জাতি আজও মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর হত্যাকান্ডের বিচারের অপেক্ষায়…

মোঃ মোফাজ্জেল হক

একাত্তরে ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। তার ৯ দিন আগেই যশোর সেনানিবাসের পতন হয়েছিল ৭ তারিখে যশোর সেনানিবাসের পাকিস্তান ট্যাংক রেজিমেন্টের একটি দল আত্মসমর্পণ না করে খুলনার শিরোমনিতে পজিশন নেয়। তারা ৭ম  নৌবহরের আশায় খুলনা হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে সরে যাচ্ছিল। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণের মুখে পাকবাহিনীর ট্যাংক  রেজিমেন্টের ওই দলটি আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। ওই অপারেশনটির নাম ‘ব্যাটল অব শিরোমনি’ এবং অপারেশনের কমান্ডার যিনি দুই হাতে দুই এসএলআর উঁচিয়ে ফায়ার করতে করতে ট্যাংকের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন ৮ নং  সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল (পরবর্তীকালে মেজর জেনারেল) এমএ মঞ্জুর, বীরউত্তম। আজ পয়লা জুন ১৯৮১ সালের এই দিনে মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুর বীর উত্তম, লে. কর্নেল মতিউর রহমান বীর উত্তম, লে কর্নেল মাহবুবুর রহমান বীর উত্তমকে হত্যা করা হয়। জিয়া হত্যার কলঙ্ক মাথায় নিয়ে তারা চলে যেতে বাধ্য হলেন এই দুনিয়া থেকে। যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তারা জীবন বাজি রেখে  সেই দেশের জনগন আজও জানে না তাদের কপালে সাড়ে তিন হাত মাটি জুটেছিল কিনা, কোথায় তাদের কবর? ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করার পর এর দায় পড়ে সেনাবাহিনীর চট্টগ্রাম ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মঞ্জুরের ওপর। পুলিশের হাতে জেনারেল মঞ্জুর গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেই সময়ের সেনাপ্রধান  লে. জেনারেল এরশাদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে পরামর্শ দেন মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে দিতে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশ পেয়ে চট্টগ্রামের কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে  জেনারেল মঞ্জুরকে সেনা হেফাজতে দেয় পুলিশ। তবে সেনা  হেফাজতে নেওয়ার পরের দিনই জেনারেল মঞ্জুরকে হত্যা করা হয়। জিয়া হত্যাকান্ড এবং সেনা বিদ্রোহে জেনারেল মঞ্জুরকে দায়ী করে তাকে হত্যা করে তার অনুগতদের ফাঁসি দেওয়া হলেও আসলেই জেনারেল মঞ্জুর দায়ী ছিলেন কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ওই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িত অনেক সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা, সামরিক বিশ্লেষক এবং গবেষক। অধ্যাপক নাদির জুনাইদ একটি প্রবন্ধে লিখেছেন: সার্কিট হাউসে হামলার ব্যাপারে মঞ্জুর আগে জানতেন না এ ব্যাপারে একটি ধারণা পাওয়া যায় মেজর রেজাউল করিমের বর্ণিত একটি ঘটনা থেকে। জিয়া হত্যাকান্ড ঘটে যাওয়ার পর, ৩০ মে সকালে  জেনারেল মঞ্জুরের সঙ্গে মেজর রেজাউল করিমের যখন প্রথম দেখা হয়; তখন মঞ্জুর রেজাকে প্রশ্ন করেন সার্কিট হাউসে গিয়ে রেজা কী কী  দেখেছেন তা নিয়ে। মেজর রেজা জিয়াউর রহমানসহ অন্যদের মৃতদেহের কথা জিওসিকে জানালে মঞ্জুর দুবার বলেন, “ওহ্, হোয়াট দে হ্যাভ ডান! হোয়াট দে হ্যাভ ডান!” মেজর রফিকুল ইসলাম পিএসসি রচিত “একাশির রক্তাক্ত অধ্যায়” থেকে জানা যায়, মঞ্জুর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এই তথ্য জানার পর তৎকালীন বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল সদরুদ্দিন সেনাপ্রধান এরশাদকে বলেছিলেন মঞ্জুরকে  কোনোভাবেই হত্যা না করতে। মঞ্জুরের হত্যার পর এরশাদ সদরুদ্দিনকে জানান, একদল