দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে

করোনাভাইরাস বিশ্বে কতটা ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমরাও ভুক্তভোগী। শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে চলছে করোনা প্রতিরোধের চেষ্টা। বর্তমান জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও মানুষ গৃহবন্দি। অসহায়ের মতো তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। অদৃশ্য এক ভাইরাস আমাদের মধ্যে জাগিয়ে তুলেছে ভীতি। অনেকে ধর্মচর্চার মাধ্যমে স্রষ্টার কাছে প্রার্থনায় ব্যস্ত করোনামুক্ত পৃথিবীর জন্য। থেমে আছে গৃহবন্দি মানুষের জীবিকা। বিভিন্ন ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন, সরকার বিভিন্নভাবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে দুহাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু থেমে নেই দুর্নীতিবাজ চেয়ারম্যান, সরকারি আমলাসহ বিভিন্ন মহলের দুর্নীতির অশুভ হিংস্র থাবা। দুর্নীতিবাজদের ধর্মই যেন দুর্নীতি করা তাই প্রমাণ করল করোনাকালে। কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না এ প্রবাদের বাস্তব প্রতিফলন দেখিয়েছে কিছু মানুষরূপের পশুরা। করোনাকালে কর্মহীন মানুষের জন্য বরাদ্ধকৃত তেল, চাল সবই হাতিয়ে নিয়ে নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত। যেখানে আজ মানুষের বেঁচে থাকা অনিশ্চিত সেখানে জনগণের অধিকার কেড়ে পরিবারের সদস্যদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতকরণে ব্যস্ত স্থানীয় প্রতিনিধিরা। যা বিকলাঙ্গ সমাজব্যবস্থায় অসুস্থ মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ মানুষের কাজ। এই দুর্নীতিগ্রস্ত ও বিকলাঙ্গ সমাজব্যবস্থা মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে যুবসমাজ। জনসংখ্যায় জর্জরিত দেশ সঙ্গে দুর্নীতিতে জর্জরিত বিভিন্ন মহল। এ  দেশকে দারিদ্র্যসীমা আর দুর্নীতির তলদেশ থেকে উঠিয়ে আনার জন্য গড়ে তুলতে হবে যুবসমাজকে। আর সমাজ গঠনের কারিগর শিক্ষা। শিক্ষা একটি দেশকে সভ্য করে গড়ে তুলতে পারে, পারে অন্ধকারে আচ্ছন্ন একটি ভূখন্ডতে সভ্যতার আলো জ্বালতে।  সেই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েই রয়েছে আমাদের হাজারো প্রশ্ন। এ দেশের শিক্ষ্যব্যবস্থা ক্রটিপূর্ণতায়  ঘেরা। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থায় অসুস্থতার প্রতিচ্ছবিতে ঘেরা। শিশুদের মস্তিষ্কের চিন্তাশক্তির প্রসারতাকে বাধাগ্রস্ত করে তোতাপাখির মতো প্রশ্ন মুখস্থ করানো হয় পরীক্ষার জন্য। যার ফলে মানবিক বা মূল্যবোধ তৈরিতে বাধাগ্রস্ত হয় যার প্রভাব পড়ে জাতীয়জীবনে, দেশকে ভুলে গিয়ে যুক্ত হয় দুর্নীতির সঙ্গে। স্বাধীনতার এতদিন পরও আমরা গ্রাম এবং শহরের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামো একই আনতে পারিনি। যার ফলে হাজার হাজার গ্রামে রয়ে  গেছে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব। যদিও সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে প্রশংসনীয় অনেক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে এই পিছিয়ে পড়া গ্রামগুলোকে এগিয়ে নিতে। তবে মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতি আর স্কুল, কলেজের গন্ডি পার না হওয়া স্থানীয় প্রতিনিধিদের বিকলাঙ্গ মস্তিষ্কের কাছে পর্যবসিত হচ্ছে এসব প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। রাষ্ট্রের কাছে সব জনগণই সমান। শহরের সঙ্গে পাল¬া দিয়ে বাড়াতে হবে গ্রামের সামাজিক কাঠামোর উন্নয়ন। এ জন্য গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন। এ দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যুবক-যুবতী/তরুণ সম্প্রদায়। নেই যথেষ্ট কর্মসংস্থান। রাষ্ট্রীয় পদগুলোর আজ বেশির ভাগ স্বজনপ্রীতিতে পরিপূর্ণ। যা মাত্রাতিরিক্ত দুর্নীতির কারণ। শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে এই বিশাল বেকারত্ব ঘোচানো সম্ভব নয় প্রয়োজন সামাজিকভাবে সম্মিলিত প্রচেষ্টা। যে তরুণ প্রজন্ম সামনের দিনে দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা তারা আজ জড়িয়ে পড়ছে নানান অসামাজিক কর্মকান্ডে। এই দায় শুধু সরকারের একার নয়- সমাজব্যবস্থা এবং পরিবারেরও। আজ সমস্যা হলে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই সমস্যার সমাধান খুঁজি। তবে সমস্যার সমাধান খোঁজা যতটা জরুরি তার চেয়ে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার কারণ খোঁজাটাও জরুরি। সমস্যার উৎপত্তি স্থলটা যদি বন্ধ করা যায় তাহলে দেশ ও সমাজ নিরাপদ থাকে। তাই তাৎক্ষণিক সমস্যার সমাধানের চেয়ে সমস্যার উৎপত্তি স্থলে সমস্যা রোধ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। যেমন- একটা শিশুকে তার পরিবার যে শিক্ষা দেয় শিশু সেভাবেই বেড়ে ওঠে। পরিবার থেকে পাওয়া মূল্যবোধ, আচার, আচরণ, সাংস্কৃতিক নিয়ে গড়ে ওঠে। দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা পরিবারের সংখ্যা কম নয়। সে জন্য সব জায়গায় সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ সম্ভব হয় না। ফলে তারা অভাবের তাড়নায় নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে  বেড়ে ওঠে। পরে লিপ্ত হয় বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ডে। মাদকের মরণ গ্রাসে যুবসমাজ ঝুঁকে পড়ে ফলে বৃদ্ধি পায় চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণের মতো ঘটনা। এসব থেকে আমাদের যত দ্রম্নত সম্ভব  বেরিয়ে আসতে হবে, নতুবা আমরা একদিন সামাজিকভাবে বিছিন্ন হয়ে পড়ব। বিশ্ববুকে আমাদের যে সুনামটুকু অবশিষ্ট তা অতি শিগগিরই মুছে যাবে।

 

 

 

আরো খবর...