দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিদিন আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করছি – স্বাস্থ্য সচিব

ঢাকা অফিস ॥ স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আবদুল মান্নান বলেছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিদিন আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করছি। স্বাস্থ্যের ডিজির কাছে ব্যাখা চাওয়া, গত রোববারও একজন প্রফেসরের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। ঢাকা নয়, নারায়ণগঞ্জেও যদি এমন কোনো তথ্য থাকে আমাদের জানান। মিডিয়াই আমাদের ভরসা। আমরা দুর্নীতির কোনো জায়গাই ছাড়তে চাচ্ছি না। আমি এক দিন, এক ঘণ্টা, এক মিনিটও দুর্নীতির সঙ্গে থাকতে চাই না। তিনি বলেন, আমাদের কাছে তথ্য প্রমাণ আসার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আমরা বসে থাকবো না। সবচেয়ে বড় কথা সত্য যেন বের হয়ে আসে। আমরা সত্যের সঙ্গে থাকতে চাই। যারা অপরাধ করবে তারা সবাই আইনের আওতায় আসবে, আসা উচিত। আমাদের অনেক সময় তথ্য উপাত্ত পেতে অনেক দেরি হয়, সেটি আপনাদের কাছে থাকলে আমাদের জানাবেন। গতকাল সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলার স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্য সচিব এসব কথা বলেন। আব্দুল মান্নান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময় বলেছেন এদেশে দুর্নীতির কোনো স্থান নেই। দুর্নীতি দমন কমিশনও এ নিয়ে কাজ করছে। আমি নির্ভয়ে বলতে চাই, যারা অপরাধ করবে তারা যে প্রতিষ্ঠানই হোক না কেন বা যে ব্যক্তিই হোক না কেন দেখার বিষয় না, আমরা অপরাধ দেখে প্রতিষ্ঠান একেবারে সিলগালা করে দেবো। তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ করোনার শুরু থেকে হটস্পটে পরিণত হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জ এখন একটা পর্যায়ে এসেছে। এখানে যারা স্বাস্থ্যসেবা ও করোনা নিয়ে কাজ করছেন তাদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে আজ এখানে এসেছি। ডাক্তাররা ফ্রন্টলাইন যোদ্ধা তাই তাদের কাছে এসেছি তাদের কথা শুনতে। এতে তাদের মনোবল ফিরে আসবে। তাদের ডেকে ঢাকায় নিয়ে কথা বলার চাইতে তাদের কাছে এসে আমি কথা শুনবো বলেই এখানে আসা। তাদের কাছ থেকেই আমি জানবো সমস্যাগুলো কোথায়, যাতে মানুষ সেবা পায় এবং জনগণের সেবা নিশ্চিত করা যায়। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, রোগী কেন দিন দিন কমে যাচ্ছে সেটি দেখবো আমরা। যদি খানপুরে করোনা হাসপাতালে ৮০ জন ডাক্তার ও ২৬ জন রোগী থাকে তাহলে সেটি কেন দেখতে হবে। ভেতরে আরও সমস্যা আছে কিনা আমরা দেখবো। আর কয়েকদিন দেখার পর এ হাসপাতালে দু’টি পথ করে একটি কোভিড ও অন্যটি সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, কোনো হাসপাতাল যদি নিয়মের বাইরে গিয়ে টেস্ট করায় কিংবা বেশি টাকা আদায় করে সেটি স্বাস্থ্য বিভাগের মাধ্যমে আমরা ব্যবস্থা নেবো। অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি কোভিড হাসপাতালের বাইরে দিয়েও যায় না অথচ আমাদের ডাক্তাররা জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে কাজ করছেন তাই তাদের প্রণোদনার ব্যাপারটি দেখা হচ্ছে।  