ঢোকা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত একজন হাজতির অর্থ খসাতে হয়, সাজাপ্রাপ্ত আসামীদের নিয়ন্ত্রণে ওয়ার্ড

কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের পরতে পরতে দুর্র্র্র্নীতি
খাবার ও হাসপাতালের বেড নিয়ে বাণিজ্য

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের পরতে পরতে দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। একজন আসামীকে কারাগারে ঢোকা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত টাকা গুনতে হয়। টাকা থাকলে কুষ্টিয়া কারাগারে রাজার হালে থাকা যায় আর টাকা দিতে না পারলেই নেমে আসে নানা নির্যাতন।

ঠিকাদার নিয়োগ, খাবার মান, হাসপাতালের বেড বাণিজ্য থেকে শুরু করে ওয়ার্ড পর্যন্ত নিলামে বিক্রি করে দেয়া হয়। এ থেকে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা বাণিজ্য করছেন জেল সুপারসহ আরো কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা আসামী ও তার পরিবারের লোকজনকে জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ। সম্প্রতি জেল থেকে ছাড়া পেয়েছেন এমন বেশ কয়েকজন কয়েদি ও হাজতির সাথে কথা হলে অভ্যন্তরীন নানা দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। জেলা কারাগারের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি যাতে বাইরে না আসে যে জন্য ম্যানেজ করা হয় বিভিন্ন দপ্তরকে।

পারিবারিক একটি মামলায় জেলে যাওয়া এক হাজতি বর্তমানে জামিনে বাইরে আছেন। কথা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘ কারাগারে যাওয়ার পর প্রথম রাতে আমদানি ওয়ার্ডে রাখা হয়। পরের দিন সকালে গননা, মেডিকেল ও চুলছাটাসহ অন্যান্য কাজ শেষে কারাগারের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পাঠানো হয়। এর মধ্যে কারাগারের অপেক্ষাকৃত যে ওয়ার্ডে সুযোগ-সুবিধা ভাল সেখানে অর্থের বিনিময়ে হাতজিতের পাঠানো হয়। আর যারা টাকা দিতে পারেন না, তাদের টয়লেটের পাশেসহ খারাপ জায়গায় পাঠানো হয়। ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেয় ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা ম্যাটরা (যারা বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত) নেন। তবে এক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময় সিগারেট নেন তারা। এসব সিগারেট কারাগারে সোনার দামে বিক্রি হয়। বিভিণœ ব্যান্ডের সিগারেট নেন কারারক্ষী ও সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা। তারা পরে বিক্রি করেন অন্য হাজতিদের কাছে। কারাগারের সিগারেটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ সাজাপ্রাপ্ত আসামীরা জেল সুপারকে অর্থ দিয়ে প্রতিটি ওয়ার্ড কিনে নেন। একেকটি ওয়ার্ড প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা সেল হয়। ম্যাটরা প্রতিটি হাজতির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে তাদের নানা সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দেন। আর যারা টাকা দিতে পারেন না তাদেরকে নানাভাবে মানসিক নির্যাতন করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারা পুলিশ বলেন,‘ ওয়ার্ডগুলোতে টাকা পয়সার লেনদেন হয়। এ টাকার ভাগ কারাগারের কর্মকর্তারা পান। এছাড়া বিভিন্ন সময় কারারক্ষীদের অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করে কারাগারে ফেনডিসিল ও গাঁজা প্রবেশ করার মত ঘটনা আছে। ফোনেও কথা বলার সুযোগ করে দেয়া হয়।’

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, দীর্ঘদিন কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান খাদ্য সরবরাহ করে আসছে। ঘুরে ফিরে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে তাদেরকে বারবার কাজ দেয়া হয়। অন্য কোন ঠিকাদার জেলা কারাগারে কাজ পাই না। কুষ্টিয়া ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন কারাগারে খাদ্য সরবরাহ করে আসছে। এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিন্মমানের চাল, ডাল, তেল ও মসলা সরবরাহ করার অভিযোগ রয়েছে। জেল সুপার জাকের হোসেনেসহ ডেপুটি জেলা আকতার হোসেন ও অফিস সহকারির সাথে আঁতাত করে এ প্রতিষ্ঠানটি নিন্মমানের খাদ্য সরবরাহ করে আসছে। এর বিনিময়ে সবাইকে ম্যানেজ করার জন্য লাখ লাখ টাকা নেয়া হচ্ছে বলে একটি সুত্র জানিয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও জেলা জজসহ অন্য কর্মকর্তারা একাধিক দিন গিয়ে নিম্নমানের খাদ্যে পেয়েছেন বলে জানা গেছে। এরপর যখনই পরিদর্শক টিম যাওয়ার খবর পান সেদিনই খাবারের মান ভাল করা হয়। একাধিক হাজতি বলেন,‘ আগে থেকে পরিদর্শনে আসার খবর পেলে খাবারের মান বদলে যায়। আর অন্যদিন খাবারের মান একেবারের নিম্নমানের হয়। সবজি, মাছ  ও মাংসসহ সব খাবারের ভেজাল রয়েছে। বিশেষ করে খাসি মাংস ও ষাড়ের মাংস দেয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ দিন ধাড়ী ও গাভির মাংস সরবরাহ করা হয়। খড়ি নিয়েও করা হয় বাণিজ্য। এছাড়া জেল কারাগারের জায়গায় উৎপাদিত সবজিসহ অন্যান্য পণ্য নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও বাণিজ্য চলছে।

