চামড়া শিল্পের পতন

তিন বছর আগে, ২০১৭ সালে চামড়াকে  ‘প্রডাক্ট অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করেছিল সরকার। লক্ষ্য ছিল ২০২১ সালের মধ্যে চামড়া শিল্প খাত থেকে বছরে ৫০০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয়। কিন্তু বিগত তিন বছরে রপ্তানি আয় যেমন ধারাবাহিকভাবে কমেছে তেমনি অভ্যন্তরীণ বাজারে চামড়ার দাম কমতে কমতে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এমন বাস্তবতায় ঈদুল আজহায় চামড়ার মৌসুম সামনে রেখে আবারও কমানো হয়েছে চামড়ার দাম। বাণিজ্যমন্ত্রী বলছেন, বাজার ছোট হয়ে গেছে। ট্যানারি মালিকরা বলছেন আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা নেই। ব্যবসায়ীরা বলছেন বিক্রি করতে পারেন না বলেই চামড়া কেনেন না তারা। অথচ, সরকার প্রতি বছরই চামড়া কেনার জন্য ট্যানারি মালিকদের স্বল্পসুদে ঋণ দিয়ে যাচ্ছে আর সেই ঋণের বেশিরভাগই অনাদায়ী থেকে যাচ্ছে। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, চামড়া শিল্পের উন্নয়ন ও ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরে সরকারের শত শত কোটি টাকার প্রল্পের কোনো সুফল এখনো পাওয়া যাচ্ছে না কেন? সোমবার দেশ রূপান্তরে ‘সাত বছরে দাম কমেছে ৫৬%’ শিরোনামের প্রতিবেদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিমুখী এই শিল্প খাতে ধারাবাহিক দরপতনের খবর প্রকাাশিত হয়।  প্রতিবেদনে বলা হয়, গত কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ীদের স্বার্থে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার দাম কমাচ্ছে সরকার। গত ঈদে নজিরবিহীন বিপর্যয়ের পর এবার গত বছরের তুলনায় আরও ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে কাঁচা চামড়ার দাম। এবার ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া ২৮-৩২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া ১৩-১৫ আর বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ থেকে ১২ টাকা। রবিবার বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে চামড়া ব্যবসায়ীদের বৈঠকে এ দাম ঘোষণা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে সাত বছরের ব্যবধানে লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম কমল ৫৬ শতাংশ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১৪ সালে কোরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৫  থেকে ৮০ টাকা। পরের বছর একবারে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ৫০ টাকায় নামিয়ে আনা হয়। ২০১৬ সালে এই চামড়ার দাম ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। ২০১৮ সালে আবারও কমিয়ে তা ৪৫  থেকে ৫০ টাকায় নির্ধারণ করা হয়। ২০১৯ সালের কোরবানির ঈদে ৩১ বছরের মধ্যে কাঁচা চামড়ার দরে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় নেমে আসে। দাম না পেয়ে অনেকেই ক্ষোভে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন।  বলাবাহুল্য দেশে বার্ষিক চাহিদার ৫০ শতাংশ চামড়াই ঈদুল আজহার সময়ে সংগ্রহ করেন ট্যানারি মালিকরা। কিন্তু রাজধানীর হাজারীবাগ  থেকে ট্যানারি পল্লী সাভারের হেমায়েতপুরে স্থানান্তরের পর থেকেই চামড়ার দাম নিয়ে অরাজকতা চলছে। প্রতি বছরই ব্যবসায়ীদের স্বার্থে চামড়ার দাম কমিয়ে নির্ধারণ করছে সরকার। চামড়ার দাম কমানোর পাশাপাশি চামড়া কিনতে প্রতি বছর ট্যানারি মালিকদের স্বল্পসুদে ঋণও দিচ্ছে সরকার। এবার কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়া কিনতে রাষ্ট্রায়ত্ত  সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক ট্যানারি ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে ৫৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। ২০১৯ সালে ২৩ ট্যানারি শিল্পকে রাষ্ট্রায়ত্ত এ চার ব্যাংক মোট ৬৫৫ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা দিয়েছিল। কিন্তু ঋণ নিলেও অনেকেই তা পরিশোধ না করায় এ খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। এদিকে কয়েক বছর ধরেই চামড়া খাতের রপ্তানি আয় একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। আর করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী লকডাউনে সর্বশেষ হিসাব বছরে এ খাতের আয় ৭৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলারে নেমে আসে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় চামড়া থেকে রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমে যাওয়ার তথ্যটি আসলে অসম্পূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজার ছোট হয়ে যাওয়ার নেপথ্যে বড় কারণটি হলো, দেশের চামড়া শিল্প কারখানাগুলোর পরিবেশগত সনদ বা যথাযথ কমপ্লায়েন্স না থাকা। ফলে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে সরাসরি চামড়া বিক্রি করা যাচ্ছে না। সাভারের  হেমায়েতপুরে চামড়া শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সিইটিপি এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এছাড়া চামড়া কাটার পর বর্জ্য কোথায়  ফেলা হবে, নির্ধারণ হয়নি সেটিও। এসব কারণে এলডব্লিউজি ও আইএসও সার্টিফিকেটও পাওয়া যাচ্ছে না। আর এ কারণেই চামড়া রপ্তানি মূলত চীনভিত্তিক হয়ে পড়েছে। এছাড়া কোরিয়া, হংকং, ভিয়েতনামের বাইরে কিছু চামড়া ইতালিতে রপ্তানি হয়। এ অবস্থায় চামড়া শিল্পের পতন ঠেকাতে চামড়া শিল্পনগরীর সিইটিপি দ্রুত সম্পন্ন করা এবং দেশের বাজারে চামড়ার যৌক্তিক দাম নির্ধারণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে সরকারকে।

 

 

আরো খবর...