টিস্যু কালচার করে কম জমিতে অধিক আলু উতপাদন হচ্ছে

কৃষি প্রতিবেদক \ আলুর ব্যবহার এখন সর্বজনীন। চাহিদা ও উৎপাদন দুই-ই বেড়েছে। দেশের আলু বিদেশেও সুনাম কুড়িয়েছে। বেড়েছে রফতানি। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম স্থানে। এই তথ্য জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত। কৃষক এখন জানে কিভাবে টিস্যু কালচার করে কম জমিতে অধিক আলু উৎপাদন করা যায়। কৃষি বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, গত প্রায় তিন যুগে আলুর উৎপাদন অন্তত দশগুণ বেড়েছে। ১৯৮০ সালে উৎপাদিত হয় ৯ লাখ মেট্রিক টন। গত বছর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ লাখ মে.টনের বেশি। চলতি বছর আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক কোটি টনেরও বেশি। ইতোমধ্যে আলু উৎপাদন প্রধান অঞ্চলগুলোতে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে। রবি ফসলের আলু উৎপাদনের মৌসুমও শুরু হয়েছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষক আলু আবাদে কোমড় বেঁধে নেমেছে। বিশেষ করে বন্যায় আক্রান্ত এলাকার কৃষক ধানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আলু আবাদে গুরুত্ব দিয়েছে। একটা সময় আলু ছিল গ্রামের মানুষের খাবার। বর্তমানে আলু আভিজাত্যের খাদ্য তালিকার ওপরের দিকে উঠেছে। ফাস্টফুডে আলু না হলেই নয়। দেশের আলু ফ্রান্সে গিয়ে ফ্রাই তৈরির পর রেসিপি হয়ে ফেরে। চাইনিজ রেস্তরাঁয় দেশী পরিচিতি হারিয়ে প্রবেশ করেছে ফ্রেন্স ফ্রাই নামে। আলু দিয়ে তৈরি হচ্ছে চটপটি, ফুচকা, আলুর চপ, পুড়ি, লুচি, পরোটা, বরফিসহ নানা স্বাদের খাবার। পটাটো চিপসের জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। সেদিনের মজলিসের সেই আলু ঘাটি শহরের আতিথেয়তায় পরিবেশিত হয়। আলু দিয়ে খাবারের তালিকা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে চাহিদাও বেড়েছে। ষাটের দশকে হল্যান্ডের আলু বাংলাদেশে আমদানি হয়ে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশের আলুর চাহিদা বেড়েছে বিদেশে। রফতানি হচ্ছে ভিয়েতনাম, রাশিয়া, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ প্রায় ২৮টি দেশে। সূত্র জানায় গত পাঁচ বছরে আলু রফতানি অন্তত দশগুণ বেড়েছে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে আলু রফতানি হয় সাড়ে ৯ হাজার মে.টন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়ায় এক লাখ টনে। উত্তরাঞ্চলের আলু উৎপাদনের বড় এলাকা বগুড়া ও জয়পুরহাট। এই দুই জেলায় আলু আবাদ বেড়েছে। আলু মৌসুমে বগুড়ার বড় হাট শিবগঞ্জের কিচক হাটে স্থান সঙ্কুলান হয় না। বগুড়া-জয়পুরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই ধারে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে আলুর বেচাকেনা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে রফতানিকারক ও মহাজনরা ট্রাকের পর ট্রাক আলু কিনে নিয়ে যায়। বর্তমানে আলু আবাদ শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের প্রতিটি এলাকায় আলু চাষ ছড়িয়ে পড়েছে। নানা জাতের আলুর আবাদ হচ্ছে দেশজুড়ে। কৃষির বীজ বিভাগ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত আলুর ৭১টি জাতের বীজের ছাড়পত্র মিলে অবমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত জাত ১৩টি। বাকি জাত দেশের বিভিন্ন কোম্পানির। যা এসেছে বিদেশ থেকে। বেশিরভাগ জমিতে আবাদ হচ্ছে কার্ডিনাল, এসটারিক্স, ডায়মন্ড, গ্র্যানুলা, বিনেলা, লেডি রোজেটা, কারেজ, এটলাস, বেলিনি, বেলারুশ, আটলান্টিক বিভালাডি, রেড ফ্যান্টাসি ইত্যাদি। এর সঙ্গে বারি উদ্ভাবিত আলু বারি-৪৭, ৪৮, ৪৯, ৫০, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৩ জাত মাঠে আবাদ পর্যায়ে রয়েছে। আলু আবাদে মাঠের কৃষক এখন অনেক দক্ষ। তারা আগাম আলু উৎপাদনের পাশাপাশি নতুন জাত সংগ্রহ করে। বীজ সংগ্রহে টিস্যু কালচারের মতো উচ্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখেছে। কৃষি বিভাগ সূত্রের খবর- দেশে আলু বীজের চাহিদা অন্তত ৭ লাখ মে.টন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি), বেসরকারী সংস্থা ও কৃষকের ঘরে যে বীজ আছে তা দিয়ে এবারের চাহিদা মিটবে, এমনটি আশা কৃষি অধিদফতরের। বিএডিসি জানিয়েছে, সরকার আলু চাষে গুরুত্ব দিয়েছে। বীজ সার উপকরণ সময়মতো দেশের প্রতিটি এলাকায় পৌঁছানো হয়েছে। গুণগতমানের বীজ সংরক্ষণে বিএডিসির আওতায় রয়েছে ২৫টি হিমাগার। খাবার আলু সংরক্ষণে দেশজুড়ে বেসরকারী পর্যায়ে রয়েছে ৪শ’রও বেশি হিমাগার। আলু রফতানিকারকরা তাদের বিশেষায়িত হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করছে।

আরো খবর...