উচ্ছৃঙ্খল সৈন্য মঞ্জুরকে হত্যা করেছে। সদরুদ্দিন তখন ক্ষুব্ধকন্ঠে এরশাদকে বলেছিলেন, “এই গল্প অন্য কাউকে বলুন। অ্যাট লিস্ট ডোন্ট আস্ক মি টু বিলিভ ইট।” এর কদিন পরই মুক্তিযোদ্ধা অফিসার সদরুদ্দিনকে বিমান বাহিনী প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। লেখক সাংবাদিক আনোয়ার কবিরের “সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যা: ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১” বইতে তিনি লিখেছেন: মেজর রেজাউল করিমের বক্তব্য  থেকে একটি তথ্য জানা যায়; তা হল, মতিউর রহমান জিয়া হত্যাকান্ডের অল্প কদিন আগে ঢাকায় আর্মি হেড কোয়ার্টারে গিয়েছিলেন। সেখানে সেনাপ্রধান এরশাদসহ অনেকের সঙ্গেই নাকি তিনি কথা বলেছিলেন (কবির, পৃষ্ঠা ১৮৭)। লেফটেন্যান্ট কর্নেল মতিউর রহমান তখন কী আলোচনা করেছিলেন তা জানা যায়নি। অথচ তিনিই পরবর্তীতে জিয়াউর রহমানকে গুলি করে হত্যা করেন। লে. কর্নেল মোস্তাফিজুর রহমান তার ‘রণ থেকে জন’ নাম আত্মজীবনীতে লিখেছেন: মঞ্জুরকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তিনি বেঁচে থাকলে প্রকৃত ষড়যন্ত্রকারী কে তা উদঘাটিত হয়ে যেত। জেনারেল মঞ্জুরকে গ্রেপ্তার করেছিলেন যে পুলিশ কর্মকর্তা তার নাম ছিল সম্ভবত কুদ্দুস। এরশাদের আমলে তিনি অল্প দিনের মধ্যেই প্রচুর ধন-সম্পদের মালিক হন। তার প্রতি এরশাদের বহু পৃষ্ঠপোষকতা নানা কথা ও সন্দেহের জন্ম  দেয়। মঞ্জুর যদি জিয়াকে জোরপূর্বক বন্দি বা হত্যা করার নির্দেশ দিয়ে থাকেন সে ক্ষেত্রে এটাই ভাবা স্বাভাবিক যে, মঞ্জুরকে অন্য অনেক ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সমর্থন করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিল। কিন্তু জিয়া হত্যাকান্ড সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত মঞ্জুরসহ চট্টগ্রাম সেনানিবাসের অন্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের হত্যাকান্ডে যুক্ত বলে চিহ্নিত করা হয়। মঞ্জুরকে বিচারের মুখোমুখি করে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করা হয়নি যা সন্দেহের সৃষ্টি করে। জিয়া হত্যাকান্ড এবং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা পর্যালোচনা করলে বুঝা যাই যে, ষড়যন্ত্রটি (জিয়া হত্যার) হয়েছিলে চট্টগ্রামের বাইরে ঢাকায়। জিয়া হত্যার পর বিদ্রোহীদের দায় তার (মঞ্জুরের) ওপর আসে; যা তিনি নিতে ইচ্ছুক ছিলেন না কিন্তু নিয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রটা কোথায় তা তিনি (মঞ্জুর) জানতে পেরেছিলেন সে জন্য ঢাকা থেকে এক ব্রিগেডিয়ারকে পাঠিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। মঞ্জুরকে তিনি আখ্যা দিয়েছিলেন ‘ধ পড়ঁঢ় ষবধফবৎ নু ফবভধঁষঃ.’ পুলিশের হেফাজত থেকে জেনারেল মঞ্জুরকে  সেনাবাহিনী তাদের জিম্মায় নিয়ে আসার পর যখন মঞ্জুরকে হত্যা করা হল, সেটিতে জড়িতদের শনাক্ত করে অবশ্যই বিচার করা দরকার ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। বিচারের পর সেনাবাহিনী  থেকে অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকেও বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়। মঞ্জুর নিহত হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধারাই দুর্দশাগ্রস্ত হয়েছিলেন। সে সময়ের ঘটনাসমূহ পর্যবেক্ষণ করলে যে প্রশ্নসমূহ উঠে আসে তা নিয়ে তদন্তের উদ্যোগও নেই। কিন্তু সেই ঘটনাসমূহ ভুলে যাওয়া বা ঢেকে রাখার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সত্য অনুসন্ধান সব সময় প্রয়োজন, দেরিতে হলেও।

লেখক ঃ সাবেক সদস্য তথ্য ও গবেষণা উপকমিটি, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ও সভাপতি,  বঙ্গবন্ধু শিক্ষা ও গবেষণা পরিষদ, কুষ্টিয়া জেলা।

আরো খবর...