ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়

ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি চশমা যা পরিধান করলে শাসকদের চোখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ কেবল একজন মানুষ হিসেবেই ধরা  দেয়। তখন সে সবাইকে আল¬াহর এক সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে মনে করে। সম্প্রতি সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বাদ দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা লেখা চালু করার দাবিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ সংশি¬ষ্ট ১০ জনকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়েছে। ১৬ আগস্ট নোটিশটি পাঠান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অশোক কুমার ঘোষ। তিনি নিজেই সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নোটিশে বলা হয়েছে, ১৯৪৭ সালের পর পশ্চিম পাকিস্তানিদের শোষণ, নির্যাতন এবং বেআইনি কার্যকলাপের প্রতিবাদে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালে আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানসহ অন্য নাগরিকরা এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ভারত-রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের সার্বিক সহযোগিতায় স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমাদের ১৯৭২ সালের পবিত্র সংবিধানে স্বাধীনতার চেতনাসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলনীতি ছিল জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা জানি, ‘৭২-এর সংবিধানে উলে¬খ ছিল ‘মানুষের ওপর মানুষের  শোষণ হতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।’ (অনুচ্ছেদ ১০) এখানে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চিন্তার প্রাধান্য পাওয়া যায়। এবং ১২ অনুচ্ছেদে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার ১২ (গ)’ বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল। ৪১ অনুচ্ছেদে সব ধর্ম পালন ও প্রচারের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। অনুচ্ছেদ ২৭-এ ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী’। এ দুটি অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ২৭ এবং ৪১ মৌলিক অধিকার এখন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে। কিন্তু ১২ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার জন্য ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ করার কথা বলা হয়েছিল তা এতদিন সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে এ  দেশে শত শত ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের উদ্ভব হয়েছে। আবারও বাংলাদেশ ‘৭২-এর সংবিধানে ফিরে যাচ্ছে এটা দেশবাসীর জন্য অনেক আসার কারণ। ইসলাম ধর্মের মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব হলো- এটা প্রত্যেক মানুষকে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করে। এই স্বাধীনতা কেবল ধর্ম-বিশ্বাস লালন-পালন করার স্বাধীনতা নয় বরং ধর্ম না করার বা ধর্ম বর্জন করার স্বাধীনতাও এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কোরআনে আল¬াহতায়ালা বলেছেন, ‘তুমি বলো, তোমার প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে পূর্ণ সত্য সমাগত, অতএব যার ইচ্ছা সে ইমান আনুক আর যার ইচ্ছা সে অস্বীকার করুক’ (সুরা কাহাফ: ২৮ আয়াত)। সত্য ও সুন্দর নিজ সত্তায় এত আকর্ষণীয় হয়ে থাকে যার কারণে মানুষ নিজে নিজেই এর দিকে আকৃষ্ট হয়। বলপ্রয়োগ বা রাষ্ট্রশক্তি নিয়োগ করে সত্যকে সত্য আর সুন্দরকে সুন্দর ঘোষণা করানো অজ্ঞতার পরিচায়ক। ফার্সিতে বলা হয়, ‘আফতাব আমাদ্ দালিলে আফতাব’ অর্থাৎ সূর্যোদয়ই সূর্যের অস্তিত্বের প্রমাণ। এই নিয়ে গায়ের জোর খাটানোর বা বিতন্ডার অবকাশ নেই। সূর্যোদয় সত্ত্বেও কেউ যদি সূর্যের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাকে বোকা বলা যেতে পারে কিন্তু তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা  নেওয়ার কিছুই নেই। ঠিক তেমনি কে আল¬াহকে মানল বা মানল না, কে ধর্ম পালন করল বা করল না এটা নিয়ে এ জগতে বিচার বসানোর কোনো শিক্ষা ইসলাম ধর্মে নেই। বরং এর বিচার পরকালে আল¬াহ নিজে করবেন বলে তার শেষ শরিয়ত গ্রন্থ আল কোরআনে বারবার জানিয়েছেন। এ স্বাধীনতা কাজে লাগিয়ে সমাজে আস্তিকও থাকবে, নাস্তিকও থাকবে। মুসলমানও থাকবে হিন্দুও থাকবে এবং অন্যান্য মতাবলম্বীরাও থাকবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্র পরিচালনা করার ইসলামী শিক্ষা কি আর ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে ইসলাম কি বলে তাও জানা প্রয়োজন।

ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্র পরিচালনার একটি নীতি। এর অর্থ ধর্মহীনতা বা ধর্ম বিমুখতা নয়। এর অর্থ হচ্ছে, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র নায়করা নাগরিকদের ধর্ম বা বিশ্বাসের বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকবেন। কে  কোন ধর্মে বিশ্বাসী বা কে অবিশ্বাসী অথবা নাস্তিক এ বিষয়ে রাষ্ট্র-যন্ত্র  কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করবে না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সবাই রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান- এই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষতা। অথচ না বোঝার কারণে অনেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে কথা বলছেন। আসলে পূর্ণ নিরপেক্ষতা ছাড়া পক্ষপাতহীন ন্যায়-বিচার সম্ভব নয়। ইসলাম ধর্মের এই অমোঘ শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনে। মক্কার নির্যাতিত অবস্থা থেকে মুক্তি চেয়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা লাভের প্রত্যাশায় তিনি মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় পৌঁছানোর পর মদিনার ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মগোষ্ঠী ও গোত্রের সঙ্গে তিনি একটি ‘সন্ধি’ করেন। এই সন্ধি ‘মদিনা সনদ’ নামে বিখ্যাত। ‘মদিনা সনদের’  প্রতিটি ছত্রে সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের সমান নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। মদিনা রাষ্ট্রের সকল নাগরিককে এক জাতিভুক্ত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মদিনা সনদের ২৫ নম্বর ধারায় ধর্মনিরপেক্ষতার একটি বিরল উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে বলা হয় : ২৫. বনু আওফ গোত্রের ইহুদিরা মুমিনদের সাথে একই উম্মতভুক্ত বলে গণ্য হবে। ইহুদিদের জন্য ইহুদিদের ধর্ম, মুসলমানদের জন্য মুসলমানদের ধর্ম। একই কথা এদের মিত্রদের এবং এদের নিজেদের জন্য প্রযোজ্য। তবে যে অত্যাচার করবে এবং অপরাধ করবে সে কেবল নিজেকে এবং নিজ পরিবারকেই বিপদগ্রস্ত করবে। একটু ভেবে দেখুন, কি চমৎকার শিক্ষা! বিশ্বনবী, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) প্রতিষ্ঠিত নীতি হলো, যে যে ধর্মেরই হোক না কেন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের জাগতিক অবস্থান সমান। এটি নিছক একটি ঘোষণাই ছিল না। বরং মহানবী (সা.) মদিনার শাসনকাজ পরিচালনাকালে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নও করেছিলেন। একবার মহানবীর (সা.) শ্রেষ্ঠত্বের বিষয় নিয়ে একজন মুসলমান ও একজন ইহুদির মধ্যে বাক-বিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে বিতন্ডা তিক্ততার স্তরে উপনীত হলে সেই ইহুদি মহানবীর (সা.) কাছে বিচারপ্রার্থী হয়। মহানবী (সা.) নিরপেক্ষ শাসক হিসেবে রায় দিয়ে বলেন, তোমরা আমাকে মুসার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করো না’ (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া লে ইবনে কাসির, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা-২৩৭)। এর অর্থ হচ্ছে, আধ্যাত্মিক জগতে কে শ্রেষ্ঠ আর কে  শ্রেষ্ঠ না এটা মানুষের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। অতএব এ নিয়ে সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করতে যেও না। ধর্ম বিষয়ে নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা ইসলামের শিক্ষানুযায়ী দ্ব্যর্থহীনভাবে সাব্যস্ত। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বাঙালির ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রীয়ভাবে সব মানুষের স্ব-স্ব ধর্ম পালনের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার উৎস ছিল রাসুলুল¬াহ (সা.) প্রবর্তিত মদিনা সনদের সেই মহান অতুলনীয় শিক্ষা, যেখানে উলে¬খযোগ্য শর্ত ছিল- ‘মদিনায় ইহুদি-খ্রিস্টান, পৌত্তলিক এবং মুসলমান সকলেই নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে।’ ১৯৭২ সালের ১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু যে ভাষণ দেন তাতেও ছিল ধর্মনিরপেক্ষতার বাণী। তিনি বলেছিলেন- ‘…আর হবে ধর্মনিরপেক্ষতা। ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে; মুসলমান তার ধর্ম পালন করবে; খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ- যে যার ধর্ম পালন করবে। কেউ কারও ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না, বাংলার মানুষ ধর্মের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ চায় না। রাজনৈতিক কারণে ধর্মকে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ধর্মকে বাংলার বুকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যদি  কেউ ব্যবহার করে, তাহলে বাংলার মানুষ যে তাকে প্রত্যাঘাত করবে, এ আমি বিশ্বাস করি।’ ১৯৭২ সালে ৪ নভেম্বর আবার জাতীয় সংসদে তিনি বলেন: ‘জনাব স্পিকার সাহেব, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। বাংলার সাড়ে সাত  কোটি মানুষের ধর্মকর্ম করার অধিকার থাকবে। আমরা আইন করে ধর্মকে বন্ধ করতে চাই না এবং করবও না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি, ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে শোষণ, ধর্মের নামে বেইমানি, ধর্মের নামে খুন, ধর্মের নামে ব্যভিচার- এই বাংলাদেশের মাটিতে এ সব চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে, আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছি।’ আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু নির্দিষ্ট কোনো দল বা গোষ্ঠীর নন, তিনি ছিলেন সবার জন্য। তার জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা যদি কাজ করি তবেই বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার স্বপ্ন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়িত করা সম্ভব হবে আর রাষ্ট্র ও দেশ হবে সুখী, সমৃদ্ধ ও নিরাপদ। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার যারা বিরোধিতা করে তারা মূলত ইসলামের শিক্ষা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বিরোধিতা করছে। ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটি চশমা যা পরিধান করলে শাসকদের চোখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ কেবল একজন মানুষ হিসেবেই ধরা  দেয়। তখন সে সবাইকে আল¬াহর এক সম্মানিত সৃষ্টি হিসেবে মনে করে। এই শিক্ষা আমরা মহান আল¬াহর ব্যবহার থেকেও গ্রহণ করতে পারি। তিনি যেমন মুসলমান-অমুসলমান, আস্তিক-নাস্তিক, পুণ্যবান-পাপী নির্বিশেষে সবার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাদের সৎকর্মের প্রতিদান দেন, সবাইকে সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত করেন, সবাইকে তার দয়ার বৃষ্টি বর্ষণ করেন ঠিক তেমনি জাগতিক সরকার বা রাষ্ট্র নায়কদেরও ধর্মনিরপেক্ষতার এই গুণটি অবলম্বন করা উচিত। লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

আরো খবর...