জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের প্রয়াণ

জীবন ও কর্মের মাধ্যমে কেউ কেউ নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যার শূন্যতা আমাদের স্তম্ভিত করে দেয়, শোকার্ত করে। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন এমনই একজন ব্যক্তিত্ব। সম্প্রতি অন্যভুবনে চলে গেলেন এই জাতীয় অধ্যাপক। কীর্তিমান এ মানুষটি বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। অনাবিল সমাজহিতৈষী, গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল চেতনা, সুশীল বুদ্ধিবৃত্তিকর চর্চা ও ব্যক্তিগত মনীষা দিয়ে নিজেকে পরিণত করেছিলেন দেশের অগ্রগণ্য পুরুষে। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। বলার অপেক্ষা রাখে না, তার মৃত্যুতে যবনিকা ঘটল এক কিংবদন্তির জীবনের। স্বাভাবিকভাবেই কীর্তিমান এ মানুষটির মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশে। তার মৃত্যুতে গভীর  শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা। জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের পুরো নাম আবু তৈয়ব মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান। ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্র“য়ারি কলকাতায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বিখ্যাত  হোমিও চিকিৎসক আবু তাহের মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম ও মাতা গৃহিণী সৈয়দা খাতুন। মা গৃহিণী হলেও লেখালেখির অভ্যাস ছিল। পিতামহ শেখ আবদুর রহিমও ছিলেন লেখক ও সাংবাদিক। আনিসুজ্জামানরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। তার বড় বোন নিয়মিত কবিতা লিখতেন। অর্থাৎ বলা যায়, শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ ছিল তাদের পরিবার। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। ১৯৫১ সালে নবাবপুর গভর্নমেন্ট হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা বা ম্যাট্রিক ও জগন্নাথ কলেজ থেকে ১৯৫৩ সালে আইএ পাস করে বাংলায় ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫৬ ও ১৯৫৭ সালে স্নাতক সম্মান এবং এমএতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অনার্সে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার কৃতিত্বস্বরূপ নীলকান্ত সরকার স্বর্ণপদক বৃত্তি লাভ করেছিলেন তিনি। ১৯৫৮ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করার জন্য যোগদান করেন। তার বিষয় ছিল ‘ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারায় ১৭৫৭-১৯১৮’। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন। গবেষণার বিষয় ছিল ‘উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস : ইয়ং  বেঙ্গল ও সমকাল’। প্রসঙ্গত উলে¬খ্য, ১৯৫৮ সালে বাংলা একাডেমি বৃত্তি পেয়েও তা ছেড়ে দিয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে আনিসুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে অ্যাডহক ভিত্তিতে তিন মাসের জন্য যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিনি  সেখানেই ছিলেন। পরে ভারতে গিয়ে প্রথমে শরণার্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি’র সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। তারপর বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন। এ ছাড়া জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা-প্রকল্পে অংশ নেন ১৯৭৮  থেকে ১৯৮৩ পর্যন্ত। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। সেখান থেকে অবসর নেন ২০০৩ সালে। জীবনের নানা সময়ে তিনি বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গেছে। বলা দরকার, আনিসুজ্জামান অধ্যাপনাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ঠিকই কিন্তু প্রকৃত নেশা ছিল তার  লেখালেখি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে। তার রচিত ও সম্পাদিত বিভিন্ন গ্রন্থ আমাদের শিল্প-সংস্কৃতি ও ইতিহাসের বিবেচনায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি নানাভাবে সম্মানিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক পদে সম্মানিত করে। এছাড়া শিক্ষা ক্ষেত্রে, শিল্প-সাহিত্য  ক্ষেত্রে, সাংগঠনিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, অলক্ত পুরস্কার, একুশে পদক, আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বেগম জেবুন্নেসা ও কাজী মাহবুবউলস্নাহ ট্রাস্ট পুরস্কার, দেওয়ান গোলাম মোর্তাজা স্মৃতিপদক, অশোককুমার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার। এছাড়া তিনি ভারতীয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘পদ্মভূষণ’ ও রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি. লিট সম্মাননা পেয়েছেন। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান তার জীবন ও কর্মের মধ্যদিয়ে যে অবদান  রেখে গেছেন তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই গুণী মানুষটির বিদেহী আত্মার প্রতি রইল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা।

 

 

আরো খবর...