পলাশী থেকে ধানমন্ডি

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ বাংলা ও ভারতের ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। একই সঙ্গে গোটা অঞ্চলের মুসলমানদের ইতিহাসে একটি বাঁক। মোগল সাম্রাজ্যের সামন্ত অর্থনীতির ক্ষয়িষ্ণুতা,  মোগল অভিজাত সমাজের ব্যাপক অবক্ষয় এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সীমাহীন কোন্দল, মোগল সম্রাটদের অযোগ্যতা, দরবারের ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল প্রভৃতির পটভূমিতে সম্রাট আওরঙ্গজেব-উত্তর মোগল শাসন পতনের দিকে ধাবিত হয়। কেন্দ্রীয় শাসনের এই দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন অঞ্চলের সুবেদারদের একটা বড় অংশ অনেকটা স্বাধীনভাবে শাসন পরিচালনা করতে থাকেন। এই পরিস্থিতি ইউরোপীয় বিশেষত্ব ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য অনুকূল বাণিজ্যিক পরিবেশ তৈরি করেছিল। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এখানকার রাজার ক্ষমতা দখল করা ছিল মূল লক্ষ্য। বাণিজ্য ছিল তাদের দ্বিতীয় অগ্রাধিকার।  মোগল রাজশক্তির বিরুদ্ধে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের প্রথম প্রমাণ হলো ১৬৭৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি ওক্সিনডেন ও মারাঠা  নেতা শিবাজীর মধ্যে সম্পাদিত গোপন চুক্তি। সন্ত্রাসী, লুণ্ঠনকারী শিবাজী তখন মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে গোপন তৎপরতায় লিপ্ত। মারাঠাদের উচ্ছৃঙ্খল জীবনাচরণ, লুণ্ঠন ও দস্যুবৃত্তি এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দিকে লক্ষ্য করে ইংরেজ কোম্পানি নজর দেয় বাংলার দিকে। সুবে বাংলা তখন সমগ্র ভারতের মধ্যে সমৃদ্ধতম অঞ্চল। এখানে ইংরেজ শক্তি তাদের সহযোগী হিসেবে পেয়ে যায় হিন্দু বিত্তশালী শ্রেণিকে। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, সুবে বাংলায় মুর্শিদকুলী খানের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বিত্তশালী হিন্দু শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। প্রশাসন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ পদসমূহে তিনি হিন্দুদের বসিয়ে দেন। ফলে ইংরেজ শক্তি মুসলিমবিরোধী হিন্দুদের সহজেই হাত করে ফেলে। এরপর তারা দৃষ্টি নিক্ষেপ করে প্রশাসনের অভ্যন্তরে মুসলিম কর্মকর্তাদের দিকে। ইংরেজ বেনিয়া, হিন্দু মহাজন শ্রেণি অর্থ ঢেলে দেয় মুসলিম কর্মকর্তাদের মাঝে। উলেস্নখ যে, এ পর্যায়ে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মোট ৮৩ জন এজেন্টদের মধ্যে ৮১ জন ছিল হিন্দু। মাত্র দুইজন ছিল মুসলমান। অর্থ আর ক্ষমতার প্রলোভনে দিশাহারা হয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রধান  সেনাপতি মীর জাফর শত্রম্নর সঙ্গে হাত মেলায়। পরিণতিতে ইংরেজ ও হিন্দু মহাজনদের গভীর ষড়যন্ত্রও তাদের হাতের পুতুল মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন এক প্রহসনমূলক যুদ্ধে বাংলার স্বাধীনতা অস্তমিত হয়। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব বিশ্বাসঘাতকদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন। পলাশী ট্র্যাজেডির অল্পসময়ের মধ্যে দরবারের মুসলিম বিশ্বাসঘাতকরা এটা বুঝতে পারে যে, দেশের চরম সর্বনাশ হয়ে গেছে। কিন্তু ইতিমধ্যে নবাব দরবারে তাদের নিয়ন্ত্রণ শূন্যের কোঠায়, পুরো রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর ইংরেজ আর হিন্দু জগৎশেঠদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এভাবে বাংলার নবাব কিংবা