তিল থেকে তাল, অতঃপর

 ॥ ড. এমএলআর সরকার ॥

যুগান্তরে করোনা নিয়ে ‘তাপমাত্রার খেলা এবং আমাদের অবহেলা’ শিরোনামে আমার একটি লেখার সারমর্ম ছিল এরূপ- তাপমাত্রা বা পরিবেশের কারণে ইউরোপ বা আমেরিকার তুলনায় করোনার ভয়াবহতা উপমহাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোতে কম। অতিমাত্রায় আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের অবশ্যই কঠোর সাবধানতা অবলম্বন জরুরি। কারণ এ অঞ্চলের দেশগুলো জনবহুল এবং চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত নয়। আমি আরও লিখেছিলাম, আমরা সাহায্য না করলে করোনা একজন থেকে আরেকজনকে আক্রান্ত করতে পারবে না এবং লাখ লাখ লোককে মৃত্যুমুখে পতিত করতেও পারবে না। তবে শুধু লকডাউন করে রাখলেই করোনার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হচ্ছে, গলাবাজি বন্ধ করে যত দ্রুত সম্ভব প্রয়োজনীয় টেস্টিং কিট এবং ডাক্তারদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা করা। সামান্য লক্ষণও যাদের আছে, তাদের সবাইকে দ্রুত পরীক্ষা করা এবং মানুষকে পরীক্ষা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা। না হলে ধীরে ধীরে অনেক বড় পরিসরে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারে। একবার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে গেলে আমাদের কারও রক্ষা হবে না। যখন লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল (এপ্রিল ৩), তখন আক্রান্ত ছিল ৬১ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬। মাত্র এক মাস কয়েকদিনের ব্যবধানে আজ আক্রান্তের সংখ্যা লাখ ছুঁই ছুঁই এবং মৃতের সংখ্যা হাজারের অনেক উপরে। না, আমি তিলকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে তাল বানাচ্ছি না। প্রকৃতপক্ষেই আমরা এই ভাইরাসকে তিল থেকে তালে পরিণত করেছি। শিগগিরই এই তালও যে শেষ পর্যন্ত ফুলে- ফেঁপে অন্য কিছুতে রূপান্তরিত হবে, তাতে কোনো সন্দেহ  নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এই অবস্থা? কেন এ অঞ্চলের ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। তাপমাত্রা বা আবহাওয়া কি আমাদের সহায়তা করছে না? হ্যাঁ, অবশ্যই করছে। কিন্তু টেস্ট, চিকিৎসা ও লকডাউন- এই তিনটি ক্ষেত্রেই চরম ব্যর্থতার কারণে আমরা আবহাওয়াগত সুবিধা পাচ্ছি না। শুরুতেই করেছি ভাইরাস নিয়ে অবহেলা, প্রস্তুতি ছিল শুধু মুখে মুখে। তারপর দেখিয়েছি অব্যবস্থাপনা- নেতৃত্ব, টেস্টিং কিট, পিপিই,  ভেন্টিলেটর, কোয়ারেন্টিন এবং লকডাউন পলিসি- সবকিছুই এলোমেলো। পরিশেষে করেছি লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশ। নিম্নবিত্ত এবং অর্থনীতিকে সচল রাখার নামে লকডাউন নিয়ে  খেলেছি হাডুডু খেলা। করোনা নিয়ন্ত্রণে টেস্ট, চিকিৎসা এবং লকডাউনের সুব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। অব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বের উন্নত দেশেও অনেক মানুষ অকালেই করোনায় প্রাণ হারিয়েছে বা হারাচ্ছে। আবার সু-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অনেক অনুন্নত দেশও করোনা নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে, যেমন ভিয়েতনাম। আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে সু-ব্যবস্থাপনা ও কু-ব্যবস্থাপনার প্রভাব অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারব, যদি ভারতের কেরালা রাজ্যের সঙ্গে অন্য রাজ্যের করোনা সংক্রমণের তুলনা করি। অব্যবস্থাপনার কারণেই আমরা করোনা নিয়ন্ত্রণে হেরে গেছি এবং যাচ্ছি। কথা হচ্ছে, এই ব্যর্থতা কোথায় নিয়ে যাবে আমাদের? দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কেউ বলেছেন বা বলছেন সর্বোচ্চ আক্রমণ হবে মে মাসের মাঝামাঝি বা শেষে, কেউ বলছেন জুনের মাঝামাঝি বা শেষে। আবার কেউ বলছেন জুলাই কিংবা আগস্টের মাঝামাঝি বা শেষে। কিন্তু কোনো মডেলই আমাদের কাজে আসছে না। আমার মনে হয়, হবেও না। কারণ বিভিন্ন দেশের করোনা তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা ভেবেছেন, আমাদের  