ড্রাম সিডার দিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে বীজ বপন

সহজ ও স্বল্প খরচ

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কাদাময় জমিতে ড্রাম সিডার দিয়ে সারিবদ্ধভাবে সরাসরি বীজ বপন ধান চাষের একটি সহজ ও উদীয়মান প্রযুক্তি। এ যন্ত্র ব্যবহার করে ধান উৎপাদনে সময়, শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব। বিশ্বের অনেক দেশেই যেমন ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনে এখন এ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। অন্য পক্ষে প্রচলিত পদ্ধতিতে চারা রোপণ করে ধান চাষের জন্য বীজতলায় চারা তৈরি, উত্তোলন, রোপণ ইত্যাদি কাজ বেশ শ্রমসাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। আউশ, আমন ও বোরো সব মৌসুমেই এ যন্ত্র দিয়ে ধান চাষ করা সম্ভব, তবে বোরো মৌসুমই হচ্ছে বেশি উপযোগী। বিশেষ করে নিচু এলাকার এক ফসলি বোরো জমি ও দুই ফসলি জমিতে যেখানে সেচের সুব্যবস্থা আছে সেখানে এ পদ্ধতিতে ধান চাষ উপযোগী হবে। প্লাস্টিকের তৈরি ছয়টি ড্রাম একটি লোহার দন্ডে পর পর সাজানো থাকে যার দৈর্ঘ্য ২ মিটার। লোহার দন্ডের দুই প্রান্তে প্লাস্টিকের তৈরি দুটি চাকা এবং যন্ত্রটি টানার জন্য একটি লোহার তৈরি হাতল যুক্ত থাকে। প্রতিটি ড্রামের দৈর্ঘ্য ২৫ সেন্টিমিটার এবং ব্যাস ৫৫ সেন্টিমিটার, যার দুই প্রান্তে ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে দুই সারি ছিদ্র আছে। প্রয়োজনে রাবারের তৈরি বেল্টের দ্বারা এক সারি ছিদ্র বন্ধ রাখা যায়। পাতলা ছিদ্র খোলা রাখলে বিঘাপ্রতি ৩ কেজি, ঘন ছিদ্র খোলা রাখলে ৫ কেজি এবং উভয় ছিদ্র একসঙ্গে খোলা রাখলে ৮ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। প্রতিটি ড্রামের ধারণক্ষমতা প্রায় ২ কেজি ধানের বীজ। তবে অঙ্কুরিত বীজ ভরার সময় লক্ষ্য রাখতে হবে যেন ড্রামের এক-তৃতীয়াংশ অবশ্যই খালি থাকে। প্রয়োজনে ড্রামের সংখ্যা কমানো বা বাড়ানো সম্ভব। বীজ বপন প্রক্রিয়া ঃ বোরো মৌসুমে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে এবং আমন মৌসুমে জুলাইয়ের মাঝামাঝিতে জমি প্রয়োজনমতো চাষ ও মই দিয়ে কাদাময় করে নিতে হবে। জমি এমনভাবে সমতল করতে হবে যেন কোথাও পানি দাঁড়িয়ে না থাকে। বোরো মৌসুমে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে অর্থাৎ শীত পড়ার আগেই বীজ ফেলে চারা প্রতিষ্ঠিত করে নিতে হবে যেন ঠান্ডায় চারা মারা না যায়। আর আমন মৌসুমে বীজ বপনের অন্তত এক দিন যেন বৃষ্টিমুক্ত রাখা যায় সেদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। বীজ আমন মৌসুমে ২৪ ঘণ্টা এবং বোরো মৌসুমে ২৪-৪৮ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হবে। পরে চটের বস্তায় শক্ত করে বেঁধে তিন থেকে পাঁচ দিন জাক দিয়ে ভালোভাবে অঙ্কুরিত করে নিতে হবে। বীজ ভালোভাবে গজায়ে না নিলে বীজ হার অনেক বেড়ে যাবে। আবার শিকড় যেন ততটা লম্বা না হয় যে একটির সঙ্গে আরেকটি জড়িয়ে যায়। অঙ্কুরিত বীজ ড্রামে ভরার আগে ১-২ ঘণ্টা ছায়ায় শুকিয়ে ঝরঝরে করে নিতে হবে যাতে বীজের শিকড় একটার সঙ্গে অন্যটা পেঁচিয়ে না থাকে। বোনার সময় হাতলের সঙ্গে ছোট একখন্ড চিকন কলা গাছ বেঁধে নিলে জমিতে পায়ের দাগ বা গর্ত মুছে যাবে। এতে বীজ অপচয়ও রোধ হবে। এ পর্যন্ত গবেষণায় দেখা যায় শুধু একক ঘন সারিতে বীজ বপন করাই উত্তম এবং এতে