চিকিতসক ও রোগীর সম্পর্ক

॥ মীর আব্দুল আলীম ॥ 

দেশের চিকিতসাসেবার মানোন্নয়নে এ পেশাকে আগলে রাখতে হবে- কারণ চিকিতসাসেবা আমাদের জন্য জরুরি বিষয়। চিকিতসকের সেবার সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি জড়িত। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো অধিকার নেই কারও। চিকিতসকরা প্রায়শই রোগীর স্বজনদের হাতে লাঞ্ছিত হন।  দেশে চিকিতসক হত্যার ঘটনাও ঘটে মাঝেমধ্যে। সর্বশেষ পত্রিকান্তে দেখলাম, ভুল চিকিতসার অভিযোগ এনে ১৬ জুন খুলনায় ডা. রকিব নামে এক চিকিতসককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এক অন্তঃসত্ত্বা মায়ের সন্তান প্রসবে চেষ্টা করেন আনাড়ি দাই। তারপর তাকে নগরীর রাইসা ক্লিনিকে নেওয়া হলে দ্রুত সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করেন শিউলি বেগম রাইসা। শিউলি বেগমের রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় তাকে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় নেওয়ার পথে ওই প্রসূতির মৃত্যু হয়। ভুল চিকিতসায় শিউলি বেগমের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগ করেন তার পরিবারের লোকজন। এ জন্য ডা. রকিবকে দায়ী করে তার ওপর হামলা চালায় রোগীর স্বজনরা। এ ঘটনায় ডা. রকিব মারা গেলে পরিবারের লোকজন খুলনা সদর থানায় একটি মামলা করেন। বরাবরই লক্ষণীয়, বিলম্বিত চিকিতসা গ্রহণ, আনাড়ি দাইয়ের  দোষের দায় চাপানো হয় চিকিতসকের ওপর। সরকারি হাসপাতালের অব্যবস্থা, চিকিতসা সরঞ্জাম এবং লোকবলের অপ্রতুলতার দ্বায় চাপে চিকিৎসকদের ওপর। প্রয়োজনীয় চিকিতসাসামগ্রী না দিয়ে করোনাকালীন চিকিৎসা করতে গিয়ে আমাদের অনেক চিকিৎসক প্রাণ দিয়েছেন। এরপরও চিকিৎসা সংকটের দায় যেন কেবল চিকিৎসকের। এ দেশে সাধারণ একটি বিষয় হলো- রোগীর মৃত্যু হলে বলা হয় ভুল চিকিৎসার কথা। ভুল চিকিৎসার বিষয়টি তাৎক্ষণিক নির্ণয় করেন রোগীর স্বজন কিংবা সাংবাদিক সাহেবরা। তারপর যা হওয়ার তাই হয়; চিকিৎসক লাঞ্ছনা কিংবা আহত-নিহতের ঘটনা। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা আর মানুষ মেরে  ফেলার এমন অভিযোগ ওঠে মাঝেমধ্যেই। হাসপাতালে  রোগী মারা গেলে সোজা খুনের দায় চাপে ডাক্তারের ওপর। কথায় কথায় বলা হয় ভুল চিকিৎসার কথা। পত্রিকার পাতায় শিরোনাম হয় ‘অমুক হাসপাতালের অমুক ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু’। ভুল চিকিৎসার নিশ্চিত কীভাবে হন একজন সাংবাদিক কিংবা রোগীর স্বজন। এটাইতো প্রমাণ সাপেক্ষের বিষয়। অসুস্থ মানুষই ডাক্তারের কাছে কিংবা হাসপাতালে আসেন। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মুমূর্ষু রোগীদের আনা হয় হাসপাতালে। সৃষ্টিকর্তাই জীবনের মালিক। মানুষ কেবল চেষ্টা করে মাত্র। প্রায় ক্ষেত্রেই অসুস্থ মানুষটি মারা গেলে বলা হয় ভুল চিকিসৎসার কথা। ব্রেইন  স্ট্রোক, হৃদরোগে আক্রান্ত মানুষতো সব সময়ই মৃত্যুর ঝুঁকিতে থাকেন। হাজারো সমস্যার বাংলাদেশে ভুল চিকিৎসা, অপচিকিৎসা নেই তা কিন্তু না। কোনো কোনো ডাক্তারও অবহেলা করেন, রোগীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করেন। এমন অনেক হচ্ছে। তবে সব ডাক্তার কি এমন বাজে কাজগুলোর সঙ্গে জড়িত? ভালো গুণের এবং মানবিকতা সম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যাই এখনো অনেক বেশি। এ দেশে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। উন্নত বিশ্বেও ভুল চিকিৎসার বহু উদাহরণ রয়েছে। তাই বলে সব ঘটনাকেই ভুল চিকিৎসা বলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সঠিক নয়। তাতে চিকিৎসক রোগীর সম্পর্কের অবনতি ঘটবে বৈকি! চিকিৎসকরা এ ক্ষেত্রে  রোগীদের জন্য আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিৎসায় ঝুঁকি নিতেই হয়, নইলে রোগীর জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা  তৈরি হয়। কথায় কথায় চিকিৎসকের গায়ে হাত তোলা, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করা, হত্যা করা এমন ঘটনায় ডাক্তাররা রোগীর চিকিৎসা দিতে অনুৎসাহিত হবেন। যা রোগীদের জন্য সুখকর সংবাদ নয়। এমন বাজে অভিজ্ঞতা নিয়ে অনেক  মেধাবী চিকিৎসক এখন দেশ ছাড়ছেন এমন খবরও আমাদের কাছে আছে। এটাও অনেক বড় দুঃসংবাদ বটে!  সেবার শপথ নিয়েই চিকিৎসকদের চিকিৎসা পেশায় প্রবেশ করতে হয়। এ পেশাটি রাষ্ট্রের অন্যান্য পেশার তুলনায় অনেক বেশি সম্মানের। এটা পেশা হলেও চিকিৎসকরা মানুষের জীবন রক্ষায় কাজ করেন বলে এটি মানবসেবার একটি অংশও। এটা অনেকটা নির্দ্বিধায় বলতে হয়, আজকাল এ পেশার কিছু চিকিৎসকের কারণে মানবিক চিকিৎসকরাও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। অনেক চিকিৎসক তো যারা কখনো রাজনৈতিক, কখনো বা অমানবিক আচরণও করে গোটা চিকিৎসক সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। করোনাভাইরাসের এমন সংকটের মধ্যেও হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকরা যাচ্ছেন না, চেম্বার করছেন না এমন অভিযোগ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে। যা অমানুষিক বটে! আবার বহু চিকিৎসক দেশের এই সংকটময় সময়ে রাত-দিন রোগীদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়ে চিকিৎসাপেশা যে মহান তার স্বাক্ষর রাখছেন। জীবন বাজি রেখে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই জীবন বিপন্ন করেছেন। রাত-দিন একজন ডাক্তারকে পরিশ্রম করতে হয়।  