ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাকে মেগা প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দিতে ইবির প্রধান প্রকৌশলীকে হুমকি

চাকুরি থেকে রিজাইন দিয়ে প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রীকে সব কিছু জানাব: টুটুল
গভীর রাতে টুটুলের ফ্ল্যাটে সাবেক প্রক্টর মাহবুবর ও বর্তমান প্রক্টর পরেশ চন্দ্র

নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) মেগা প্রকল্পের ৫৩ কোটি টাকার একটি কাজ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় এক নেতাকে পাইয়ে দিতে ইবির প্রধান প্রকৌশলীকে কয়েক দফায় হুমকি দেয়া হয়েছে। চলমান মেগা প্রকল্পের টেন্ডার ঘিরে পছন্দের লোককে কাজ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও প্রধান প্রকৌশলীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর সেই ক্ষোভে চাকুরি ছাড়ার মত সিদ্ধান্ত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে সোমবার রাতে একটি স্ট্যাস্টাস দেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী আলীমুজ্জামান টুটুল। এরপর তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ইবির কয়েকজন শিক্ষক-কর্মকর্তা এ ঘটনার সাথে জড়িত বলে জানান প্রকৌশলী টুটুল। তবে তাদের নাম তিনি বলেনননি। চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে সব তুলে ধরবেন বলে জানান। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত যাওয়ার ঘোষনা দেন তিনি।

জানা গেছে, ইবিতে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। সম্প্রতি কয়েকটি কাজের টেন্ডার আহবান করা হয়েছে। ৩০ মার্চ ৬ এপ্রিল ৫৩ কোটি ও ১০৬ কোটি টাকার দুটি কাজের দরপত্র খোলা হবে। এসব কাজের জন্য ঠিকাদার নির্ধারণ বা লটারি হবে। তার আগেই ইবির একটি চক্র ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন শীর্ষ নেতাকে একটি কাজ পাইয়ে দেয়ার জন্য প্রধান প্রকৌশলী টুটুলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ৫৩ কোটি টাকার একটি কাজ ওই নেতাকে দেয়ার জন্য টুটুলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। প্রকৌশলী টুটুল বিষয়টি নিয়ে অপারগতা প্রকাশ করলে তার ক্ষতি করার হুমকি দেয়া হয়। এ নিয়ে গত সোমবার রাতে তিনি তার ফেসবুক পেজে একটি স্ট্যাস্টাস দেন। স্ট্যাস্টাসে তিনি লিখেন‘ ইবিতে আর চাকুরি করা হলো না আমার, কালকে রিজাইন করব, ইনশাআল্লাহ, ইঞ্জিনিয়ার টুটুল’।

ইবির প্রকৌশল অফিসের একাধিক কর্মকর্তা জানান, মেগা প্রকল্পের চলমান কাজকে ঘিরে এর আগে স্যারের ওপর (আলিমুজ্জামান টুটুল) চাপ সৃষ্টি করা হয়। তার কাছ থেকে কয়েক দফায় টাকাও নেয় প্রভাবশালী চক্রটি। এর মধ্যে ইবি ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির বিতর্কিত দুই নেতা পলাশ ও রাকিবও রয়েছে।

ইবির একটি সূত্র জানায়, গত বছর ছাত্রলীগের দুই সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষনা করা হয় কেন্দ্র থেকে। রবিউল ইসলাম পলাশকে সভাপতি ও রাকিবুর রহমান রাকিবকে সাধারন সম্পাদক করা হয়। তবে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মিদের বাধায় এই দুই নেতা ক্যাম্পাস ছাড়া। রাকিব কয়েকদফা জেলেও গেছেন। নানা অপকর্ম করেও কমিটির দুই নেতা বহাল আছে। তাদের কমিটি বাতিলসহ শাস্তির দাবিতে লাগাতর আন্দোলন হলেও কোন ফল আসেনি। কেন্দ্র থেকে তদন্ত টিম করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমান হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এসবের পিছনে রয়েছে অর্থ ও মেগা প্রকল্পের কাজ পাইয়ে দেয়ার প্রতিশ্র“তি।

এর আগে ছাত্রলীগ সাধারন সম্পাদক রাকিব প্রকৌশলী আলিমুজ্জামানকে হুমকি ও ব্লাক মেইলিং করে ফায়দা লোটেন। এবারও টেন্ডার ঘিরে কমিটি বঁাঁচিয়ে রাখতে তারা প্রকৌশলী অফিসের এ শীর্ষ কর্মকর্তাকে ম্যাসেঞ্জারে হুমকি দিয়ে আসছে। এর পিছনে ইবির বহুল অলোচিত এক শিক্ষক রয়েছে। যিনি পিছন থেকে সব কলকাঠি নাড়ছেন বলে মনে করছেন প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল।

