গড়াই নদীর তীর ও শেখ রাসেল কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতু সংরক্ষণ বাধে ভাঙ্গন

সেতু রক্ষার বাঁধ প্রায় ৩০ মিটার নদী গর্ভে

নিজ সংবাদ ॥  গত কয়েকদিনে কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে পানি বাড়ায় তীব্র স্রোতের কারনে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। শনিবার রাতে হঠাৎ করেই শেখ রাসেল কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতুর পশ্চিম পাশ থেকে নদী শাসন ও সেতু রক্ষার জন্য বছর খানেক আগে নির্মিত বাঁধের বেশ কিছু অংশ নদী গর্ভে চলে গেছে। প্রায় ৫০০ মিটার জুড়ে ভাঙ্গন ছড়িয়ে পড়েছে। এতে সেতুর দক্ষিন-পশ্চিম অংশে ৫০০ মিটার এলাকা জুড়ে ভাঙ্গন ছড়িয়ে পড়েছে। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে সদ্য নির্মিত শেখ রাসেল কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতুটি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।

স্থানীয়রা জানান,‘ শনিবার সন্ধ্যায় সৃষ্ট ভাঙ্গনে রাত ৯টা পর্যন্ত এই সেতুর হরিপুর অংশের পশ্চিম প্রান্তীয় প্রটেকশন ওয়ার্কের সম্মুখ থেকে ভেঙ্গে প্রায় ১শ মিটার ব্যাসার্ধে পাড় ভেঙ্গে ঢুকে প্রটেকশন ওয়ার্কের প্রায় ৩০মিটার নদীতে তলিয়ে যায়। এখনো সেখানে ভাঙ্গনের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। বড় ধরনের ক্ষতির আগেই ভাঙ্গন কবলিত স্থানে জরুরী ভিত্তিতে মেরামতের প্রয়োজন।

স্থানীয়দের অভিযোগ আগে থেকেই ঐ স্থানটি ঝুঁকিপূর্ন হয়েছিলো। বিষয়টি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার কর্মকর্তাদের নজরে নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করাও  হয়েছিলো। কিন্তু তারা কোন প্রকার  উদ্যোগ গ্রহন না করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অবিলম্বে এই ভাঙ্গন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের দাবি এলাকাবাসী এবং ঐ এলাকায় ঘুরতে যাওয়া ভ্রমনকারীদের। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানিয়েছে, ২০১৬ সালে সেতুর দুই পাশে তারা তীর সংরক্ষন বাঁধ নির্মাণ করে। পশ্চিম অংশে ৮০০ মিটার ও সেতুর পুর্বে সাড়ে ৭০০ মিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়। জিও ব্যাগ ও বস্তায় বালু ভরে এখানে বাঁধ নির্মাণ করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। সেতু সুরক্ষার জন্য এ বাঁধের ঘা ঘেঁষে এলজিইডি ঢালায় দিয়ে কংক্রিট বাঁধ নির্মাণ করে, তার পাশে ব¬ক দিয়ে স্থায়ী বাঁধ তৈরি করে। গত বছরও ভাঙ্গন শুরু হওয়ার পর পুর্ব অংশের বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়। পরে তা মেরামত করে দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে বাঁধ নির্মাণ করে তা স্রোতের তোড়ে নদীতে বিলিন হয়ে গেছে। স্থানীয়রা জানান, নদীর গতি পথ পরিবর্তন হওয়ায় এ বছর ফের নদীতে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। প্রায় এক কিলোমিটার অংশ জুড়ে ভাঙ্গন শুরু হয়েছে। ভাঙ্গন অব্যাহত থাকলে অনেক বাড়ি-ঘর নদীতে চলে যাবে। যেভাবে ভাঙ্গছে তাতে ব্রীজের দক্ষিণ পাশের মাটি সরে গিয়ে বিপর্যয় ঘটতে পারে।

