পথ হারিয়েছে পাটশিল্প

॥ মোহাম্মদ আবু নোমান ॥

খুবই দুঃখজনক! সরকারি নিয়ন্ত্রণে রেখে পাটশিল্পকে বাঁচানো গেল না। সোনালি আঁশখ্যাত, অমিত সম্ভাবনাময় পাটশিল্প এখন রীতিমতো বিনাশের পথে। যে পাটশিল্প এক সময় ছিল আমাদের অর্থনীতির উলে¬খযোগ্য প্রধান বুনিয়াদ। সে পাটকলের লোকসানের বোঝা আর বইতে চাইছে না সরকার। অথচ বেসরকারি খাতের পাটকলগুলো লাভ করলেও নানা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতিতে বছরের পর বছর লোকসানের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে সরকারি পাটকলগুলো। লোকসানে থাকা পাটকলগুলোর অর্থায়নের বিষয়ে গত বছরের ১৪ মে সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোকে গত ১০ বছরে ৭ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। পাটকলে আর কতদিন অর্থায়ন করব? গত ১০ বছরে তো আমরা ৭ হাজার কোটি টাকা দিয়েছি। এটা অনেক বড় টাকা।’ ধারাবাহিকভাবে  লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসরে (গোল্ডেন হ্যান্ডশেক) পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশন (বিজেএমসি)। প্রক্রিয়াটি শেষ হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) বা অন্য কোনোভাবে পাটকলগুলো চালানোর উদ্যোগ ও পাটকলের ব্যবস্থাপনা ও বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেওয়া হবে বলে জানা যায়। লুটপাটের বলি পাটশিল্প ঃ তার মানে বেসরকারি অংশীদারিত্বে পরিচালিত হলে লোকসান হবে না। একথা স্পষ্ট  যে, পাট সেক্টরের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং পাট মন্ত্রণালয় ও বিজেএমসির অবহেলার কারণেই অমিয় সম্ভাবনার পাটশিল্প আজ পথ হারিয়েছে। সরকারের অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, লুটপাট আজ পাটশিল্পকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে। অথচ কয়েক দশক ধরে এই শিল্পই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ ছিল। ছাঁটাই কোনো সমাধান নয়। শ্রমিকদের ছাঁটাই না করে কীভাবে পাটকলকে লাভজনক করা যায় সে উপায় বের করা দরকার ছিল। প্রতিটি সরকারের লুটপাটের বলি এই পাটশিল্প। শ্রমিকরা বলছেন, ‘লোকসান হয় কর্মকর্তাদের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও নীতি নির্ধারণের কারণে।’ এই দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা কখনোই নেয়া হয়েছিল কী? ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষকে সুবিধা দিতে সাধারণ নাগরিকরা এই লোকসানের বোঝা কতদিন এবং কেন বহন করবে, আর শ্রমিকদেরও কেন ছাঁটাই করা হবে? পাটচাষি, পাটপণ্য উৎপাদক, রপ্তানিকারকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রণোদনা এবং উপযুক্ত বাজারমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি পাটকলে অনিয়ম, অদক্ষতা, উৎপাদনহীনতা ও দুর্নীতি দূর করা সম্ভব হলে পাটশিল্পে লাভ করা সম্ভব হতো। পাটকলগুলোর লোকসানের কারণ ঃ পাটকলগুলোর আয় কমে যাওয়া এবং বছরের পর বছর লোকসানের কারণ হিসেবে বিজেএমসির শীর্ষ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে শ্রমিকনেতারা গণমাধ্যমকে বলেন, লোকসানের বড় কারণ কাঁচা পাট কেনায় অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। এ ছাড়া সরকারি পাটকলের উৎপাদনশীলতা কম অথচ উৎপাদন খরচ বেশি। ভরা  মৌসুমে পাট কেনা হলে ও উৎপাদিত পণ্য ঠিকমতো বিক্রির ব্যবস্থা করলে মিলগুলোয় কোনো ক্রমেই লোকসান হওয়ার কথা নয়। পাটকলগুলোয় পাট ক্রয়  থেকে কারখানা চালানোর নানা স্তরে ব্যাপক দুর্নীতি হয়ে থাকে। কম পাট কিনে  বেশি দেখানো, ময়েশ্চার বা ভেজা পাট কিনে শুকনা পাটের দাম দেওয়া ইত্যাদি নানা দুর্নীতির চলে। লোকসানের দায় শ্রমিকদের ওপর চাপানো কেন? ঃ মৌসুমের শুরুতে যখন পাটের দাম কম থাকে, বিজেএমসি তখন পাট না কিনে পরে বেশি দামে কেনে। এ বিষয়ে সংস্থাটির সময়মতো বরাদ্দ না পাওয়ার অজুহাতও ধোপে টেকে না। সময়মতো বরাদ্দ আনার দায়িত্ব কি তাদের নয়? সরকারি