বিঘাপ্রতি ৫-৬ কেজি বীজ লাগে। তবে বোরো মৌসুমে ঘন এবং পাতলা উভয় ছিদ্র খোলা রেখে বীজ বপন করাই শ্রেয়। তা না হলে বীজ হার কম-বেশি হয়ে যাবে। সেচ ও সার ব্যবস্থাপনা বপনের প্রথম সপ্তাহ জমিতে দাঁড়ানো পানির প্রয়োজন নেই। মাটি ভেজা থাকলেই চলবে। পরে জমিতে ছিপছিপে পানি রাখতে হবে এবং চারা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পানির পরিমাণ বাড়ালে একদিকে আগাছার উপদ্রব কম হবে আবার অন্যদিকে বোরো মৌসুমে শীতের প্রকোপ থেকেও ফসল রক্ষা পাবে। বোরো মৌসুমে বিঘাপ্রতি যথাক্রমে ৩৬, ১৭, ১৬, ১০ ও ১.৫ কেজি এবং আমন মৌসুমে যথাক্রমে ২৪, ১৪, ১০, ৮ ও ১.৫ কেজি ইউরিয়া, টিএসপি, এমপি, জিপসাম, জিংক সালফেট সার প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া ছাড়া বাকি সব সার জমি তৈরির শেষ পর্যায়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। ইউরিয়া সার বোরো মৌসুমে বপনের ২৫, ৩৫, ৫০ দিন এবং আমন মৌসুমে ১৫, ৩০, ৪৫ দিন পর সমান তিন ভাগে উপরি প্রয়োগ করতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে লিফ কালার চার্ট (এলসিসি) ব্যবহার করে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করাই ভালো। এলসিসি ব্যবহারে বোরো মৌসুমে বীজ বপনের ২১ দিন এবং আমন মৌসুমে ১৫ দিন পর এলসিসি দ্বারা ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় নিরূপণ করে বিঘাপ্রতি যথাক্রমে ৯ কেজি ও ৭.৫ কেজি ইউরিয়া সার প্রথম উপরি প্রয়োগ করতে হবে। অবশ্য প্রথম উপরি প্রয়োগের জন্য এলসিসি পর্যবেক্ষণ না করলেও চলে। পরে ধানের থোড় অবস্থা পর্যন্ত প্রতি ১০ দিন পর পর এলসিসির সঙ্গে পাতার রঙ মিলিয়ে নাইট্রোজেনের চাহিদা নির্ণয় করতে হবে এবং ঘাটতি (এলসিসির মান ৩.৫-এর কম) দেখা দিলেই কেবল বিঘাপ্রতি বোরোতে ৯ কেজি ও আমন মৌসুমে ৭.৫ কেজি হারে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। আগাছা দমন বপনের প্রথম ৪০-৫৬ দিন জমি অবশ্যই আগাছামুক্ত রাখতে হবে। নিড়ানি বা ব্রি উইডার দ্বারা দুই সারির মধ্যকার আগাছা সহজেই দমন করা যায়। পরে হাত দিয়ে সারির মধ্যকার আগাছাগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে উপযুক্ত সময়ে পরিমিত মাত্রায় আগাছানাশকও ব্যবহার করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বীজ বপনের পাঁচ-ছয় দিন পর জমিতে আগাছানাশক প্রয়োগ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, আগাছানাশক ¯েপ্র করার সময় থেকে অন্তত চার-পাঁচ দিন জমিতে অবশ্যই ছিপছিপে পানি রাখতে হবে। কোনো অবস্থাতেই শুকনো জমিতে আগাছানাশক প্রয়োগ করা যাবে না। অন্যথায় আগাছার সঙ্গে ধানের চারাও মারা যেতে পারে। গবেষণার ফলাফল বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইন্সটিটিউটের (ব্রি) ফলিত গবেষণা বিভাগ কর্তৃক আমন ২০০৩ মৌসুমে গাজীপুরের শ্রীপুর, কাপাসিয়া, সদর, কালীগঞ্জ উপজেলায় কৃষকের মাঠে ও ব্রি-ফার্মে পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে রোপা পদ্ধতির চেয়ে ড্রাম সিডার দিয়ে বপন পদ্ধতিতে আবাদ করলে ফলন গড়ে প্রায় ১৫% বেশি পাওয়া যায় এবং ৭-১০ দিন আগে ধান কাটা যায় বা উফশী ধানের জীবনকাল ৭-১০ দিন কম হয়। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে বপন পদ্ধতিতে আবাদ করলে রোপণের তুলনায় হেক্টরপ্রতি প্রায় ৪ হাজার ৭০০ টাকা নিট মুনাফা অর্জন করা সম্ভব।

আরো খবর...