরে জমিদারী পরিচালনার পাশাপাশি শুধু সাহিত্যচর্চা করেছেন। কবি রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথের অন্তরালে এক জনদরদী, পল¬ীদরদী রবীন্দ্রনাথ নেতাকেও যে আমরা দেখতে পাই সেটাই এখন আলোচনায় আসতে চায়। বাঙালীর প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিভিন্ন সময়ে জমিদারী পরিদর্শনে এলেও ১৮৯১ সালে শিলাইদহে জমিদারী পরিচালনার দায়িত্ব স্কন্ধে তুলে নেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৮৯৬ সালের ৮ আগষ্ট একটি আমমোক্তারনামায় স্বাক্ষর করে রবীন্দ্রনাথকে জমিদারি পরিচালনার কর্তৃত্ব প্রদান করেন। প্রজানীপিড়ক, অত্যাচারী জমিদারদের চরিত্র তখন প্রজাদের কারও অজানা ছিল না। কিন্তু প্রজারা তখন জমিদার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভেতর এক মানব দরদী চরিত্র দেখতে পায়। প্রথম জমিদারের কাজে গিয়েই তিনি এক লক্ষ টাকা মাফ করে দিয়েছিলেন। তিনি সকল প্রজাদের অভাব অনটনের কথা শুনতেন এবং তাদের সমস্যার সমাধান করে দিতেন। তিনি চাষীদের প্রতি কতটা উদার ছিলেন তার জামাতাকে লেখা এক চিঠিতে বোঝা যায়।- ‘মনে রেখো জমিদারদের দেয় টাকা চাষীদের টাকা এবং চাষীরাই তোমাদের শিক্ষার ব্যায়ভার নিজেরা আধপেটা খেয়ে না খেয়ে বহন করছে। এদের এই ঋণ সম্পূর্ন শোধ করার দায়িত্ব তোমাদের উপর রইল। নিজের সংসারটা উন্নতির চেয়েও এইটাই তোমাদের প্রথম কর্তব্য হবে’। শিলাইদহে অল্প বেতনভুগি আমলাদের জন্য চরাঞ্চালে জমি দেওয়ার ব্যাবস্থা চালু করেছিলেন। তিনি যখন শিলাইদহে এসে দেখতে পান তার দরবারে মুসলমানদের আসন নীচে ফরাস পেতে কিংবা মাটিতে আর হিন্দুদের আসন চেয়ার বা বেঞ্চিতে। তখন তিনি অতীতের এই রীতি ভেঙ্গে হিন্দু মুসলিম প্রজাদের এক আসনে বসাতে বাধ্য করে ধর্মের কারনে প্রজাদের মধ্যকার পার্থক্য দুরীভূত করেন। তার জমিদারীর সময়ে মুসলমানরা ছিল উপেক্ষিত। তিনি অল্প শিক্ষিত মুসলমানদের মহুরী ও আমিনের কাজ শেখানোর ব্যবস্থা করেন। আদুড়ী খাঁ, আইনউদ্দিন খাঁ প্রমুখকে আমিন ও তহশীলদারে উন্নীত করেন । কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ ছিলেন তা তার এই সমস্ত উদ্যেগ ও কর্মকান্ডের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। আর একটি বিষয় তিনি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন পল¬ী উন্নয়ন ছাড়া একটি দেশ ও জাতি কখনও উন্নতির চরম শিখরে পৌছাতে পারে না। তাই তিনি জমিদারী পরিচালনা, সাহিত্য চর্চার পশাপাশি পল¬ী উন্নয়নে নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রেখেছিলেন। রাশিয়ায় থাকাকালীন সমবায়ের সাফল্যে তিনি অনুপ্রানিত হয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন একমাত্র সমবায় প্রনালীই দেশকে দারিদ্রতার হাত থেকে বাঁচাতে পারে। তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন সমবায় হচ্ছে মিলনের ক্ষেত্র -একত্রে মিলতে পারলেই দারিদ্রমোচন সম্ভব। তিনি সর্বসাধারনের শক্তিকে মিলিত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সমস্ত জমি একত্রীকরন ও ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষ, সমবায় ভিত্তিক চাষ করার উৎসাহ সৃষ্টি, উৎপাদিত মুনাফা সমভাবে বন্টন এবং গুদামজাতকরন, অসাধু