নতুন যুদ্ধের ‘জিম্মি’ রাখাইনের রোহিঙ্গারা

ঢাকা অফিস ॥ গত মাসে মিয়ানমারের কর্মকর্তারা যখন বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে ঘুরে ঘুরে রোহিঙ্গাদের মাঝে হিজাব পরিহিত নারীদের টহল চৌকি পেরোনো এবং খুশির সঙ্গে পরিচয় পত্র নেওয়ার কার্টুন সম্বলিত প্রচারপত্র বিলি করছিলেন, তখনও তারা তাদের দেশে চলা নতুন যুদ্ধের বিষয়ে টু শব্দ করেননি। গত বছর থেকেই রাখাইনের আদিবাসী সশস্ত্র সংগঠন আরাকান আর্মির (এদের অধিকাংশ সদস্যই স্থানীয় বৌদ্ধ) সঙ্গে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তুমুল লড়াই চলছে। ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে উত্তরপশ্চিম মিয়ানমারে হওয়া সেনা অভিযানের ধাক্কায় স্থানীয় রোহিঙ্গা অধিবাসীর অধিকাংশই প্রাণভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এলেও সম্প্রদায়টির রয়ে যাওয়া দুই লাখের মতো সদস্য এখন এ নতুন যুদ্ধের কারণে ‘জিম্মি’ অবস্থায় দিন পার করছে বলে স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আটকে পড়া এ রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয় দিক থেকেই হুমকির মুখোমুখি হচ্ছেন বলে গ্রামগুলোর একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন। “আমরা তাদের যুদ্ধের মাঝে আটকে গেছি। গত দুই বছর ধরে আমাদের জীবনযাপনে কোনো উন্নতি নেই, খালি অবনতি। কেবলই সমস্যা,” বলেছেন বুথিয়াডং টাউনশিপের একটি গ্রামের বাসিন্দা টিন শয়ে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে লড়াই করা সরকারি বাহিনী উত্তর রাখাইনের বিভিন্ন মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামে অবস্থান নিয়েছে বলে পাঁচ জন গ্রামবাসী নিশ্চিত করেছেন। সরকারি সেনারা তাদের জন্য জ্বালানি কাঠ ও খাবার নিয়ে আসতে কিংবা আরাকার আর্মির অবস্থান দেখিয়ে দিতে গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের নির্দেশ দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাদের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে বলে গ্রামবাসীদের অভিযোগ। “যদি তারা বলে তারা থাকবে, আমাদের তা মেনে নিতে হচ্ছে,” বলেন নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রথেডং টাউনশিপের এক বাসিন্দা। বুথিয়াডং টাউনশিপের আরেক বাসিন্দা জানান, শুদ্ধ বার্মিজ ভাষায় দক্ষতা থাকায় সৈন্যরা তাকে তাদের পথপ্রদর্শক হওয়ারও নির্দেশ দিয়েছিল। এরপর অজ্ঞাত এক নম্বর থেকে তার কাছে আসা ফোনে তাকে সৈন্যদের পথপ্রদর্শক হওয়ার ব্যাপারে সাবধান করে বলা হয়, যারাই সেনাবাহিনীকে সহায়তা করবে, তাদেরই ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হবে। “অপরপ্রান্তের ওই ব্যক্তি আমাকে বলেন- আমরা তোমাকে মেরে ফেলবো, তোমার গ্রাম জ্বালিয়ে দেবো,” বলেন বুথিয়াডং টাউনশিপের এ বাসিন্দা। আগস্টের শুরুতে সৈন্যদলকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া রথেডং টাউনশিপের সিন খোনে তাইং গ্রামের দুই রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয় পাঁচ ব্যক্তি রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে গ্রামটির কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। “আমরা জিম্মি, দুই পক্ষের মাঝে অবরুদ্ধ হয়ে আছি। আমরা নিরাপদ নই। জুনের পর থেকে গ্রাম থেকে তিনবার পালিয়েছি। সরকারের হাতে ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেই,” বলেন গ্রামটি থেকে পালিয়ে আসা এক মুসলিম ব্যক্তি। আরাকান আর্মির মুখপাত্র খিনে তু কা বেসামরিক হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে এসব ঘটনার জন্য মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীকে দোষারোপ করেছেন।

“আমরা আমাদের বেসামরিকদের এভাবে হত্যা করি না। যতখানি শুনেছি, বার্মিজ সেনাবাহিনীই তাদের নিয়ে যায় ও মেরে ফেলে। এ ধরনের অনেক ঘটনাই আছে,” বলেছেন তিনি। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ রাখাইনের উত্তরাঞ্চল সাংবাদিক ও বেশিরভাগ মানবিক সাহায্য সংস্থার জন্যই বন্ধ করে রেখেছে। অস্থিরতা এড়াতে জুন থেকে ওই অঞ্চলে ‘ইন্টারনেট ব¬্যাকআউট’ও চলছে। এসব বিধিনিষেধের কারণে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া কঠিন হলেও রয়টার্স মিয়ানমারের রাজধানী ও উত্তর রাখাইনে থাকা একাধিক রোহিঙ্গার সঙ্গে এ নিয়ে কথা বলেছেন। তারা বলছেন, মুসলিম গ্রামগুলোতে এখন হরহামেশাই ভূমিমাইন বিস্ফোরিত হচ্ছে ও শেল পড়ছে। গ্রামগুলো এখন দুই পক্ষের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দুই রোহিঙ্গা অধিবাসী জানিয়েছেন, সুযোগ থাকলে তারাও বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে পালিয়ে যেতেন; কিন্ত আগে যে পথ দিয়ে সীমানা পেরোনো যেত, সংঘাতের কারণে সেগুলো অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত নতুন এক হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা। এ তালিকায় ভারত থেকে আসা রোহিঙ্গারাও আছে; ভারত সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অবৈধ রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোয় তার ধাক্কা এসে পড়ছে বাংলাদেশে। জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার মুখপাত্র লুইস ডনোভান বলছেন, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা সেখান থেকে চলে আসার কারণ হিসেবে সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মির সংঘাত ও জীবনযাপনের করুণ অবস্থার কথা তুলে ধরেছেন। সংঘাতের কারণে ওই এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে। ২০১২-র দাঙ্গার পর যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের বিভিন্ন ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন তারাও নিয়মিত ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।

রয়টার্স বলছে, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে থাকা অনেক রোহিঙ্গা দেশে ফিরতে চাইলেও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা সুবিধা এবং মিয়ানমারে থাকা রোহিঙ্গাদের জীবনমান উন্নতির শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। শরণার্থী শিবিরে থাকা অনেকেই এতদিন টেলিফোনে রাখাইনে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু কয়েক মাস ধরে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় তাও সম্ভব হচ্ছে না। রাখাইনের কোনো রোহিঙ্গাই এখন আর শরণার্থী আত্মীয়কে দেশে ফিরতে বলতেও পারছেন না। “নিরাপত্তা নেই দেখে এখান থেকেই সবাই পালিয়ে যেতে চায়। যা কিছু রোহিঙ্গা আছে সরকার তাদেরই সাহায্য করতে পারছে না। তারা যে (বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে থাকা) লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে সাহায্য করবে কীভাবে মানুষ তা বিশ্বাস করবে,” প্রশ্ন বুথিয়াডংয়ের টিন শয়ের।

আরো খবর...