এলজিইডির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,‘ কয়েক বছর আগে যখন নদী শাসনের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হয় তখন এলজিইডির পক্ষ থেকে স্থানীয় এমপির মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে একটি পত্র দেয়া হয়। সেই চিঠিতে সেতুর দুই পাশেই আড়াই কিলোমিটার অংশ জুড়ে নদী শাসনের জন্য বাঁধ নির্মাণের অনুরোধ জানানো হয়। একই সাথে বলা হয় যে অংশে নদী শাসনের জন্য যেটুকু বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, তার দুই পাশে অতিরিক্ত আড়াই কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা না হলে এটি টিকবে না। তবে তারা আমাদের চিঠি আমলে নেয়নি।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শম্পা মাহমুদ বলেন,‘ প্রটেকটিভ এরিয়ার ভাঙ্গন বাড়ছে। সেতু রক্ষার বাঁধে প্রায় ৩০মিটার নদী গর্ভে চলে গেছে। বড় অংশ জুড়ে নিচের বালু সরে গেছে। পানি ঢুকে আরো অংশ ভেঙ্গে নদীতে চলে যেতে পারে। এটা এখনই মেরামত প্রয়োজন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায, ভাঙ্গন দেখতে এলাকার অনেক মানুষ ভীড় জমিয়েছে। চোখের সামনেই বালুর বড় বড় স্তুপ ভেঙ্গে নদীতে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। সেতুর প্রায় গা ঘেঁষে পশ্চিম অংশে গোল হয়ে প্রায় ৩০মিটার কংক্রিট বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। নিচ থেকে বালু সরে ভেঙ্গে ভেঙ্গে পড়ছে। রাতের মধ্যে ভাঙ্গন রাস্তার কাছাকাছি চলে যেতে পারে বলে অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। শনিবার বিকেলে এলজিইডির দুজন প্রকৌশলী ভাঙ্গন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তারা বলেন, তাদের অংশে ২০ মিটার মত ভেঙ্গেছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতার মধ্যে পড়ে এমন অংশে ভাঙ্গন বেশি। বড় একটি অংশ জুড়ে ভাঙ্গছে। আমরা বিষয়টি আগামীকাল (আজ) উর্দ্ধতন কর্তকর্তাদের অবহিত করব। স্থানীয় বাসিন্দা নাসির হোসেন ও আজিজ উদ্দিন বলেন,‘ কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে তীর রক্ষা বাঁধ ও ব¬ক বসনো হয়েছে। তারপরও ভেঙ্গে চলে যাচ্ছে নদীতে। অনিয়মের কারনেই এমনটি হচ্ছে বলে দাবি তাদের।’

২০১৬ সালে হরিপুরবাসীর দীর্ঘ দাবির প্রেক্ষিত শেখ রাসেল কুষ্টিয়া-হরিপুর সংযোগ সেতু নির্মাণ করা হয় প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয়ে। সেতু রক্ষার জন্য দুই পাড়ে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ব¬ক বসিয়ে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। তীর রক্ষা বাঁধের হরিপুর অংশে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ও বালুর বস্তা দিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করে।

সেতু বাস্তবায়ন কমিটির নেতা প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান টুটুল বলেন,‘ হরিপুরবাসির আন্দোলনের ফসল এই সেতু। দীর্ঘ দাবির পর গত বছর সেতু কাজ শেষে ব্যবহারের জন্য খুলে দেয়া হয়। এখন ভাঙ্গনের কারনে সেতু ক্ষতিগ্রস্থ হলে তা হবে দুঃখজনক। তাই অবহেলা  না করে এখনই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। নদীর পানি বাড়ায় স্রোতও বাড়ছে। এছাড়া খননে অনিয়মের কারনে নদীতে পলি পড়ছে। এতে নদী বিপদজনক হয়ে উঠছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলজিইডির এক কর্মকর্তা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, এখন নদী ভাঙ্গনের মুখে সেতু ঝুঁকিতে পড়লেও মূল সেতু নির্মাণ প্রকল্প সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমাদের আর কিছু করার  নেই। নদী ভাঙ্গনের বিষয়টি এখন দেখার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী এএসএম সাহেদুর রহিম বলেন, বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান জানান, ব্রীজের প্রটেকটিভ এরিয়ায় ভাঙ্গন হলে সেটা দেখবেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। তবে প্রটেকটিভ এরিয়ার বাইরে হলে সেটা আমরা দেখব।

কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক মো: মোস্তাক আহমেদ বলেন,‘ সেতুটি যাতে ঝুঁকির মধ্যে না পড়ে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ বিষয়ে এলজিইডি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে যাতে নতুন করে আর না ভাঙ্গে।’

আরো খবর...