দিলিস্নর মোগল দরবারের অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিশ্বাসঘাতক আর মোনাফেকদের কারণেই বাংলার সুদীর্ঘ মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে নজরুলের ‘কান্ডারি হুঁশিয়ার’ শীর্ষক এই গান ঘরে ঘরে গাওয়া হতো। এখন গাওয়া হয় না। সম্ভবত বর্তমান কান্ডারিদের হুঁশিয়ার করে দেওয়ায় কোনো প্রয়োজন আমরা বোধ করি না। পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদসহ কয়েকটি জেলায় এখনো শহিদ সিরাজউদ্দৌলা দিবস হিসেবে ৩ জুলাই পালিত হয়। এই দিবস উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যথেষ্ট প্রেরণা জুগিয়েছে। পলাশী?যুদ্ধে সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় ইংরেজ সেনাপতি ক্লাইভ নবাবকে হত্যা করে সুবে বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা করেন। তারপর ১০০ বছর না যেতেই দিলিস্নর মোগল বাদশাহ বাহাদুর শাহকে সিংহাসনচ্যুত করে সারা উপমহাদেশে ইংরেজরা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়, তার নাম ছিল সিপাহী বিদ্রোহ। তাও সফল হয়নি। নবাব সিরাজউদ্দৌলা যুদ্ধে পরাজিত হননি। তিনি হয়েছিলেন বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। যেমন সিরাজ হত্যার ২১৮ বছর পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা তা?ই সেনাপতি জিয়াউর রহমান, রাজনৈতিক সহকর্মী খোন্দকার মোশতাকের বিশ্বাসঘাতকতায় (১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট) নির্মমভাবে নিহত হন। তিনি কখনো পরাজিত হননি। ছিলেন বাঙালির অপরাজিত এবং অপরাজেয় নেতা। পলাশীর যুদ্ধের পর পরাধীন উপমহাদেশে নবাব সিরাজউদ্দৌলা জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃত হন এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠেন। নেতাজি সুভাষ বসু প্রথম নবাব সিরাজকে জাতীয় বীর (ঘধঃরড়হধষ ঐবৎড়) হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি কলকাতা করপোরেশনের মেয়র থাকাকালে মুর্শিদাবাদে গিয়ে নবাবের সমাধিতে পুষ্পস্তবক রেখে ঘোষণা করেন, “ণড়ঁ ধৎব হড়ঃ ধ ভধষষবহ করহম, ণড়ঁ ধৎব ড়ঁৎ হধঃরড়হধষ ঐবৎড়” (আপনি পতিত রাজা নন, আপনি আমাদের জাতীয় বীর)। অবিভক্ত বাংলার রাজধানী কলকাতায় ইংরেজরা একটি রাস্তার নাম রেখেছিলেন ক্লাইভ স্ট্রিট। তা পরিবর্তন করে রাখা হয়েছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলা স্ট্রিট। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা শহর ছিল একটি জেলা শহর। এই শহরেও প্রতিষ্ঠা করা হয় সিরাজউদ্দৌলা পার্ক। পাকিস্তান হওয়ার পর এই সিরাজউদ্দৌলা পার্কেই প্রথম রাজনৈতিক সভা হতো। তারপর সভার আকার বর্ধিত হওয়ায় তা চলে আসে সদরঘাটসংলগ্ন ভিক্টোরিয়া পার্কে (বর্তমান বাহাদুর শাহ পার্ক)। ভিক্টোরিয়া পার্কে যখন জনসমাগম ধরত না, তখন সভাস্থল চলে যায় পল্টন ময়দানে। সেখান থেকে চলে যায় পুরনো রেসকোর্স বা শহিদ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। এই উদ্যান থেকেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সিরাজউদ্দৌলা ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন, শিল্পোদ্যোগে মন দেন। সেই আমলে পাট, তুলা, রেশম, গরম মসলা (তেজপাতা, দারুচিনি, লবঙ্গ এলাচি ইত্যাদি) ইউরোপে রপ্তানি শুরু হয়। মসলিন কাপডের দারুণ চাহিদা ছিল ইউরোপে। তার কাছে ব্রিটেনের ল্যাঙ্কশায়ারের বস্ত্রশিল্প মার খেত। এ জন্যই ইংরেজরা সুবে বাংলা দখল করার পর ৯০ হাজার মসলিন তৈরিকারক তাঁতির আঙুল কেটে দিয়েছিল, যাতে মসলিন বস্ত্র আর তৈরি করতে না পারে এবং ল্যাঙ্কশায়ারের