এদিকে গত সোমবার ফেসবুকে স্ট্যাস্টাস দেয়ার পর শহরের ছয় রাস্তায় মোড়ে অবস্থিত প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুলের ফ্ল্যাটে আসেন আলোচিত ও বিতর্কিত শিক্ষক সাবেক প্রক্টর ড. মাহবুবর রহমান। সাবেক প্রক্টর মাহবুবর রহমান দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সদস্য। তিনি রাত ১০টার পরে টুটুলের ফ্ল্যাটে প্রবেশ করেন। সেখানে কয়েক ঘন্টা অবস্থান করেন। এ ঘটনা জানাজানি হলে সেখানে সাংবাদিকদের একটি দলও অবস্থান নেয়। সাংবাদিকদের অবস্থান জানতে পেরে শিক্ষক মাহবুবর রহমান ইবির বর্তমান প্রক্টর পরেশ চন্দ্র বর্মনকে ডাকেন। তিনি আসেন রাত ১২টার পরে। এরপর ফ্ল্যাট থেকে নেমে আসেন শিক্ষক মাহবুবর রহমান।

সাংবাদিকরা এ সময় তার কাছে জানতে চান এতরাতে প্রকৌশলী টুটুলের বাসায় কেন এসেছেন? তিনি বলেন, আলিমুজ্জামান আমার ঘনিষ্ট মানুষ। ব্যক্তি মাহবুব হিসেবে তার কাছে এসেছি। তাকে হুমকি দিচ্ছে কে বা কারা, তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। তিনি সৎ ও সাহসী মানুষ। সততার জায়গা থেকে তিনি যেন একচুলও বিচ্যুত না হন।

আপনার বিরুদ্ধেই অভিযোগের তীর এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন,‘ সততার জায়গা থেকে আমি এক চুলও সরিনা। আমার বিরুদ্ধে কেউ কোন অভিযোগ প্রমান করতে পারবে না।’ এরপর তিনি প্রক্টর পরেশ চন্দ্র বর্মনের গাড়িতে করে দ্রুত সটকে পড়েন।

ফেসবুকে স্ট্যাস্টাসের বিষয়ে প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল বলেন, একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য আমাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। আমার ম্যাসেঞ্জারে তারা ম্যাসেজ পাঠিয়ে হুমকি দিচ্ছে। তারা জোর করে কাজ নিতে চাই। এর আগেও তারা আমার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছে। সব ডকুমেন্ট আছে। আমি আর চাকুরি করব না। প্রয়োজনে সংবাদ সম্মেলন করে সব বলব। প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাব। তিনি থানায় জিডি করবেন বলেও জানান। এর আগেও জিডি করেন তিনি।’ এ ঘটনার পর অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছেন তিনি। ভিসি তার ফোনে রিং দিলেও তিনি কথা বলেননি। এছাড়া বাড়ি থেকেও বের হননি। নিজের বাড়িতে অবস্থান করছেন। টুটুল আশঙ্কা করছেন তার ক্ষতি করা হতে পারে।

ইবি প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘ মেগা প্রকল্পের যে কাজ চলছে, তা থেকে একটি চক্র নিয়মিত কমিশন নেন। প্রকৌশলী টুটুল নিজে কোন কমিশন নেন না। তারপরও ওই চত্রে“র চাপে তিনি কমিশন নিতে বাধ্য হন। সেই অর্থ যায় কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্রলীগ নেতা পলাশ ও রাকিবের পকেটে। কেন্দ্রীয় নেতাদের ৪০ লাখ টাকায় ম্যানেজ করে কমিটির নেতা হন পলাশ ও রাকিব। এরপর শোভন ও রাব্বানির কমিটি বাতিল করা হলে চাপে পড়ে পলাশ ও রাকিব। তবে বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদেরও তারা নানাভাবে ম্যানেজ করে আসছেন। আর এসব কাজে তাদের সকল সহযোগিতা দিয়ে আসছেন সাবেক প্রক্টর প্রফেসর মাহবুবর রহমান। এবারো তারা টুটুলকে ট্যাপে ফেলে একটি কাজ এক নেতাকে দেয়ার জন্য চেষ্টা করছেন। এর পিছনে জেলা ও উপজেলা যুবলীগের কয়েকজন নেতার হাতও রয়েছে।

এর আগেও চাপের কারনে চাকুরি ছেড়ে দেয়ার জন্য রিজাইন দেন। তবে সে যাত্রায় ভিসির অনুরোধে তিনি বহাল থাকেন। তবে এবার চাকুরি ছাড়ার ব্যাপারে অনড় আছেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর-রশিদ আশকারী বলেন,‘ টুটুল অনেক ভাল ছেলে। কোন চাপের কাছে নতি স্বীকার করে মেগা প্রকল্পের কাজ হবে না। প্রয়োজন কাজ বাতিল হবে। কারা চাপ সৃষ্টি করছে আমি জানি না। তবে টুটুল যে কোন সহযোগিতা চাইলে আমি করতে প্রস্তুত আছি।

টুটুলের পরিবারের এক সদস্য বলেন, ইবির উন্নয়নে তার অনেক ভূমিকা। যে ভালভাবে কাজ করতে চাই। তবে একটি মহল বারবার তাকে চাপ সৃষ্টি করছে। তার কাছ থেকে অর্থ নিচ্ছে। আবার কাজও জোর করে নিতে চাই। তাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তিনি অনেকটা ভেঙ্গে পড়েছেন। ভিসি যদি ওই শিক্ষকসহ ছাত্রলীগ নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতেন তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। এ চক্রের কাছে ভিসিও অসহায়।

আরো খবর...