তরল জৈব সার প্রয়োগে ফলন বহুগুণে বেশি হয়

কৃষি প্রতিবেদক ॥ গবেষণায় আজ প্রতিষ্ঠিত যে, গাছ তার প্রয়োজনীয় মুখ্য ও  গৌণ খাদ্যোপাদান পাতা ও কান্ডের মাধ্যমে একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় সহজেই গ্রহণ করতে পারে, যাকে বলে ফলিয়ার ফিডিং মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ফলিয়ার সার প্রয়োগের ফলে গাছের অঙ্গঁজ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শিকড়ের মাটি  থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান গ্রহণ ও কার্যক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। গাছ যখন মাটি থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্যোপাদান গ্রহণ করতে পারে না বা পায় না, এমন অবস্থায় বিকল্প হিসেবে ফলিয়ার ফিডিং কার্যকর। মাটিতে প্রয়োগকৃত সারের তুলনায় ফলিয়ার ফিডিং শতকরা ১০০-৫০০ ভাগ বেশি কার্যক্ষমতা দেখায়। গবেষণায় দেখা যায় ফলিয়ার ফিডিংয়ে মাটিতে প্রয়োগকৃত সার ব্যবস্থাপনার তুলনায় অনেক কম পরিমাণে সার প্রয়োগ করতে হয়। গাছে এক বা একাধিক খাদ্যোপাদানের অভাবজনিত লক্ষণ দেখা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফলিয়ার ফিডিংয়ের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট খাদ্যোপাদানের অভাব দূর করা যায়। এতে একদিকে গাছ যেমন প্রয়োজনীয় খাদ্য সরাসরি পায়, অন্যদিকে অপচয় কম হওয়ায় খাদ্যোপাদানের সাশ্রয় হয়। আধুনিক কৃষি এ বিষয়গুলো বিবেচনা করেই এখন গাছের সব খাদ্যোপাদান মাটিতে প্রয়োগ না করে সরাসরি গাছের পাতায় বা কান্ডে অর্থাৎ ফলিয়ার ফিডিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ফলিয়ার ফিডিংয়ের জন্য তরল সার অজৈব (ইনঅর্গানিক) বা জৈব (অর্গানিক) উৎস থেকে প্রস্তুত করা যায়। ফলিয়ার ফিডিংয়ের সার গাছের সঙ্গে মানানসই উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়। যেমন ইউরিয়ার জন্য ইউরিয়ার পলিমার; ইউরিয়া-ফরমালডিহাইড পানিতে নিম্ন ঘনমাত্রায় মিশ্রিত করে প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে ইউরিয়া স্বল্পমাত্রায় সরাসরি পানিতে মিশিয়েও ব্যবহার করা যেতে পারে। এভাবে অন্যান্য সারও এককভাবে অথবা বিভিন্ন সারের মিশ্রণ পানিতে স্বল্প পরিমাণে মিশিয়ে ফলিয়ার ফিডিং তৈরি করা যায়। আবার অর্গানিক উৎস থেকেও তরল জৈব সার  তৈরি করা যেতে পারে। তরল অজৈব সার পাশাপাশি তরল জৈব সারের ব্যবহার আমাদের কৃষি সেক্টরকে আরো সমৃদ্ধ করেছে এবং পরিবেশবান্ধব বলে এর ব্যবহার দ্রুত বেড়ে চলেছে বিশ্বজুড়ে। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মাটির উর্ব্বরতা শক্তি দিন দিন কমে আসছে। তরল জৈব সারই পারে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মুখে খাবার তুলে দিতে, তথা কৃষির বিপ্লব ঘটাতে। পাশাপাশি পরিবেশ এটি মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তরল জৈব সার প্রয়োগে উৎপাদিত ফসলে পুষ্টিমান ও স্বাদ বৃদ্ধি পায়। সমীক্ষায় দেখা  গেছে, তরল জৈব সারের রেসিডুয়াল বা ক্ষতিকর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফসলে  দেখা যায় না। তরল রাসায়নিক সার প্রয়োগে উৎপাদিত ফসলের তুলনায় সমপরিমাণ তরল জৈব সারের ফলন বহুগুণে বেশি হয়। তরল জৈব সারের সুবিধাগুলো হলোথ পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী, এবং সার তৈরি ও প্রয়োগ পদ্ধতি সহজ এবং প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে গাছ বা ফসলের গ্রহণ উপযোগী হয়। তরল  জৈব সারের হরমোন থাকে যা বায়োস্টিমুলেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং ফসলকে পোকামাকড় ও রোগ থেকে আগলে রাখে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তরল জৈব সার থেকে যেমন ফসল সব মেক্রো খাদ্যোপাদান পাচ্ছে সঙ্গে অধিকাংশ মাইক্রো খাদ্যোপাদানগুলোও পাচ্ছে। ফলে ফসলের ফলনের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিমান ও স্বাদ বৃদ্ধি পায়। উন্নত বিশ্বে তরল জৈব সার (লিকুইড অর্গানিক ফার্টিলাইজার) প্লান্ট টি নামে অবিহিত করা হয়ে থাকে। তরল জৈব সার বা প্লান্ট টি সাধারণত কটন সিডমিল, খৈল, বস্নাড মিল, ফিস ইমালশান, এর নির্যাস থেকে তৈরি করা হয়ে থাকে। তুলা উৎপাদনের সময় বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে কটন সিডমিল পাওয়া যায়। যাতে ৭% ঘ, ৩% চ২০৫ এর ২% শ২০ থাকে। আর নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ ব্লড মিল (১০-১২%) যাতে আয়রন প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। খুবই কার্যকরী অর্গানিক পদার্থ যার নির্যাস থেকে অতি কার্যকরী তরল   জৈব সার তৈরি করা যায়। তা ছাড়া খৈল, মোনউর, কম্পোস্ট থেকেও কার্যকরী তরল জৈব সার তৈরি করা যেতে পারে। এ ছাড়া বাজারেও কিছু  তৈরি জৈব তরল সার এসেছে যা ইতোমধ্যেই কর্মাশিয়াল ফুল ও শাক-সবজি উৎপাদনে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। জৈব তরল সার নির্দ্বিধায় আধুনিক পরিবেশবান্ধব ও উপযোগী সার হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সুস্থ, সুন্দর, অধিক পুষ্টিমানের ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবারের স্বাস্থ্য ও মনের শান্তির নিশ্চয়তা হচ্ছে জৈব তরল সার।

 

আরো খবর...