নমুনা পরীক্ষায় এখনও ধীরগতি!

দেশে করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষা শুরু হয়েছে গত মার্চ মাসে। তখন মাত্র একটি ল্যাবে পরীক্ষা করার সুযোগ ছিল। বর্তমানে পরীক্ষা চলছে ৬০টি ল্যাবে। কিন্তু তারপরও নমুনা পরীক্ষার গতি অতি মন্থর। গত সাড়ে তিন মাসে আগ্রহী ৯৫ শতাংশ মানুষ নানাভাবে চেষ্টা করেও নমুনা পরীক্ষা করাতে পারেননি। দেশে সংক্রমণ শুরুর পর থেকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন হট নম্বরে নমুনা পরীক্ষার পাশাপাশি সহায়তা চেয়ে টেলিফোন করেছেন ১ কোটি ১১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩২ জন মানুষ। তাদের মধ্যে গত রোববার পর্যন্ত পরীক্ষা করাতে পেরেছেন মাত্র ৫ লাখ ১৬ হাজার ৫০৩ জন। নমুনা পরীক্ষার এ চিত্র বাস্তবিকই হতাশাজনক। পরীক্ষার জন্য সিরিয়াল পাওয়াটাই অনেক কঠিন ব্যাপার এখনও। প্রতিদিন করোনা উপসর্গ নিয়ে নমুনা পরীক্ষার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে মানুষকে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য নমুনা পরীক্ষা করা এখনও দেশে কঠিন কাজগুলোর একটি। এটি দুর্ভাগ্যজনক। বস্তুত  দেশে যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা চলছে, তাতে করোনা  মোকাবেলায় দ্রুত সাফল্য অর্জন করা কঠিন। বর্তমানে  কেবল তারাই পরীক্ষা করাতে আসছেন, যাদের করোনা উপসর্গ রয়েছে। যাদের উপসর্গ নেই, তারা মূলত পরীক্ষা করানোর কথা ভাবছেনই না। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় আক্রান্ত ৮০ শতাংশ মানুষেরই কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। পরীক্ষা না করানোর কারণে এই ৮০ শতাংশ মানুষকে পৃথক করা বা চিকিৎসার আওতায় আনা হয় না। ফলে তাদের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা  থেকেই যায়। অথচ যাদের উপসর্গ আছে তাদেরই অনেকের পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উপসর্গ থাকা সবার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব হলে তাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ লোকের করোনা পজিটিভ পাওয়া যেত। ফলে তাদের আইসোলেশনে রাখা যেত। এতে সংক্রমণ অনেক কম হতো। করোনা মোকাবেলায় দ্রুত সাফল্য পেতে প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে করোনা রোগীদের শনাক্ত করা। এ জন্য এলাকা ধরে ধরে সবার পরীক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। এর মাধ্যমে যারা করোনা শনাক্ত হবেন, তাদের আলাদা করতে হবে। সংশ্লিষ্ট এলাকায় লকডাউন করতে হবে কঠোরভাবে। উল্লেখ্য, এ পদ্ধতি প্রয়োগ করে করোনা  মোকাবেলায় সফল হয়েছে ভারতের কেরালা রাজ্য, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদেরও এ পদ্ধতিতে যাওয়া উচিত। তাদের মতে, এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি কাজ হল দেশব্যাপী লক্ষ্য নির্ধারণ করে পরীক্ষা চালানো। অথচ দেশের ৪৪টি  জেলায় এখনও কোনো ল্যাব স্থাপন করা হয়নি। ফলে এসব  জেলার মানুষকে নমুনা পরীক্ষার জন্য অন্যত্র যেতে হয়। এতে একদিকে করোনা ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্টদের জন্য তা কষ্টসাধ্যও বটে। করোনার সংক্রমণ রোধে দেশে জোনভিত্তিক লকডাউনের পদক্ষেপ  নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রেও যথাযথভাবে করোনা রোগী শনাক্ত করা প্রয়োজন। এ বাস্তবতায় নমুনা পরীক্ষা বাড়ানোর জন্য আমাদের কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া দরকার। প্রথমত, মানসম্মত ল্যাবগুলোকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি সরকারি- বেসরকারি বড় হাসপাতালগুলোকেও কাজে লাগাতে হবে। দ্বিতীয়ত, করোনা পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী ও উপকরণের বন্দোবস্ত করতে হবে। সব জেলা শহরে ল্যাব স্থাপন করতে হবে। সর্বোপরি, করোনার পরীক্ষা থেকে শুরু করে চিকিৎসা পর্যন্ত কার্যক্রমে যে সমন্বয়হীনতা প্রকাশ পাচ্ছে, তা দূর করাও জরুরি।

আরো খবর...