সচিব আবদুল মান্নান বলেন, করোনায় আমার স্ত্রীকে হারিয়েছি। তার সঙ্গে শেষ সময় পর্যন্ত হাসপাতালে থাকলেও পরে ২ বার পরীক্ষা করানোর পরও আমার বড় ছেলের করোনা নেগেটিভ আসে। সন্দেহ হওয়ায় তৃতীয়বার পরীক্ষা করা হয়। তখন তার করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। করোনা নেগেটিভের রিপোর্ট ফলস হতে পারে, কিন্তু পজিটিভ মানে পজিটিভ। ফলে টেস্ট নিয়ে আমাদের হতাশা আছে। সচিব বলেন, বড় ছেলে হাসপাতালে আমার স্ত্রীর সঙ্গে একটানা ৪ দিন ছিল। মাকে ছেড়ে ১ ঘণ্টার জন্যও সে অন্য কোথাও যায়নি। মাও ছেলেকে ছাড়েনি। ছেলের মুখের কাছেই তার শেষ নিঃশ্বাস পড়েছে। বড় ছেলের সঙ্গে আমার মেয়ে ও ছোট ছেলেও ছিল। স্ত্রীর দাফন করে এসে দেখলাম ৪ দিন হাসপাতালে মায়ের সঙ্গে থাকলেও বড় ছেলের করোনা রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। আমরা বললাম, তার রিপোর্ট তো নেগেটিভ হতে পারে না। পরে আরেক জায়গায় টেস্ট করালাম, সেখানেও নেগেটিভ। দুইবার নেগেটিভ আসায় আমি ভাবলাম কী আর করা যায়। কিন্তু আমার ছেলে ডাক্তার হওয়ার কারণে বললো, কোভিডের যে চরিত্র, তাতে কোনোভাবেই আমার নেগেটিভ হতে পারে না। ছোট ভাই ও বড় বোনেরও নেগেটিভ হতে পারে না, যেহেতু মৃত্যুর আগে সবাই মাকে জড়িয়ে ধরেছে। পরে তৃতীয় বার টেস্টে আমার ছেলের করোনা পজিটিভ পাওয়া যায়। তখন তাদের হাসপাতালে ভর্তি করি। সেখানে তারা ১৩ দিন ছিল। আমার ছেলের বয়স ২৭ বছর, তাকে আল্লাহ রক্ষা করেছে। আমি যদি তার নেগেটিভ রিপোর্ট নিয়ে বসে থাকতাম আর বলতাম যে, বাবা যেহেতু নেগেটিভ ঘরেই থাকো, তাহলে জানিনা কী হতো। এজন্য টেস্ট নিয়ে আমাদের হতাশা রয়েছে। নেগেটিভ ফলস হতে পারে কিন্তু পজিটিভ মানে পজিটিভ। এর মধ্যে দুর্বৃত্তরা আবার কোনো টেস্ট না করেই বলছে নেগেটিভ। তাদের কোনো রেহাই নাই। নারায়াণগঞ্জেও যদি এমন কিছু হয়ে থাকে, তাহলে আমি বলে যাচ্ছি, সিভিল সার্জন ব্যবস্থা নেবেন। এইসব দুর্বৃত্তরা বিদেশেও লোক পাঠিয়ে দিচ্ছে মানুষকে ফলস করোনা সার্টিফিকেট দিয়ে। এয়ারপোর্টে নামার পর সেই সব দেশ আবারও বাংলাদেশের মানুষকে ফেরত পাঠাচ্ছে। এই রিজেন্টের মতো, জেকেজির মতো আরও অনেকেই আছে। আমরা এসব ব্যাপারে অনুসন্ধান করছি, কাউকেই ছাড়বো না। দেশ নিয়ে, দেশের মানুষ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলছে তাদের ছাড় নেই। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে সচিব বলেন, আমার পরিবারে দুইজন ডাক্তার, কিন্তু স্ত্রীর মৃত্যুর সময় কাজে লাগেনি। আপনারা যথাযথভাবে বেতন পাচ্ছেন, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, এসবের জন্য অন্তত মিনিমাম নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যান্য সার্ভিস থেকে আপনাদের সার্ভিসের সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। আমি যথাযথ দায়িত্ব পালন করা সবাইকে প্রমোশন দিতে চাই। কিন্তু করোনার বাইরেও যদি অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত রোগী আসেন আর আপনারা চিকিৎসা না করেন সেটি আমরা সহ্য করবো না। চাকরি জীবনের শুরুর দিকের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, হারিকেন দিয়ে ইউএনওগিরি করসি। স্ত্রীকে ফোন করতে ১০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে কথা বলতে হতো। এখন তো সেই অসুবিধা নেই, ভিডিও কলের সুবিধাও আছে। ফলে আমাদের তো প্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা আর বেতনের টাকা হালাল করতে হবে। আপনার এখানে সেবা পায়নি বলে রোগী যদি চলে যায়, এটা আমি ভালোভাবে নেব না। আপনাদের এখানে সার্ভিস তারা পাচ্ছে না বলে ঢাকায় ভিড় জমাচ্ছে, এটা আর হতে দেওয়া যাবে না। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন- স্বাস্থ্য বিভাগের যুগ্ম সচিব উম্মে সালমা তানজিয়া, জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন চৌধুরী, জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইমতিয়াজ, খানপুর করোনা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. গৌতম রায়, আড়াইহাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সায়মা আফরোজ ইভা, সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

আরো খবর...