আর এক প্রকার সবজি রান্না করে তিন থেকে ৪ প্রকার সবজির বিল দেখানো হয়। পাশাপাশি পাংঙ্গাস ও সিলর্ভার কার্প মাছ সরবরাহ করে বিল তুলে নেয়া হয় রুই ও কাতলার। আর মাছের যে সাইজ দেয়ার কথা তাও পান না কয়েদি ও হাজতিরা। এসব নিয়ে মুখ খুললেই শাস্তি দেয়া হয়। আর চুন থেকে পান খসলেই জেলা সুপার ও ডেপুটি জেলার হাজতিদের ওপর নানা রকম নির্যাতন চালান বলেও অভিযোগ উঠেছে।’

জেল কারাগারের হাসপাতাল নিয়ে চরম বাণিজ্য রয়েছে। অসুস্থরা জায়গা না পেলেও বেড প্রতি মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে সুস্থরা হাসপাতালে রাজার হালে থাকেন। সেখানে তারা সাধারন অসুস্থদের জন্য যে খাবার ও ফল বরাদ্দ তা তারা খান। যারা বিত্তশালী হাজতি তাদের দখলে হাসপাতালের বেড। অর্থ ছাড়া কোন বেড মেলে না হাসপাতালে। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ থাকলেও প্রতিকার মেলে না। কারণ পরিদর্শন টিম যাওয়ার আগে সবাইকে সজাগ করে দেয়া হয়। কেউ মুখ খুললেই তার ওপর শাস্তি নেমে আসে। এ কারনে ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। দিন চুক্তিতে এসব বেড ভাড়া দেয়া হয়।’

হাজতিরা জানান, কারাগারের ভিতর একটি ক্যান্টিন রয়েছে। ক্যান্টিন পরিচালনা করে কারাগার কর্তৃপক্ষ। এখানে অর্থ জমা দিয়ে মাছ মাংসসহ পছন্দের সব খাবার পাওয়া যায়। তবে নিন্মামানের খাবার সরবরাহ করে বাইরে থেকে দুই থেকে তিনগুন বেশি দাম রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাই না।

জানাগেছে, জেল সুপার তার মনোনীত কয়েকজন কারারক্ষীর মাধ্যমে অবৈধ অর্থ তোলেন। কিছুদিন আগে বিএনপির কয়েকজন সাবেক এমপিসহ নেতারা জেলে ছিলেন। তাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে বিশেষ সুবিধা দেয়া হয়। রাতের বেলাও তিনি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।’

জাকের হোসেন জেল সুপার হয়ে আসার আগেও এখানে ডেপুটি জেলার পদে চাকুরি করেছেন। সে সময় তিনি দুর্র্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। তার বিরুদ্ধে তখন থেকে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয় কারারক্ষীদের সাথেও তিনি চরম দুর্ব্যবহার করেন।

কুষ্টিয়া জেলা কারাগারের ডেপুটি জেলার আকতার হোসেনের কাছে বিভিন্ন বিষয় জানতে চাইলে বলেন,‘ কোন তথ্য ফোনে বলা যাবে না। এসব তথ্য গোপনীয়। আপনি প্রয়োজনে জেলা কারাগারে এসে দেখা করেন।’

জেল সুপার জাকের হোসেন বলেন,‘ কারাগারে কোন অনিয়ম হয় না। কারাগারে সব ভাল কাজ হয়। কোন অর্থ লেনদেন হয় না। খাবারের মান অনেক ভাল।’

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মো. আসলাম হোসেন বলেন, কারাগারে যদি কোন অনিয়ম ও দুর্নীত হয়ে থাকে সেক্ষেত্রে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরো খবর...