দেশেও হয়তো ৭০ অথবা ৮০ দিন অথবা ৯০ দিনের মধ্যেই চিকিৎসা এবং অন্যান্য ঘাটতি পূরণ হবে এবং করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার এবং পরিকল্পনার যে ঘাটতি, তা কি আসলেই পূরণ সম্ভব? যদি না হয়, তাহলে মডেল কাজ করবে কী করে? আমরা অনেকেই ভাবছি, এ অবস্থায় আমাদের কী হতে পারে? হ্যাঁ, আমিও ভাবছি। কিন্তু সঠিক উত্তর আমারও জানা নেই। তবে আমি একটি উদাহরণ দিচ্ছি। একটি স্থানে আগুন লাগার কথা চিন্তা করুন। যখন আগুন লাগে তখন লোকজন তাদের যা কিছু আছে তা দিয়েই আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। ফায়ার সার্ভিস এসে পানি ছিটানোর আগ পর্যন্ত আগুন বাড়তেই থাকে। ফায়ার সার্ভিস এসে পানি ছিটানো শুরু করলে আগুনের বিস্তার রোধ হয় এবং পর্যাপ্ত পানি ছিটানোর পর আগুনের শিখা কমতে কমতে পরিশেষে আগুন নিভে যায়। দক্ষ ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা এবং আবহাওয়া সহায়ক হলে অতি কম সময়ে আগুন নিভে যায় এবং ক্ষতিও কম হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যদি ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা ভালো না থাকে, যদি তাদের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না থাকে, যদি ফায়ার সার্ভিস দেরি করে আসে, যদি আসার পর তারা পানি সরবরাহ না পায়, যদি ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ভয়ে আগুনের কাছে না আসে, তাহলে কী হয়? মানুষ নিজ চেষ্টায় যেটুকু পারে রক্ষা করে। বাকিটুকু  চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, যদি না সৃষ্টিকর্তার অসীম দয়ায় প্রবল বৃষ্টিপাত বা অন্য কোনোভাবে আগুন এমনিতেই নিভে না যায়। নিদারুণ অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় আমাদের ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা (চিকিৎসাব্যবস্থা) পুরোপুরি ধ্বংসপ্রাপ্ত। ফায়ার ফাইটারদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নেই। অধিকাংশ ফায়ার ফাইটার (ডাক্তার) নিরাপত্তার অভাবে আগুনের কাছেই যাচ্ছে না। আবার অনেক ফায়ার ফাইটার আগুন নেভাতে গিয়ে অকালে জীবন হারিয়েছেন। চীনে সংক্রমণের পর যথেষ্ট সময় (প্রায় দুই মাস) পেয়েও আমরা মাত্র একটি পরীক্ষাগার দিয়ে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছিলাম। এখন পরীক্ষা করানো হচ্ছে ৫০টির বেশি পরীক্ষাগারে। প্রথম লকডাউনের (২৫.০৩.২০) দুই মাস পর এখন (১০.০৬.২০)  মেয়র আতিকুল ইসলাম বলছেন, তারা পরীক্ষামূলকভাবে পূর্ব রাজাবাজার এলাকা লকডাউন করছেন। প্রিয় পাঠক, এখন আপনারাই ভেবে দেখুন কী হতে পারে আমাদের অবস্থা। দেশে করোনা আগুন জ্বলছে। শুধু বড় বড় শহরেই নয়, উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলেও ভাইরাস ছড়িয়ে গেছে। এখনও শত শত মানুষ করোনা পরীক্ষা করানোর জন্য দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পরীক্ষা করাতে পারছেন না। পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি এবং টিভিতে অনেক বলাবলির পরও আমরা এখনও পর্যন্ত পর্যাপ্তসংখ্যক পরীক্ষা করাতে ব্যর্থ। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় করোনার চিকিৎসা এবং  ভেন্টিলেটর সাপোর্টের জন্য মানুষের দুর্ভোগ এবং হাসপাতাল  থেকে হাসপাতালে ঘোরার খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এ অবস্থার একটা বিহিত হওয়া জরুরি। আমাদের একটি উপায়  বের করতেই হবে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়বেই। মৃত্যুর সারি লম্বা হবেই। চিকিৎসাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। আমরা অনেককেই হারিয়েছি এবং আরও অনেককে হারাব। হ্যাঁ, এই মহামারী থেকে রক্ষার জন্য কঠোর লকডাউন প্রয়োজন। এই আগুন থেকে বাঁচতে যেভাবে হোক আমাদের ঘর আমাদেরই সামলাতে হবে। তবে শুরু হয়েছে পর্যায়ক্রমে নতুন লকডাউন। আশা করি এ লকডাউন হবে একটি পরিপূর্ণ এবং পরিকল্পিত লকডাউন। তবে লকডাউনের আগে অবশ্যই  টেস্ট, চিকিৎসা (বিশেষ করে আইসোলেশন এবং অক্সিজেনের ব্যবস্থা) এবং নিম্নবিত্তের পর্যাপ্ত সাহায্যের (লকডাইনের