মহাজনের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্তকরনে পল¬ীসমাজ স্থাপনে প্রয়াসী হন। অর্থকারী ফসলের গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে কবি আখ, ভুট্টা, আলুর চাষের সূচনা করেছিলেন যাতে করে শুধু ধান ও পাটের উপর কৃষকদের নির্ভরশীলতা কমে যায়। কৃষকদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরন তিনি বিদেশ থেকে নিয়ে আসতেন। ১৯২০ সালে কবির চেষ্টায় সর্বপ্রথম পতিসরে কলের লাঙ্গল আনা হয়েছিল। প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত কবিপুত্র ট্রাক্টর চালিয়ে আশেপাশের হাজার হাজার দর্শকদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা সৃষ্টি করেন। শিলাইদহে তিনিই প্রথম গোল আলুর চাষ করেছিলেন। আমেরিকা থেকে তিনি ভুট্টার বীজ এনেছিলেন। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে তিনি ধানের বীজ এনে কৃষকদের মাঝে বিতরন করতেন। চাষীদের ঋণদানের জন্য কালীগ্রাম ও শিলাইদহে কৃষি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিলাইদহে রেশম উৎপাদনের জন্য গুটি পোকা চাষের প্রবর্তন করেছিলেন। প্রজাদের কাপড়ের অভাব পমাচনকল্পে কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে তিনি তার জমিদারীতে তাঁত শিল্প প্রতিষ্ঠা করেছেন। মৃৎশিল্প উন্নয়নে রবীন্দ্রনাথ উদ্যেগ গ্রহন করেন। পুত্র রবীন্দ্রনাথকে এ সম্পর্কে লেখেন ‘বোলপুরে ধানা ভানা কল চলছে -সেই রকম একটা কল এখানে (পতিসরে) আনতে পারলে বিশেষ কাজে লাগবে। এ দেশ ধানের দেশ, বোলপুরের চেয়ে অনেক বেশী ধান এখানে জন্মায়’। অজ্ঞানতার অন্ধকারে নিমজ্জিত পল¬ীবাসীকে অক্ষর জ্ঞান দেওয়া এবং শিক্ষার বিস্তারে তার ভূমিকা অতুলনীয়। পতিসরে তার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দুশো অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। রাতে বয়স্করা পড়ত আর দিনের বেলা পড়ত স্কুলের শিশুরা ও তরুনরা। জোড়াসাকোতে স্থাপন করেন গৃহবিদ্যালয়। ১৮৯৮ সালে শিলাইদহে গৃহ শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। শিলইদহ গ্রামের মধ্যে দুটি প্রধান রাস্তা, গোপীনাথ মন্দির, খোরসেদ ফকিরের দরগা সংস্কার, দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জানিপুর ও পান্টিতে সুতা ও গোহাট স্থাপন করেছিলেন। কালীগ্রমে তৈরী করেছিলেন স্কুল মক্তব ও হাসপাতাল। খারসেদপুরস্থ ইংরেজি বিদ্যালয় রবীন্দ্রনাথের সময়ে এস্টেট থেকে আর্থিক অনুদান পেত। কালীগ্রাম পরগনায় প্রজাদের জন্য পতিসর, রাতোয়াল ও কামতায় তিনি তিনটি দুই শিফটের অবৈনতিক প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ঠাকুর পরিবারের সময়ই শাহাজাদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইংরেজী স্কুল ও কিরনবালা শিশু বালিকা বিদ্যালয়। রবীঠাকুরের সময় এই দুইটি বিদ্যাপীঠই তার কাছ থেকে যথেষ্ট উৎসাহ ও অর্থ আনুকুল্য পেয়েছিল। এছাড়া এষ্টেটের খরচে শাহজাদপুরের বহু মেধাবী তরুনদের পড়াশুনার ব্যবস্থা গ্রহন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পঞ্চায়েত প্রথা প্রবর্তণ করেই প্রথমে প্রজাদের মধ্যে শালিসী বিচারের ব্যাবস্থা করেন।