জীবন ও জীবিকার টানাপড়েনে বাজেট

 ॥ মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম ॥

করোনা সংক্রমণ বিশ্বের অর্থনীতির সব হিসাব-নিকাশই পাল্টে দিচ্ছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বৈশ্বিক এই মন্দা পরিস্থিতিতে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট হওয়া দরকার একটি ‘কোভিড-১৯ সংবেদনশীল বাজেট’। জাতীয় বাজেটের একটি দিক হলো-হিসাব সংক্রান্ত বা গাণিতিক বিষয়, বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব। আর একটি দিক হলো-রাষ্ট্রের উন্নয়ন সংক্রান্ত পরিকল্পনার রূপরেখা এবং বিদ্যমান সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ। গত ১১ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে দেশের ৪৯তম বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। যখন দেশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ চরম পর্যায়ে। করোনা ভাইরাস  দেশের স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামো ও অব্যবস্থাপনার কুৎসিত চিত্রটাই সবাইকে দেখিয়ে দিচ্ছে। সারাবিশ্বই নতুন করে ভাবছে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে। অথচ নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ২৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা, মোট বাজেটের ৫ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৭৩২ কোটি রাখা হয়েছিল, মোট বাজেট বরাদ্দের ৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ। এই অর্থবছরে বরাদ্দ  বেড়েছে ১৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ বা ৩ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত (২০১৯-২০) অর্থবছরে বরাদ্দ বেড়েছিল ১৫ দশমিক ৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে গত ১০ বছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ  বেড়েছে। কিন্তু জাতীয় বাজেটে এ খাতের অংশ কমেছে। এ সময় কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের হিস্যা বেড়েছে, তবে মৌলিক চাহিদার এ খাতটির বেড়েছে বঞ্চনা। গত দশকে বাজেটে এ খাতের বরাদ্দ ৬ শতাংশের সামান্য বেশি থেকে ৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। ২০১০-১১ অর্থবছরের তুলনায় এ বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ টাকার অঙ্কে ৩ দশমিক ৬০ গুণ বেড়েছে। কিন্তু ১০ বছরে বাজেটের আকার বেড়েছে সাড়ে চার গুণেরও বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাজেট প্রবৃদ্ধির সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না, বরং  মোট বরাদ্দের অর্ধেকের বেশি চলে যাচ্ছে বেতন-ভাতা, ওষুধ  কেনাসহ পরিচালন ব্যয়ে। বরাদ্দের বাকিটা যায় ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পে। গবেষণা ও স্বাস্থ্যসেবার  মৌলিক উন্নয়নের জন্য থাকে খুবই কম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, একটি দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির কমপক্ষে ৫ শতাংশ এবং বাজেটের ১৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এবারও জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ যারা কোভিড  মোকাবিলায় ভালো করছে। তাদের বরাদ্দের দিকে তাকালেই  দেখতে পাব, আমাদের বরাদ্দ কত কম। যেমন শ্রীলংকায় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ দশমিক ৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে ২ দশমিক ৫৫, থাইল্যান্ডে প্রায় ২ দশমিক ৭ শতাংশ। আমরা যে সফল কেরালা মডেলের কথা বলি, ভারতীয় রাজ্যগুলোর মধ্যে  কেরালা সবচেয়ে বেশি সম্পদ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামোর পেছনে ব্যয় করেছে। অথচ বাংলাদেশ এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ৪৮টি  দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ করে থাকে। আর উন্নত দেশগুলোর কথা তো বলাই বাহুল্য, তাদের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৬-৮ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। করোনা থেকে শিক্ষা নিয়ে আমরা কি স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছি? সুস্বাস্থ্য জীবনের অমূল্য সম্পদ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য বলছে, স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু সরকারি ব্যয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। এটা ৮৮ ডলার মাত্র। ১২৯ ডলার নিয়ে বাংলাদেশের পরই আছে পাকিস্তান। ভারত খরচ করে ২৬৭ ডলার। মাথাপিছু প্রায় ২ হাজার ডলার খরচ করে তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে আছে মালদ্বীপ। এর পরই আছে শ্রীলংকা, খরচ করে ৩৬৯ ডলার। শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র, খরচ করে বাংলাদেশের ১০৭ গুণ বেশি। আশার কথা হলো, করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় জরুরি চাহিদা মেটাতে ১০ হাজার কোটি টাকার একটি থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই টাকা কীভাবে ব্যয় হবে তা বলা মুশকিল। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি দীর্ঘদিনের। বিশেষত ক্রয়ের ক্ষেত্রে পুকুরচুরি হয়। ৮-১০ লাখ টাকার ভেন্টিলেটর কিনতে খরচ দেখানো হয় ৩০-৩২ লাখ টাকা, হাসপাতালের পর্দা কেলেঙ্কারি, বালিশ কান্ড, সর্বশেষ মাস্ক, ইত্যাদি সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এমন ব্যাপক দুর্নীতি চলতে থাকলে তো বরাদ্দ বাড়ালে তার সুফল জনগণ পাবে না; স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতিবাজরাই আরও বেশি লাভবান হবে। স্বাস্থ্য একটি জটিল এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল খাত। আর এই করোনাকালীন ব্যবস্থাপনাও বেশি জটিল ও কঠিন। তাই এর ব্যবস্থাপনার জন্য দরকার অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত জনবল। