নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভাসমান কৃষি হতে পারে বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ নদীমাতৃক বাংলাদেশে ভাসমান কৃষি হতে পারে বিকল্প চাষাবাদ পদ্ধতি। নদীমাতৃক এই দেশের তিন ভাগ জল আর এক ভাগ স্থল। আমাদের আছে ৪৫ লাখ হেক্টরের বেশি জলসীমা। আবার দেশের বিরাট অংশ বর্ষা মৌসুমে প্রায় ছয় মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। এ সময়ে সেখানে কোনো কাজ থাকে না, ফসল হয় না, মানুষ বেকার জীবনযাপন করে। এসব এলাকার মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে উদ্ভাবন করলেন ভাসমান কৃষি কার্যক্রম। এসব জেলার জলমগ্ন এলাকা যেখানে কচুরিপানা ও অন্য জলজ আগাছায় আচ্ছন্ন রয়েছে বিশেষ করে বিভিন্ন বিল, হাওর, নালা, খাল ও মজা, পুকুর। সেখানে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে স্তূপ করে প্রয়োজনীয় মাপের ভেলার মতো বেড তৈরি করে ভাসমান পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও মসলা উৎপাদন করছেন অনায়াসে। বন্যা ও জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন কৌশল হিসেবে ভাসমান সবজি ও মসলা উৎপাদন প্রযুক্তি এবং ক্ষেত্র বিশেষে আপদকালীন আমন ধানের চারা উৎপাদন সম্প্রসারণে নতুন যুগের সূচনা করেছে। ভাসমান কৃষির ইতিহাস ঃ ইতিহাস বলে পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার কৃষকই প্রথম ভাসমান বেডে চাষাবাদ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছেন প্রায় ১৫০ বছর আগে। ভূ-প্রকৃতির কারণে বছরের বেশি ভাগ সময় বেশির ভাগ জমি পানিতে ডুবানো থাকত। এসব জমিতে স্বাভাবিকভাবে কোনো ফসল চাষ করা যেত না। বছরের পর বছর ধরে পতিত থাকা এসব জমিতে কচুরিপানা, দুলালিলতা, শ্যাওলা ও অন্যান্য ফেনায় ঘাসে ভরা থাকত। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে স্থানীয় কৃষক সম্মিলিত উদ্যোগে ফসলের জমির পানিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো কচুরিপানা, শ্যাওলা, দুলালিলতা পচিয়ে সারি সারি কান্দি (আইল/ধাপ) তৈরি করে তার ওপর ফসল চাষ করে সফল হন। গোটা বিল অঞ্চলের শত শত হেক্টর পতিত জমি এখন ভাসমান পদ্ধতিতে চাষের আওতায় এসেছে। পর্যায়ক্রমে এ পদ্ধতিতে সবজি ও মসলা চাষ পুরো বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ভাসমান কৃষির সুবিধা ঃ ভাসমান চাষ দেশের বিভিন্ন এলাকার স্থায়ী জলাবদ্ধ ও জলাবদ্ধপ্রবণ এলাকায় সারাবছর শাক-সবজি ও মসলা চাষ করার মাধ্যমে সুষম খাদ্য গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করছে। কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ আগাছাকে ব্যবহার করে ব্যঞ্জরিত ফসল উৎপাদনে উৎসাহিত করছে। নিরাপদ খাদ্য দিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পুষ্টি চাহিদাপূরণ ও জাতীয় আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি উৎপাদন খাতে জলাবদ্ধ এলাকাগুলো কৃষি কাজে ব্যবহার করা এবং বর্ষা মৌসুমে ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে শাক-সবজি মসলার সরবরাহ বাড়ানো এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করছে। প্রতিকূল পরিবেশ, বর্ষা মৌসুমে বা বন্যার সময় আগাম সবজির বীজতলা তৈরি করে সঠিক সময়ে  মৌসুমি উৎপাদন নিশ্চিত করা। বন্যার পানি থাকায় যেখানে সমতল ভূমিতে বীজতলা তৈরি করা যায় না সেখানে ভাসমান  বেডে রবি মৌসুমের জন্য আগাম বীজতলা তৈরি করে আগাম ফসল বিক্রি করে অধিক মুনাফা পাওয়া যায়। জলাবদ্ধ এলাকা কচুরিপানা, শেওলা