রোগীর ডাক পড়লেই তার ঘুম হারাম। আর তাকে যদি কথায় কথায় অপচিকিৎসা কিংবা খুনের অপবাদ কাঁধে নিয়ে চলতে হয় তাহলে বিষয়টা কি দাঁড়ায়? ভালো কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে তো মানুষ। প্লিজ অপবাদ দেবেন না। অভিযোগ করতে হলে ভেবে করবেন। সঠিকটা করবেন। এ কথা কিন্তু সত্য; আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়া পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আমাদের ডাক্তাররা যে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন তা কম নয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেন। কিন্তু এখনও সেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে ঘরে ফিরছেন। সিট সংকুলান না হলে সেখানে ডাক্তারের দোষ কোথায়। যারা বারান্দায় থাকেন তারাও কিন্তু চিকিৎসা পান। এখনো আস্থার জায়গা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হুজুগে বাঙালি আমরা, বুঝেও লড়ি, না বুঝেও লড়ি। কথা বলতে তো সীমা পরিসীমা হারিয়ে ফেলতে ওস্তাদ সবাই। পাঠক বলেন তো, কত জন মানুষের জন্য কত জন ডাক্তার নিয়োজিত আছেন এ দেশে। কত রোগীর চিকিৎসার সঙ্গতি আছে এ দেশের হাসপাতালগুলোর। ঢাল-তলোয়ার (ডাক্তার ওষুধ) না দিয়ে চিকিৎসা করতে বলবেন- তা কি করে হয়? এক পরিসংখ্যানে এভাবেই উল্লেখ আছে- ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ডিপার্টমেন্টে প্রায় সব ধরনের সার্জারি হয়। মোট ডাক্তারের সংখ্যা ১০০ জন। গত এক বছরে অপারেশন হয়েছে ৬৮০০০ এর মতো। ছুটি বাদ দিয়ে ২৭০ দিন কর্মদিবস থাকলে প্রতিদিন অপারেশন হয়েছে প্রায় ২৫০টি। তার মানে, প্রতিটা সার্জন দিনে অপারেশন করেছেন ২.৫টার মতো। অন্যদিকে সার্জারির আউটডোরে মোট রোগী  দেখা হয়েছে প্রায় ৬ লাখ। প্রতিদিন প্রায় ২২০০’র মতো। একজন ডাক্তার দেখেছেন প্রতিদিন ২২টা রোগী। লাখ লাখ গরিব মানুষকে সুচিকিৎসা দিয়ে তারা তাদের আয়ের মাত্র ১০ শতাংশ পান বেতন হিসেবে। আর এত ঝুঁকি নিয়ে ইনফেকশনের মধ্যেও কাজ করেন, তবুও তারা ঝুঁকি ভাতা পান না। অথচ লোকজন কিছু ঘটলেই ডাক্তারদের গায়ে হাত  তোলে, হাসপাতাল ভাঙচুর করে। অথচ পরিসংখ্যান বলে  যে, ৯৯% সুচিকিৎসা হলেও বছরে প্রায় ১০০০ জন রোগী ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার কথা। কিন্তু ২-৪ জন মারা  গেলেই শুরু হয়ে যায় আমাদের দানবীয় তান্ডব। অথচ আমরা একবারও ভাবি না যে, একজন ডাক্তার ৭ দিন অসুস্থ থাকলে তিনি প্রায় ১৪০ জন রোগীর চিকিৎসা ও ১৫ জন  রোগীর অপারেশন করতে পারবেন না। স্কুল-কলেজে যিনি  মেধাবী ছাত্র ছিলেন তারাই একদিন ডাক্তার হয়ে আসেন। সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রটিই আজ সমাজে সম্মান পাচ্ছেন কম। বিবিএস করা একজন চিকিৎসক যে মর্যাদা পান কম  মেধাবীসম্পন্ন বিসিএস অন্য প্রশাসনের লোক অনেক বেশি মর্যাদা পান। ঝুঁকি নিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজ করেও অসম্মানীত হন একজন ডাক্তার। এভাবে চলতে থাকলে ডাক্তাররা আর ঝুঁকি নিতে চাইবেন না। চিকিৎসাসেবায় ঝুঁকি নিতে হয়। ঝুঁকি না নিলে মুমূর্ষু রোগীর জন্য ক্ষতির কারণ হয়। কথায় কথায় গায়ে হাত তুললে, মামলা হামলা করলে, ভুল চিকিৎসার অপবাদ দিলে ডাক্তাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন। এটা রোগী কিংবা রোগীর পরিবারের জন্য দুঃসংবাদ বটে! ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা কি সত্যি? কতটা সত্যি? ডাক্তারদের বিরুদ্ধে চিকিৎসাসেবা না দেওয়ার যে ঢালাও অভিযোগ, তা ষোলোআনা সত্যি নয়। একেবারেই সত্যতা নেই, তা বলছি না। বলছি, অভিযোগের অনেকটাই অসত্য। তবে রোগীর পেটে ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে  দেওয়াসহ নানা রকমের ভুল চিকিৎসার সংবাদ মাঝেমধ্যেই জানা যায়। সংবাদগুলো মিথ্যা নয়। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা  নেওয়া উচিত। দেশে অনেক ডাক্তার আছেন দেবতুল্যের মতো। ডাক্তার ধর্ম পালনের মতো করে মনপ্রাণ দিয়ে রোগীর  সেবা করেন। এমন সব ডাক্তারকেও যখন আশঙ্কায় থাকতে হয়,  রোগী মারা গেলে তার ওপর আক্রমণ হতে পারে, হতে পারে হাসপাতাল ভাঙচুর। মস্তিষ্ক, হৃদরোগসহ জটিল অপারেশনে থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আমেরিকা, ইউরোপ সব জায়গায়  রোগী মারা যায়। আমাদের ডাক্তারদের সাফল্যের হার অন্য  যে কোনো দেশের ডাক্তারের চেয়ে কম নয়। তাহলে আমাদের ডাক্তারের ক্ষেত্রে কেন শারীরিক আক্রমণের আশঙ্কা  তৈরি হবে? ভুল চিকিৎসার দায়ে অভিযুক্ত হতে হবে কেন আমাদের চিকিৎসকদের? বাংলাদেশে অনেক ডাক্তার ভালো চিকিৎসা দিচ্ছেন। তাতে তাদের সুনাম শোনা যায় না কখনো। অনেক ভালো, মানবিক ডাক্তার আছেন সারাদেশে। কিছু খারাপ ডাক্তার যারা অনৈতিক বাণিজ্য করছেন তাদের তুলনায় ভালো ও নৈতিকতাসম্পন্ন ডাক্তারের সংখ্যা অনেক অনেক গুণ বেশি। মন্দের জন্য ঘৃণা করেন, সাজার ব্যবস্থা করেন এটা সমর্থন করি। ভালো যারা করছেন তাদের গুণকীর্তনও কিন্তু করা দরকার। পরিশেষে এটাই বলব, চিকিৎসকের এ মহান পেশাটা যেন কোনোভাবে কলুষিত না হয়। দেশের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে এ পেশাকে আগলে রাখতে হবে- কারণ চিকিৎসাসেবা আমাদের জন্য জরুরি বিষয়। চিকিৎসকের সেবার সঙ্গে মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি জড়িত। জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো অধিকার নেই কারও। চিকিৎসকদের মাঝে নীতিনিষ্ঠা, মানবিকতা, সদাচার, কর্তব্যপরায়ণতা- এসবগুণের বেশি পূজারী হওয়ার কথা। অনেক চিকিৎসক এমনটাই। এ জন্য অবশ্য আপনাদের ক’জন ডাক্তারকে সম্প্রতি করোনা সংকটকালীন সময়ে জীবনও দিতে হয়েছে। চিকিৎসাপেশাটা তো এমনই। আর এমনটা হওয়াই উচিত। রোগী এবং রোগীর স্বজন,  ক্ষেত্রভেদে চিকিৎসকদের কারণে ডাক্তার-রোগীর মধ্যে দূরত্ব  তৈরি হয়েছে। এ দূরত্ব কমিয়ে চিকিৎসক-রোগীর মাঝে বন্ধুত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান রাখা দরকার। চিকিৎসক, রাগী এবং রোগীর স্বজনরাই তা করবেন। রোগী-ডাক্তার সম্পর্ক অটুট থাকবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক

 

আরো খবর...