এর ফলে প্রজারা বিচার নিয়ে আদালতের শরনাপন্ন হত না। বিচারের জন্য বাদী বিবাদীকে কোন ব্যায় বহন করতে হত না। রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ ও পতিসরে প্রজাদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল তৈরী করে ডাক্তার নিয়োগ দেন। একজন চিকিৎসক হিসেবে বিনামূল্যে ঔষধের ব্যাবস্থা করতেন। পল্লীবাসির ঔষধের উপকারের কথা শুনলে পুলকিত বোধ করতেন। মাঝে মাঝে কোন কোন জায়গায় কলেরার প্রকোপ দেখা দিত। এ সর্ম্পকে তিনি লেখেন‘ গ্রামে উলা ওঠা ব্যাপ্তি হইয়া পড়িতেছে। আমি স্বয়ং উপস্থিত হইলে তাহার ভাল রকম প্রতিকার হইতে পারিত।—— আমি কয়েকটি উলা ওঠার ঔষধের বাক্স শীঘ্র পাঠাইতেছি এবং যদি হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার পাঠাইতে পারি, চেষ্টা করব।’ তিনি জমিদারীর দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে সাধারন প্রজারা এই চিকিৎসা সুবিধা পেয়েছিলেন। ১৯০১ সালে কলকাতায় পে¬গের কারনে মানুষ আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়লে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসুস্থ অবস্থায় কলকাতায় গিয়ে আর্তপীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাড়িয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ পূর্বসুরীদের মত খেয়াল খুশিতে খাজনা বাড়াতেন না। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টির দরুন ফসলহানি হলে প্রজাদের খাজনা মওকুফ করে দিতেন। আমলারা পল¬ী উন্নয়নের পরিকল্পনা থেকে রবীন্দ্রনাথ সরিয়ে রাখার বহুবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। তিনি আমলা কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন‘‘আমি কেবল জয় করিব একটি বা দু’টি ছোট গ্রাম’’। এদের মনকে পেতে হবে,এদের সঙ্গে একত্রে কাজ করবার শক্তি সঞ্চয় করতে হবে। আমি যদি কেবল দু’টি বা তিনটি গ্রামকেও মুক্তি দিতে পারি অজ্ঞতা অক্ষমতার বন্ধন থেকে, সেখানেই ছোট আদর্শ গ্রাম তৈরী হবে।’’ প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রজাদের নিয়ে সব সময় ভাবতেন। তাদের কষ্টে ব্যাথিত হতেন। তাই তিনি ‘ছিন্নপত্রে’(শিলাইদহ:১০ ই মে ১৮৯৩) লিখেছেন ‘আমার এই দরিদ্র চাষী প্রজাগুলোকে দেখলে ভারী মায়া হয়। এরা যেন বিধাতার শিশু সন্তানের মত নিরুপায়। তিনি এদের মুখে নিজ হাতে কিছু তুলে না দিলে এদের আর গতি নেই। পৃথিবীর স্তন যখন শুকিয়ে যায় তখন এরা কেবল কাঁদতে জানে, কোনমতে একটুখানি ক্ষুধা ভাঙ্গলেই আবার তখনই সমস্ত ভূলে যায়।’ কবি আজিজুর রহমান তার এক লেখাতে মন্তব্য করেন ‘রবীন্দ্রনাথ পল্লীবাসি, শুধু পল্লীবাসি নন, পল্লী হৃদয়ের অন্ত:পুরের অধিবাসী। সর্বপ্রযতেœ তিনি সকলের সঙ্গে সমান হবার ব্রতে ব্রতী। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, শিক্ষাবিদ,সংগঠক, সমাজ সংস্কারক, পল্লী উন্নয়নের রুপকার ও একজন মহানুভব ব্যক্তি। তিনিই প্রথম পল্লী উন্নয়নের সুচনা করেছিলেন। এতে করে গ্রামবাসী আত্মনীর্ভরশীলতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ, শাহাজাদপুর, পতিসর, সরুল পল্লীতে উন্নয়নের যে মহৎ উদ্যেগ গ্রহন করেছিলেন তা বাস্তবায়িত হলে- এসব পল্লী আদর্শ গ্রামরুপে পরিগনিত হত। লেখকঃ এ্যাডভোকেট, কুষ্টিয়া জজকোর্ট, রাজনীতিক।

আরো খবর...