ও আগাছায় ঢাকা থাকলে পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে না। ফলে মাছ চাষে বিঘœ ঘটে। সেসব এলাকায় কচুরিপানা, শেওলা ও আগাছা ব্যবহার করে ভাসমান  বেড তৈরি করলে একই জমিতে মাছ, সবজি ও মসলা চাষ করা যায়; প্রতি বছর জলাবদ্ধ এলাকার মানুষ মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বেকার থাকে। এ পদ্ধতিতে সারা বছর ভাসমান বেড  তৈরি করে সবজি ও মসলা চাষ করা যায়। ভাসমান বেডের আকার ঃ সাধারণত ভাসমান বেডের দৈর্ঘ্য জমির দৈর্ঘ্য অনুযায়ী করতে হয়। তবে ২০-২৫ হাত দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ভাসমান বেড রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যা করার জন্য বেশি সুবিধা।  বেডের পুরুত্ব যত বেশি হয় বেডের স্থায়িত্ব তত বেশি হয় বলে এ ধরনের  বেড থেকে বেশি দিন সবজি ও মসলা উৎপাদন করা যায়। বেডের প্রস্থ বা চওড়া এবং উচ্চতা ৩-৫ হাত করা ভালো। পানির ওপরের অংশে বেডের উচ্চতা ২ হাত হলে ভালো হয়। ভাসমান বেডের ওপরে উঠে কাজ করলে বেডের স্থায়িত্ব কমে যায়। পাশে দাঁড়িয়ে অথবা ছোট নৌকা বা ভেলার সাহায্যে পাশে  থেকে বীজ বপন-চারা রোপণ, পরিচর্যা ও ফসল সংগ্রহ করলে সুবিধা হয়। পাশাপাশি দুটি বেডের দূরত্ব ২-৩ হাত রাখতে হয়। ভাসমান বেড তৈরি ঃ ভাসমান বেড তৈরির জন্য কচুরিপানার স্তর  যেখানে ঘন, লম্বা ও পুরু এমন জায়গা বেছে নিতে হবে; ঘন, লম্বা ও পুরু কচুরিপানার স্তরের ওপর বেডের দৈর্ঘ্যের মাপ অনুযায়ী দুই খন্ড বাঁশ ফেলতে হবে। বেডের স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রথম স্তরের ওপর। বেডের প্রথম স্তরে যদি ঘন, লম্বা ও পুরু কচুরিপানা ব্যবহার করা হয় তাহলে বেডের স্থায়িত্ব বেশি হয়; এরপর বাঁশের ওপর দাঁড়িয়ে কচুরিপানা টেনে এনে বাঁশের ওপর স্তরে স্তরে সাজাতে হয়; ভাসমান বেডের নিচের দিকে লম্বা ও বড় আকারের কচুরিপানা দিতে হয়; প্রথমে এক বর্গমিটারের একটি ছোট বেড  তৈরি করতে হয়। বেডের চারপাশে আরও কচুরিপানা দিয়ে স্তূপ করতে হয় যাতে স্তূপের ওপরে অন্তত একজন মানুষ উঠে দাঁড়াতে পারে। বেড তৈরির ২/৩ অংশ শেষ হলে ওপরের দিকের ১/৩ অংশের কচুরিপানার শিকড় ওপরের দিকে এবং কান্ডগুলো নিচের দিক করে আস্তে আস্তে প্রস্থ থেকে দৈর্ঘ্যের বরাবর ক্রমান্বয়ে সাজাতে হবে। বেডের ওপরের ১/৩ অংশে অপেক্ষাকৃত ছোট কচুরিপানা দিতে হবে। ভাসমান বেড তৈরির সময় লক্ষ্য রাখতে হবে কচুরিপানার ভেতরে যেন কোনো কলমি, মালঞ্চ ও দূর্বা না থাকে। প্রাথমিকভাবে ভাসমান বেড তৈরির পর ১০-১৫ দিন ফেলে রাখা হয় যাতে কচুরিপানা পচে ফসল বপন/রোপণের উপযোগী হয়। তবে সদ্য তৈরি বেডের ওপর পচা কচুরিপানা (শুকানো) অথবা কম্পোস্ট দিয়ে ২-৩ ইঞ্চি পুরু স্তর তৈরি করে সরাসরি বীজ বপন করা যায় বা চারা রোপণ করা যায়। বেডের স্থায়িত্ব বাড়াতে করণীয় ঃ ভাসমান বেডের স্থায়িত্ব যত বেশি হবে তত বেশি দিন বেডে সবজি ও মসলা চাষ করা যাবে; ভাসমান বেডের স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য পূর্ণতাপ্রাপ্ত, লম্বা কচুরিপানা দিয়ে বেড তৈরি করতে হবে; বেড তৈরির সময় পা দিয়ে চেপে  চেপে কচুরিপানা সাজাতে হবে; বেডের পুরুত্ব ৪-৫ হাত, চওড়া ২.