দেশ থেকে মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ আর ক্ষুধার অপবাদ মুছে গেছে

ঘাটতির দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা

কৃষি প্রতিবেদক ॥ মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদার নাম খাদ্য। বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতিতে খাদ্যের ভূমিকাই অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দেশের জনগণ তাদের আয়ের বেশিরভাগ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করেন। দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি ও বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশের প্রায় সর্বত্র বছরে গড়ে দুটি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। আর এ সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছে সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম, কৃষিবিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াসের ফলে। প্রতিনিয়ত কৃষি জমি কমছে। কিন্তু নতুন নতুন উদ্ভাবনীর মাধ্যমে কৃষি সেক্টরকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। খাদ্যশস্য উৎপাদন, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ১৪.১১ শতাংশ। কৃষি ক্ষেত্রে বিজ্ঞান প্রযুক্তি ও বায়োটেকনোলজির যথাযথ প্রয়োগ করা হচ্ছে। ভাসমান বেডে সবজি উৎপাদনের পদ্ধতিটিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও) ২০১৫ সালে কৃষিতে বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। স্বাধীনতার পর সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। ‘গত ৪৫ বছরে উল্লেখযোগ্য ফসলের কৃষি পরিসংখ্যান’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিবিএস বলছে, সাড়ে চার দশকে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বেড়েছে ২ কোটি ৫০ লাখ ৮০ হাজার টন। পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সাড়ে চার দশকে বোরো ধানের ফলন বেড়েছে প্রায় ৯ গুণ। হেক্টরপ্রতি ফলনেও সবচেয়ে এগিয়ে আছে বোরো ফসল। বাড়তি উৎপাদনশীলতার কারণে বোরো চাষের আওতায় জমির পরিমাণও বাড়ছে।
১৬ অক্টোবর ছিল বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন) ২০তম সাধারণ সভায় হাঙ্গেরির তৎকালীন খাদ্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. প্যাল রোমানি বিশ্বব্যাপী এই দিনটি উদযাপনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। ১৯৮১ সাল থেকে বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিষ্ঠার দিনটিতে (১৬ অক্টোবর, ১৯৪৫) দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিবৃত্তির লক্ষ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশ্বের ১৫০টিরও বেশি দেশে এই দিনটি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে। আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তায় ক্ষুদ্র আয়তনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এনেছে অভাবনীয় সাফল্য। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, চাল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ, সবজিতে তৃতীয় ও আলুতে সপ্তম। খাদ্যশস্য উৎপাদন বেড়েছে ৩০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বর্তমানে ফসলের নিবিড়তা ১৯৪ শতাংশ। একসঙ্গে একই জমিতে সর্বোচ্চ চার রকমের ফসল ফলানো হচ্ছে, যার ফলে কৃষি জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে। কৃষিজমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। ধান, গম ও ভুট্টা বিশ্বের গড় উৎপাদনকে পেছনে ফেলে ক্রমেই এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। খাদ্যশস্য, মৎস্য ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। আলু উৎপাদনে উদ্বৃত্ত। মাছ রপ্তানিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। সবজি উৎপাদনে তৃতীয় আর চাল ও মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ অবস্থানে। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশের নাম। বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে চালের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ, গম দুই গুণ, ভুট্টা ১০ গুণ ও সবজির উৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। দেশ থেকে মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ আর ক্ষুধার অপবাদ মুছে গেছে। বর্তমানে দেশের আবাদি জমিতে বছরে গড়ে দুটি করে ফসল হচ্ছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা এখানে দারুণ সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। আবার স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে ২ টন চাল উৎপাদন হলেও তা এখন দ্বিগুণে পরিণত হয়েছে। চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ। সবজি উৎপাদনে আরো সামর্থ্য দেখিয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যমতে, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে তৃতীয়। সারা দেশে বর্তমানে ৬০ ধরনের ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। দেশে মাছ উৎপাদনও বেড়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ। আলু উৎপাদনেও বাংলাদেশে সাফল্য আরো বিস্ময়কর। দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৭০ লাখ টনের মতো। সেখানে গত বছরে আলু উৎপাদিত হয়েছিল ৯৪ লাখ ৭০ হাজার টন। ফসলের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও এরই মধ্যে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেছে। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানীরা মোট ১৩টি প্রতিকূল পরিবেশে সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এর মধ্যে লবণসহিষ্ণু নয়টি, খরাসহিষ্ণু দুটি ও বন্যাসহিষ্ণু চারটি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। বিশ্বে প্রথমবারের মতো জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের জাত উদ্ভাবন করেন বাংলাদেশের কৃষি গবেষকরা। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে এতগুলো প্রতিকূল পরিবেশসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবনের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষি প্রধান এ দেশে ১ কোটির ওপর বসতবাড়ি রয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বসতবাড়িগুলো শুধুই আবাসস্থল নয় বরং একেকটি কৃষি, মৎস্য, পশু, হস্ত ও কুটিরশিল্পের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের দেশের আবাসস্থলগুলোতেই মূলত শাকসবজি, মসলাজাতীয় ফসল, ভেষজ, ঔষধি, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল, মৎস্য প্রকৃতি চাষাবাদ হয়ে থাকে। কৃষকদের পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাবে এসব সম্পদ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমান সরকারের একটি বাড়ি একটি খামার কার্যক্রম সফল করা সম্ভব যদি কৃষকদের ধ্যান-ধারণা চিন্তার কাঙ্খিত পরিবর্তন করে এসব বসতভিটা কার্যকরী তথ্যনির্ভর জ্ঞান দ্বারা পরিচর্যা করা যায়। এ কার্যক্রম সফল হলে দেশের পুষ্টি ঘাটতি দূরীকরণ সম্ভব, সঙ্গে সঙ্গে কুটিরশিল্পের বিকাশে সহায়ক হবে।

আরো খবর...