সময়) বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত টেস্টের ব্যবস্থা না করলে এই লকডাউনও ব্যর্থ হবে, কারণ ১৪ দিনের মধ্যেই অথবা ১৪ দিন পর আমাদের অবশ্যই জানতে হবে কে আক্রান্ত এবং কে আক্রান্ত নয়। যেসব বাসায়  বেশি মানুষ বসবাস করে, সেসব বাসায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা করতে না পারলে ১৪ দিনের শেষে হয়তো দেখা যাবে ওই বাসার সবাই আক্রান্ত হয়েছে। এই লকডাউন বেশ কিছুদিন চালাতে হতে পারে। সরকার করোনার জন্য ১ লাখ ৩ হাজার ১১৭ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে। আমরা যদি নিম্নবিত্ত এক কোটি লোককে ২৫০০ টাকা করে এক মাস দিই, তাহলে প্রয়োজন ২৫০০ কোটি টাকা। আর যদি আমরা দুই কোটি লোককে দুই মাস সহায়তা দিই, তাহলে প্রয়োজন মাত্র ১০ হাজার কোটি টাকা। হ্যাঁ, এক সময় যন্ত্রপাতি ক্রয় করা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু এখন  সেই অবস্থা আর নেই। এই বিশাল বাজেটের কিছু টাকা খরচ করে সরকারি পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ করলে অতি অল্প সময়েই পিসিআর মেশিন ক্রয় করে বর্তমান ল্যাবগুলোর সক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়ানো সম্ভবপর। যদি সত্যিই নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় করা সম্ভবপর না হয়, তাহলে এ অঞ্চলের দেশসহ (যেমন চীন, হংকং, তাইওয়ান, জাপান ও দক্ষিণ  কোরিয়া) বিশ্বের অন্যান্য দেশ, যারা করোনা নিয়ন্ত্রণে এনেছে, তাদের আমরা অনুরোধ করতে পারি। এই দেশগুলোর কাছে বর্তমানে অনেক অব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আছে। সাহায্য চাইলে কেউ না কেউ আমাদের একটু সাহায্য করবে। মনে হয় আমাদের অবস্থার ভয়াবহতা ব্যাখ্যা করতে পারলে অনেকেই সাহায্য করবে। সরকার বা অনেকেই বলতে পারেন, এটি তো মান-সম্মানের ব্যাপার। কিন্তু ব্যাপারটি তা নয়। এই মহামারীতে অনেক দেশই অন্য দেশকে সাহায্য করছে। আমেরিকা আমাদের কাছ থেকে পিপিই নিয়েছে, ভারতের কাছ থেকে অনেকটা চাপ প্রয়োগ করেই ওষুধ নিয়েছে, কানাডাকে পর্যন্ত আমেরিকা মাস্ক নিতে দেয়নি। আমেরিকা সবই করেছে তাদের জনগণের স্বার্থে। মালয়েশিয়া আমাদের কাছ থেকে ওষুধ চেয়েছিল। দক্ষিণ আফ্রিকা আমেরিকার নিষেধ উপেক্ষা করে কিউবা থেকে ২০০ ডাক্তার এপ্রিল মাসে এনেছে। ইতালি অনেক দেশ থেকে সাহায্য নিয়েছে। শুধু কি তাই, আমেরিকা, ইউরোপ, কানাডা, ভারত ইতোমধ্যে চেষ্টা করছে কীভাবে পর্যাপ্তসংখ্যক অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তাদের জনগণের জন্য আগে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে আছি। মানসম্মান নয়, কথা হচ্ছে, আপনি কার জন্য করছেন। সরকার তার জনগণের কল্যাণে অন্য দেশকে অনুরোধ করছে। এতে লজ্জার কিছু নেই। বরং এ কাজে আছে জনগণের প্রতি সরকারের ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। কথায় আছে, চেষ্টা করলে বাঘের দুধ  মেলানো সম্ভবপর। প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করে অনেক ব্যস্ত মানুষ ডা.  দেবী শেঠীকে এনেছিলেন মাত্র একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে। আজ দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপদাপন্ন। ধনী-গরিব প্রত্যেক মানুষের জীবন তার পরিবারের কাছে অপরিসীম। এই  লোকগুলোর জীবন বাঁচাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী চেষ্টা করলে বিদেশ  থেকে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনতে পারবেন না এটি বিশ্বাস করা কঠিন। চীন থেকে বিশেষজ্ঞ দল এসেছে। আমাদের প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ, পিসিআর মেশিন; ভেন্টিলেটর না হলেও অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা। ভুল অনেক হয়েছে। অনেক দেরি হয়েছে। আর  দেরি না করে এখনই চেষ্টা করুন, যাতে ভ্যাকসিন আসার আগেই আমরা হেরে না যাই। বঙ্গবন্ধুর সোনার দেশ যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত না হয়। লেখক ঃ প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

 

আরো খবর...