৫-৩ হাত, দৈর্ঘ্য ২০-৩০ হাত হলে স্থায়িত্ব বেশি হয় তবে দৈর্ঘ্য জমির দৈর্ঘ্য অনুযায়ী করা যায়; বেড তৈরির সময় কচুরিপানার স্তরের ওপর লম্বালম্বি ও আড়াআড়িভাবে বাঁশ ব্যবহার করলে বেডের স্থায়িত্ব  বেশি হয়। ভাসমান বেডে বীজ বপন ঃ জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে ভাসমান বেড  তৈরি করা হলে সে নতুন বেডে ঢেঁড়স, ঝিঙা, লালশাক, পুঁইশাক, পানি কচু লাগানো যায়; আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে  তৈরি করা নতুন  বেডে হলুদ লাগানো যায়; শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে টমেটো, বেগুন ও ফুলকপি, বাঁধাকপি, ওলকপির চারা লাগালে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে আগাম ফসল তোলা যায়; কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে মরিচের চারা লাগানো যায়; সারা বছরই ভাসমান বেডে লালশাক ও গিমাকলমি চাষ করা যায়; যতœ নিলে ভাসমান বেডে সারা বছর ফসল চাষ করা যায়; এ ছাড়া ভাসমান বেডে কিছু নির্বাচিত মসলার চাষও করা যায়। ভাসমান বেডে ফসলের পরিচর্যা ঃ ভাসমান বেডে চাষ করা ফসলের পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ খুব জরুরি। ভাসমান বেডের ওপর উঠে পরিচর্যা করা উচিত নয়; এতে বেড নষ্ট হতে পারে। উৎপাদন বাড়ানোর জন্য পরিচর্যার দিকে বেশি যতœশীল হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া পানিতে নেমে কাজ করাও কষ্টকর। এজন্য ফসলের পরিচর্যার কাজে ছোট নৌকা বা ভেলা ব্যবহার করতে হয়। ভাসমান বেডে সবজি ও মসলা চাষে সারের তেমন প্রয়াজন হয় না। কারণ তৈরিকৃত বেডটি একটি উন্নতমানের কম্পোস্ট সারে পরিণত হয়। ফলে গাছটি তার প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান বেড  থেকে গ্রহণ করতে পারে; প্রতিদিন নিয়মিত বেডে হালকা করে পানি সেচ দিতে হবে; যাতে চারার গোড়া শুকিয়ে না যায়; ভাসমান  বেডে সাধারণত ইউরিয়া সার ব্যবহার করা উচিত নয়। ইউরিয়া সার ব্যবহার করলে বেড দ্রুত পচে যাবে। তবে কোনো কারণে গাছের বাড়বাড়তি কম হলে চারা রোপণের বা বীজ বপনের ২০-৩০ দিন পর প্রতি লিটার পানির সাথে ১০ গ্রাম হারে ইউরিয়া সার পানিতে গুলে শুধু পাতায় ¯েপ্র করা যায়। ফসল সংগ্রহ পদ্ধতি ঃ ফসল সংগ্রহ করার জন্য ভাসমান বেডের ওপর ওঠা উচিত নয়। এ কাজে ছোট নৌকা বা ভেলা ব্যবহার করা উচিত; ফসলের ধরন ও প্রয়োজন বুঝে সপ্তাহে ২-৩ দিন ফসল তুলতে হয়; স্থানীয় বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ভাসমান বেডে ফসল বপন/রোপণ করতে হয় ও সময়মতো ফসল তুলে বাজারে বিক্রি করতে হয়; ভাসমান বেড তৈরির সময় বেড বেশি পুরু করলে পরে ফসল তুলতে বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায় এবং একই বেডে  বেশিদিন বেশিবার ফসল চাষ করা যায়; সাধারণত ১/২ মৌসুমে বা যত দিন পর্যন্ত এ ভাসমান বেড সবজি চাষের উপযুক্ত থাকে ততদিন সবজি ও মসলা চাষ করা যায় এবং চারা উৎপাদন করা যায়। ভাসমান বেডে সবজি চাষে আয়-ব্যয় ঃ সাধারণত ২০ হাত লম্বা এবং ৪ হাত চওড়া ও গভীরতা সম্পন্ন ১০টি ভাসমান ধাপ তৈরি ও চাষাবাদে প্রায় ৫-৭ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এসব বেড থেকে আয় হয় ১৬-২০ হাজার টাকা। ভাসমান বেডের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য আধুনিক মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা; ভাসমান  বেডে উৎপাদিত সবজি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ। তাই পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার উন্নতি করা দরকার যাতে উৎপাদনকারী অধিক মূল্য পান; আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেয়া; গরিব কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা। লেখক ঃ কৃষিবিদ ডক্টর মো. জাহাঙ্গীর আলম, পরিচালক, কৃষি তথ্য সার্ভিস, খামারবাড়ি, ঢাকা

আরো খবর...