গ্রাম পুলিশকে চতুর্থ শ্রেণির মর্যাদা দেয়ার রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ

ঢাকা অফিস ॥ দেশের গ্রাম পুলিশকে সরকারি চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর পদমর্যাদা দিতে এবং সে অনুযায়ী জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করে তা প্রদান করতে নির্দেশ দিয়ে ঘোষণা করা রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে বলা হয়েছে, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়ের মতো প্রজাতন্ত্রের ৭০ প্রকার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকেন গ্রাম পুলিশ ও মহল্লাদার। গ্রাম পুলিশের মহল্লাদারদের জাতীয় বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেডে এবং দফাদারদের ১৯তম গ্রেডে বেতন নির্ধারণ করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি বেতন স্কেল অনুসারে ২০১১ সালের ২ জুন থেকে তাদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার আইনজীবী হুমায়ন কবির পল্লব ১৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে গ্রাম পুলিশ বাহিনীর ৪৭ হাজার সদস্যকে জাতীয়করণের আদেশ দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের স্বাক্ষরের পর রায়টি প্রকাশিত হয়। রায়ে মহল্লাদারদে কে জাতীয় বেতন স্কেলের ২০তম গ্রেড এবং গ্রাম পুলিশদের ১৯তম গ্রেডে ২০১১ সালের ২ জুন থেকে সকল বকেয়া বেতন-ভাতা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে হাইকোর্ট বলেন, এটা কাঁচের মতো স্পষ্ট যে, গ্রাম পুলিশ ও মহল্লাদাররা ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক নিয়োগ পেয়ে প্রজাতন্ত্রের ৭০ প্রকার কাজে সার্বক্ষণিক নিয়োজিত থাকেন। সাধারণ মানুষের সবচেয়ে নিকটতম আত্মীয়ের মতো প্রজাতন্ত্রের কর্মে তারা নিয়োজিত। আদালত বলেন, ঝড়-বৃষ্টি, বিপদ-আপদ উপেক্ষা করে তারা বাংলার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্য থাকেন। দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার কাকে বলে এরা জানে না। হাইকোর্ট রায়ে আরও উল্লেখ করেন, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, দুনিয়া দুইভাগে বিভক্ত, নিপীড়িত ও অত্যাচারী। আমি নিপীড়িতের সাথে আছি। সুপ্রিম কোর্ট বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শ মোতাবেক নিপীড়িতের পক্ষে। ২০১৯ সালের ১৫ ও ১৭ ডিসেম্বর এই রায় ঘোষণা করেছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ। সম্প্রতি এই রায় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। সর্বশেষ স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইনের অধীনে ২০১৫ সালে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) গ্রাম পুলিশ বাহিনীর গঠন, প্রশিক্ষণ, শৃঙ্খলা ও চাকরির শর্তাবলী সম্পর্কিত বিধিমালা তৈরি করা হয়। কিন্তু এ বিধিতে তাদের কোনো শ্রেণি নির্ধারণ করা হয়নি। এদিকে এক দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় গ্রাম পুলিশদের ৪র্থ শ্রেণির স্কেল নির্ধারণে অর্থ বিভাগকে চিঠি দেন। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত তারা না নেয়ায় হাইকোর্টে রিট করা হয়। আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী হুমায়ন কবির, মো. মোজম্মেল হক, মোহাম্মদ কাওসার, মোহাম্মদ মাজেদুল কাদের ও নূর আলম সিদ্দিকী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ায়েস আল হারুনী, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইলিন ইমন সাহা, শায়রা ফিরোজ ও মাহফুজুর রহমান লিখন। রায়ে বলা হয়, সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ মোতাবেক আইনানুযায়ী ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে তার ন্যায্য অধিকার থেকে তথা ন্যায্য প্রাপ্যতা থেকে তথা ন্যায্য প্রত্যাশা থেকে তথা আইনসম্মত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না। বর্তমান মোকাদ্দামায় দরখাস্তকারীরাসহ সব মহল্লাদার ও দফাদারদের ন্যায্য অধিকার বিধিমালা ২০১১ অনুযায়ী বেতন-ভাতাদি পাওয়া কথা। কিন্তু প্রতিপক্ষরা দরখাস্তকারীরাসহ সব মহল্লাদার ও দফাদারদের ন্যায্য অধিকার থেকে বেআইনিভাবে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত করে আসছে। রায়ের আদেশ অংশে বলা হয়, ২০১১ সালের ২ জুন থেকে মহল্লাদারদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ (বর্তমানে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫) এর ২০তম গ্রেডে বেতন-ভাতাদি দিতে এবং দফাদারদের জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ (জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫) এর ১৯তম গ্রেডে বেতন-ভাতাদি দিতে প্রতিপক্ষদের নির্দেশ দেওয়া হলো। আরও বলা হয়, ২০১১ সালের ২ জুনের পর থেকে স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) কর্মচারী চাকরি বিধিমালা ২০১১ বহির্ভূতভাবে মহল্লাদার ও দফাদারের যেকোনো নিয়োগ অবৈধ ও বেআইনি মর্মে গণ্য হবে। ২ জুনের পর থেকে বিধিমালা ২০১১ বহির্ভূত যেকোনো নিয়োগ আপনা আপনি বাতিল হবে। এর আগে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর গ্রাম পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ৪র্থ শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের স্কেলের সমপরিমাণ বেতন কেন দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। ২০১৭ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার ধামরাইয়ের টুপিরবাড়ীর হাটকুশারা এলাকার বাসিন্দা গ্রাম পুলিশ লাল মিয়াসহ ৩৫৫ জন গ্রাম পুলিশ এ রিট দায়ের করেন। বর্তমানে প্রায় ৪৬ হাজার গ্রাম পুলিশের একজন দফাদার বেতন পান ৩ হাজার ৪শ এবং মহালদার পান ৩ হাজার টাকা। পরে আইনজীবী হুমায়ুন কবির বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকে এ বাহিনী বিভিন্ন আইনের অধীনে কাজ করে আসছে।

আরো খবর...