খাতের প্রায় প্রতিটি পাটকলে বিপুল পরিমাণ উৎপাদিত পণ্য পড়ে আছে। পাটপণ্য বিক্রির দায়িত্ব নিশ্চয়ই শ্রমিকদের নয়। আর স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে, এ লোকসানের সঙ্গে শ্রমিকদের কোনো সম্পর্ক নেই। কারখানাগুলোর  লোকসানের দায় কোনোভাবেই শ্রমিকদের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। অন্যদিকে বেসরকারি পাটকলগুলো লাভজনক হলেও কেন রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানাগুলো ফি বছর বিপুল অঙ্কের লোকসান দিচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। পাশাপাশি দলাদলি, স্বজনপ্রীতি, কায়েমি স্বার্থ ত্যাগ করতে হবে। আধুনিকায়ন ও লাভজনক করা সম্ভব ঃ বাজেটে বরাদ্দ করা অর্থ গোল্ডেন হ্যান্ডশেক হিসেবে না দিয়ে পাটকলের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নের জন্য ব্যয় করলে পাটকলগুলোকে লাভজনক করা সম্ভব। পাটকলগুলো পিপিপি মডেলে চালানোর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তি খাতে ছেড়ে দেওয়ার মতোই। যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন ও সময়মতো কাঁচা পাট কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিলেই সরকারি পাটকলগুলো লাভের মুখ  দেখবে। বিজেএমসির দুর্বল বিপণন ব্যবস্থাপনা জোরদার ও দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদেরও অপসারণ করতে হবে। বর্তমানে পিপিপির মাধ্যমে পরিচালনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে পরিচালিত হবে কী-না কে বলতে পারবে? পাটকলগুলো পরিচালনার যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় না হয়, সেদিকে  খেয়াল রাখতে হবে। বিশ্বজুড়ে পাটের কদর বৃদ্ধি ঃ পলিথিন ও প¬াস্টিক দ্রব্যের অতি ব্যবহারের দরুন বিশ্বব্যাপী সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে পাটসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক তন্তুর কদর বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের ৭৪তম সাধারণ পরিষদে দ্বিতীয় কমিটিতে ‘প্রাকৃতিক তন্তুর উদ্ভিজ্জ ও টেকসই উন্নয়ন’’ শিরোনামে পাটসহ প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহারবিষয়ক একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে পাটের কদর ও ব্যবহারিক মূল্য বৃদ্ধির একটি সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গত দুই দশকে বিশ্বজুড়ে পাটের তৈরি নানাবিধ ও বহুমুখী পণ্যের চাহিদা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কিন্তু বহুমুখী পাটপণ্যের উপযোগী কাঁচামাল তৈরির উৎপাদনের ক্ষমতা বিজেএমসির পাটকলসমূহের মোটেই নেই। এ ছাড়া প্রায় অর্ধশত বছর পূর্বের যন্ত্রপাতি দিয়ে স্থাপিত এসব মিলের কার্যক্ষমতা সময়ের ব্যবধানে হ্রাস পেয়ে প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমেছে। বিজেএমসির পুরনো ব্যবস্থাপনা কাঠামো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার উপযোগী তৈরি না করার কারণেই পাটশিল্পের মরণদশার কারণ। শ্রমিক ছাঁটাইয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ঃ করোনা মহামারির বিপর্যয়ের মধ্যে নতুন করে দেশের ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের ২৫ হাজার শ্রমিককে কর্মহীন করার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করার দরকার ছিল। বর্তমান শ্রমিকদের বেতন-ভাতা নিয়মিতই বকেয়া হয়ে রয়েছে। বিগত বছরগুলোয় যারা অবসরে গেছেন, তারা এখনো পূর্ণ অবসর সুবিধা পাননি। শ্রমিকদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেক প্রক্রিয়ায় ছাঁটাই করে পাটকল বন্ধ করার ঘোষণায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন শ্রমিক, রাজনীতিকসহ বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা। বিজিএমসি কর্তৃক পরিচালিত পাটকলসমূহ আধুনিকায়ন করে কার্যকর, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার দাবিতে শ্রম প্রতিমন্ত্রী বরাবর সুপারিশ পত্র দাখিল করেছেন বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি শহীদুল¬াহ চৌধুরীসহ অন্যরা। সুপারিশপত্রে বলা হয়, স্বাধীনতার পক্ষের দাবিদার শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতা  থেকে এমন শ্রমিক স্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্ত নেওয়া দুঃখজনক। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্তে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাম ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্ট  নেতারা বলেন, পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে, শুধু পাটকল শ্রমিকরা  বেকার হবে ও তাদের পরিবারগুলো বিপন্ন হবে- তাই নয়। ধ্বংস হয়ে যাবে একটি সম্ভাবনাময় শিল্প আর পাটচাষিরাও ঘোর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে। তাদের পরিবারগুলোতে বিপর্যয় নেমে আসবে। পাটকল বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে দেশের সব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। করোনার দুর্যোগ খাঁড়ার ঘা ঃ করোনা দুর্যোগের মধ্যে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিককে স্বেচ্ছা অবসর দেওয়ার সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিকভাবে নাজুক, শ্রমিকদের ওপর এ  যেন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’। সঙ্গত কারণেই এ সিদ্ধান্তে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ও তাদের পরিবার চরম অনিশ্চয়তায় পড়বে। এ শ্রমিকরাই দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া মজুরির দাবিতে বিভিন্ন আন্দোলন করে আসছিল। এমনকি আমরণ অনশন করতে গিয়ে শ্রমিকের মৃত্যুও ঘটেছে। এখন  সেই শ্রমিকদের স্বেচ্ছা অবসরে পাঠিয়ে রাষ্ট্রীয় পাটকলগুলোকে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপির মাধ্যমে চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিজেএমসি। বর্তমান সরকার পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবনে নানা পদক্ষেপ নিলেও লোকসানের বৃত্ত থেকে  বের হতে পারেনি। অব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক দলাদলি, সময়মতো কাঁচা পাট কিনতে ব্যর্থ হওয়া, পাটের গুণগতমান ভালো না হওয়া, বেশি জনবল, শ্রমিক ও কর্মচারী ইউনিয়নের (সিবিএ) দৌরাত্ম্য, পুরাতন যন্ত্রপাতি, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই লাভের মুখ দেখছে না সরকারি পাটকলগুলো। পাটের কোনো কিছুই ফেলনা নয় ঃ পাট এমন একটি পণ্য, যার কোনো কিছুই ফেলনা নয়। পাট পরিবেশবান্ধব, বহুমুখী ব্যবহারযোগ্য আঁশ। তারপরও পাটে এত লোকসান কেন? আমরা  লোকসানের কথা শুনতে চাই না। বরং পাটশিল্প কীভাবে লাভজনক হবে  সেদিকেই মনোযোগ দিতে হবে। শিল্পবিপ¬বের সময় হতেই অন্যান্য কৃত্রিম আঁশের স্থান দখল করে পাটের যাত্রা শুরু। পাটের আঁশের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, অন্য অনেক আঁশের সঙ্গে মিশ্রণ করে পাটকে ব্যবহার করা যায়। বিশ্বব্যাপী যখন পরিবেশবান্ধব পাটের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের  লোকসানের বোঝায় অচৈতন্য অবস্থা। দুর্নীতি রোধ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং মাথাভারী প্রশাসন কাটছাঁটের মাধ্যমে পাটকলগুলোর লোকসান কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রতিবেশী দেশে এবং দেশের ভেতরে বেসরকারি পাটকলগুলো লাভজনক হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত লোকসান গুনছে। এজন্য পাটশিল্প হতে সর্বোচ্চ সুফল পেতে আমাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনায় হালনাগাদ করা ছাড়াও পাটজাত পণ্যের যুগোপযোগী ব্র্যান্ডিং করতে হবে। বিশ্ববাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। তাহলে পাটচাষি থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোক্তারা লাভবান হবেন। লেখক ঃ কলাম লেখক

 

আরো খবর...