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই চলবে না, বরাদ্দের অর্থ সদ্ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এক দশক ধরে গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ অর্জন করছে যে সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে, সেই  পোশাকশিল্পে করোনা শুরুতেই যখন প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকার ক্রয়াদেশ স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়। ঠিক তখনই কৃষক বোরো ধানের বাম্পার ফলন (রেকর্ড পরিমাণ ২০৪ লাখ টন) ঘরে তোলে এটাই প্রমাণ করে, জীবিকার সন্ধানে আমাদের সেই গ্রামীণ অর্থনীতিতেই ফিরে যেতে হবে। বিপুলসংখ্যক ঘরে ফেরা মানুষকে এই গ্রাম ও কৃষি বিপদে যে কোনা সংকটে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্যের  জোগান দিয়েছে, এবারও দিচ্ছে। এবারের বাজেটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল কৃষি খাতে। কারণ জিডিপিতে কৃষি তৃতীয় অবস্থানে চলে গেলেও এখনো কৃষিতে নিয়োজিত জনশক্তি মোট জনসংখ্যার ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। দেশে সর্বোচ্চ জনশক্তি নিয়োজিত কৃষি খাতে। ২০২০-২১ অর্থবছরে কৃষি খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ হাজার ৪৮০  কোটি টাকা, মোট বরাদ্দের ৩ দশমিক ৬০ শতাংশ। এই বরাদ্দ গত অর্থবছর ছিল ১৯ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা, মোট বরাদ্দের ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। সুতরাং মোট বাজেট বরাদ্দের হিস্যা কৃষি খাতে একই রয়েছে। টাকায় বেড়েছে মাত্র ১ হাজার ১২৬ কোটি বা ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ, এটি খুবই গতানুগতিক। ছয় বছর ধরে কৃষিতে ভর্তুকি ৯ হাজার কোটি টাকার মধ্যেই আটকে আছে। অর্থ বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবছর অনুদানের অনুপাত হ্রাস পাচ্ছে। চাষাবাদে বৈচিত্র্য না থাকায় সমস্যা প্রকট হয়েছে। কৃষি এককেন্দ্রিক শস্য চাষাবাদে আটকে আছে। কৃষিতে পর্যাপ্ত ভর্তুকির ঘাটতি রয়েছে। আমরা যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে গর্ব করি, এরও অন্যতম কারণ হলোÑ খাদ্য আমদানির জন্য  বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে না বলেই এই রিজার্ভ বেড়েছে। এটাও এক প্রকার কৃষকদেরই কৃতিত্বের অংশ। রক্তচোষা-সস্তা শ্রমের পোশাক খাতের ক্ষতির কথা আমরা শুনছি। কিন্তু একই সময়ে কৃষি খাতের লোকসান হয়েছে। ব্র্যাকের গবেষণা মতে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই ক্ষতির বিপরীতে কৃষিজীবীরা কী  পেলেন? কীভাবে আবার তারা উঠে দাঁড়াবেন। বাজেট নিয়ে কৃষকদের আশার অধ্যায় পার হয়েছে। কৃষিতে বরাদ্দ আগের মতোই রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে দৈনিক ১ দশমিক ৯০ থেকে ৩ দশমিক ৮০ ডলারের মধ্যে আয় করা কর্মজীবী মানুষ ৫৫ শতাংশ, তারা এখন ঝুঁকির মধ্যে আছেন। তাদের অনেকেই নতুনভাবে গরিব হয়েছেন অথবা আশঙ্কায় আছেন। এই মানুষগুলোর সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। কিন্তু তার খুব একটা প্রতিফলন বাজেটে নেই। সামাজিক সুরক্ষার জন্য বরাদ্দ  বেড়েছে। কিন্তু বিপদের মাত্রার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে হতাশ হতে হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ ছিল ৮১ হাজার ৮৬৫ কোটি টাকা, এই বাজেটে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। আবার এ খাতের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা, বৃত্তি ও সঞ্চয়পত্রের সুদের একটি অংশকেও যুক্ত করে দেখানো হয়েছে। বরাদ্দ বেড়েছে ১৩ হাজার ৭০৯ কোটি টাকা। বাজেটের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিডিপির ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। জীবন ও জীবিকার টানাপড়েনের এই সময়ে এ বরাদ্দ কি যথেষ্ট? সরকার ইতোমধ্যে ত্রাণ তৎপরতা কমিয়েছে, এই সুরক্ষার ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর তাগিদ দেখা যাচ্ছে না। এটা দুর্ভাগ্যজনক। এবারের বাজেটে জনগণের প্রত্যাশিত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো  জোড়াতালি, অসঙ্গতি ও কৌশল করে বড় দেখানো হয়েছে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের এখন যা সবচেয়ে বেশি দরকার সেই স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এবং বৃদ্ধি দুই-ই সীমিত। সারা দুনিয়া বলছে প্রবৃদ্ধির চেয়ে বাঁচা বড়, আমরা বলছি বাঁচার  চেয়ে প্রবৃদ্ধি বড়। এই মুহূর্তে প্রথম কাজই হচ্ছে জীবন বাঁচানো আর  কৌশলে জীবিকাও। এ দুটো করা গেলে জিডিপি এমনিতেই বাড়বে। স্বাভাবিকভাবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেলে জাতীয় সম্পদ বৃদ্ধি পায়, যার অর্থ একটি সুস্থ ও শিক্ষিত জাতি একটি  টেকসই সমৃদ্ধিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। তাই স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ শুধু কাঙ্খিত নয়, এটা এখন পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশ গুরুত্ব ও অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। করোনা আমাদের এই শিক্ষা দেয় যে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষিবিজ্ঞান গবেষণায় সর্বোচ্চ মনোযোগ না দিলে এই বিপদে বারবার পড়তে হবে। লেখক ঃ পুঁজিবাজার বিশে¬ষক

 

আরো খবর...