বস্ত্রশিল্প মসলিনের কাছে মার না খায়। সিরাজউদ্দৌলা দেশে ইংরেজ বণিকদের অত্যাচার ও বিনা শুল্কে বাণিজ্য বন্ধ করে বহির্বাণিজ্য এতটাই সম্প্রসারিত করেছিলেন অনেক আধুনিক পশ্চিমা গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মতে, সুবে বাংলা তখন এক শিল্পবিপস্নবের দিকে এগিয়ে চলেছিল। বাংলায় রেললাইন প্রতিষ্ঠা দ্বারা যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নীত করার চাইতে ইংরেজ শাসকদের দেশটির সমস্ত সম্পদ লুট করে বিলেতে পাঠানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এই নিষ্ঠুর শোষণের কারণে সোনার বাংলা শ্মশানে পরিণত হয়। বাংলা ১২৭৬ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলায় হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। বাংলা ১৩৫০ সালে ইংরেজ শাসকরা আরেকটি দুর্ভিক্ষ ঘটায়। তাতে মৃত্যু হয় ৫০ লাখ লোকের। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের পরামর্শমতো এই দুর্ভিক্ষ ঘটানো হয়েছিল। অনেক ইতিহাসবিদ এখন তা স্বীকার করেন, আঠারো শতকে উদীয়মান পুঁজিবাদী, সামরিক ও সামন্ত শ্রেণির একাংশের বিশ্বাসঘাতকতায় যদি নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন না হতো, তাহলে আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবিভক্ত বাংলাদেশ হতো একটি আধুনিক শক্তিশালী রাষ্ট্র। পরবর্তীকালে এই রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন হোসেন সোরওয়ার্দী ও শরৎ বসু মিলে তাদের স্বাধীন যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার মধ্যে। সেই পরিকল্পনা কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতৃত্বের চক্রান্তে ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাকেও দেশি-বিদেশি চক্রান্তে সিরাজের মতো আত্মাহুতি দিতে হয়। পলাশী থেকে ধানমন্ডি একই সূত্রে গাঁথা। এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলা নতুন করে জেগে উঠেছে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও নবাব সিরাজের আমলের মীরজাফর ও জগৎশেঠদের অনুসারীদের চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনা যুদ্ধরত। সেই ইংরেজ আমলে আমাদের ছেলেবেলায় বাংলার স্কুল-কলেজে ৩ জুলাই পালিত হতো। সিরাজউদ্দৌলাকে স্মরণ করে নানা সভা, অনুষ্ঠান হতো। পাকিস্তান আমলে এই দিবস গুরুত্ব হারায়। কারণ অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদকে পাকিস্তানি শাসকরা ভয় করতেন। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলায়ে অতীতের বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে স্মরণ করা উচিত। ৩ জুলাই প্রতি বছর পালিত হওয়া উচিত। নতুন প্রজন্মের বাঙালির কাছে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরা উচিত। এই উপমহাদেশের মানুষরা পলাশী দিবসের কথা ভুলে যায়। পলাশী দিবসকে পালন করার মানসিকতা কেন হারিয়ে যাচ্ছে- সমাজ থেকে সে প্রশ্ন আজ কেন উঠে আসছে না? তবে একথা ঠিক যে, পলাশী যুদ্ধের ক্ষত এখনো শুকায়নি। সে যুদ্ধের ক্ষত আমরা এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি। পলাশী ট্র্যাজেডি বাঙালি জাতির মন থেকে মুছে দিতে কে বা কারা, কীভাবে নীলনকশা তৈরি করছে তা জাতিকে সম্যক উপলব্ধি করতে হবে। তাই পরিশেষে বলতে পারি, পলাশী যুদ্ধের শিক্ষা, বাস্তবতা ও ঐতিহাসিক মূল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং তার গুরুত্বও অপরিসীম। ড. ফোরকান উদ্দিন আহাম্মদ : সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী, কলামিস্ট ও গবেষক

 

আরো খবর...