গ্রাম্য নারীদের আলোকশিখা নূরজাহান ধর্মান্ধদের হামলায় ঘরছাড়া

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি ॥ কুসংস্কার জয় করে গ্রাম্যনারীদের আনতে চেয়েছিলেন আলোরপথে। করতে চেয়েছিলেন স্বাবলম্বী। এ পথে অনেকদূর এগিয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু গ্রামের মোল্লা-মাতব্বর আর ধর্মান্ধ হুজুরদের হামলায় থেমে গেছে সে দীপশিখা। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের এই আলোকশিখার নাম নূরজাহান। যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বামী পরিত্যক্তা, গরিব-অসহায় আর বিধবা নারীদের শিখিয়েছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মন্ত্র।

নূরজাহান এখন এলাকাছাড়া। তাঁর সংগ্রামের গল্পটা যেন মালালা ইউসুফজাইয়ের মতোই। যিনি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে পিছিয়ে পড়া নারীদের স্বাবলম্বী করতে চেয়েছিলেন। ধর্মান্ধদের কারণে গ্রাম ছাড়লেও তাঁর অর্জন একেবারে কম নয়। স্বামী পরিত্যক্তা এই সাধারণ নারী এখন বহু নারীর কাছে অসাধারণ এবং প্রদীপশিখার মতোই। সবাইকে হাতের কাজ শেখান। তাঁতের শাড়ি বুনে স্বাবলম্বী করেছেন নিজ গ্রাম বাতপাড়াসহ পার্শ্ববর্তী এলাকা। কিন্তু অন্যের ঘর আলোকিত করতে গিয়ে নূরজাহানের নিজের ঘরে নেমে এসেছে চরম অমানিশা। এলাকার মোল্লা সম্প্রদায় ইতোমধ্যে গ্রামছাড়া করেছে তাঁকে। নিরূপায় নূরের গন্তব্য কোথায় তা জানেন না তিনি। এলাকা ছেড়ে আপাতত ঠাঁই মিলেছে তাঁর ভাগ্নের বাসায়। আশায় আছেন যদি কোনদিন পূরণ হয় তাঁর মনের আশা। কিন্তু ধর্মভীরুদের দল তাঁকে তাড়া করে ফিরছে। যেকোনোভাবে মারতে চায় তাঁকে। কারণ নূরজাহানের হাত ধরে গ্রাম আলোকিত হলে বন্ধ হয়ে যাবে ধর্মব্যবসা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নারায়নগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার বাতপাড়া গ্রামে ছিল নূরজাহানের বাড়ি। সেখানকার পরিবেশ-প্রতিবেশ মিলে তাঁর বড় হওয়া, বেড়ে ওঠার গল্পটা ভিন্নরকম। বিয়ে হয়েছিল দরিদ্রঘরের মো. দুলালের সঙ্গে। একসন্তান হওয়ার পর দুলাল যৌতুকের জন্য চাপ দিতে থাকে। দিন যায় আর মারধোরও বাড়তে থাকে টাকার জন্য। বাবা মোহাম্মদ আলী আর মা রুমমালা বেগমের মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। নিরুপায় নূরজাহান তাঁর বোনের ছেলের মাধ্যমে ঢাকায় একটি চাকরি খুঁজতে থাকে। এই সময়ের মধ্যে স্বামী মো. দুলাল তাঁকে তালাক দেয়। শুরু হয় নূরের নতুন পথচলা। অসুস্থ পিতা একবেলা খাবার জোটাতেও অক্ষম। অথচ শিশু কন্যাসহ দরিদ্র পিতার ঘরে চেপে বসে নূরজাহান। খেয়ে না খেয়ে দিন অতিবাহিত হতে থাকে। দারিদ্রের কষাঘাতে ধাক্কা খেতে খেতে একসময় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখেন। শুরু হয় তাঁত বোনার প্রশিক্ষণ। সেই থেকে নারীদের স্বাবলম্বী করার নানামূখি উদ্যোগ নেন তিনি। অজপাড়াগ্রামের মানুষ স্বপ্ন দেখতে থাকেন ঘুরে দাঁড়ানোর।

কুসংস্কারাচ্ছন্ন হুজুরদের বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে চলে নূরজাহান। অল্পদিনেই বাড়তে থাকে নূরজাহানের সুখ্যাতি। ইতোমধ্যে জুটে যায় আরও অনেক স্বামী পরিত্যক্তা, গরিব-অসহায়। সবাইকে তিনি দিতে থাকেন স্বাবলম্বী হওয়ার পরামর্শ। ক্রমশ: এক থেকে বহু নারীর জীবন পাল্টাতে থাকে। এক সময়ের অসহায়েরা নতুন স্বপ্নে হন উজ্জিবিত। আর এতেই ক্ষুব্ধ হন গ্রামের একটি বিশেষ শ্রেণি। কারণ নূরজাহান নারীদের শিক্ষা দিতে থাকেন পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য। কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা দূর করে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে আহ্বান জানান তাঁর গ্রামের অসহায় নারীদের। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে সোনারগাঁর কিছু মোল্লা-মোড়লেরা। একাধিক ইমামের মাধ্যমে নূরজাহানের কর্মকান্ডের উপর ফতোয়া দেয়া হয়। নতুন করে আবারও সমস্যায় পড়েন নূর। নূরজাহান একটি গণমাধ্যমে সাক্ষাতকার দিয়ে বলেন, কেউ অশিক্ষিত মোল্লা হয়ে জন্মায় না। সমাজের নানান অসঙ্গতি তাকে মোল্লা বানিয়ে ফেলে। কারণে সে যদি শিশুকালে এটি বুঝতে পারতো তাহলে মোল্লা হতো না। শৈশবের খেলাধুলো, গান-বাজনার অভাব, খাদ্য সঙ্কট বাচ্চাদের এই পথে নিয়ে যায়। কিন্তু নূরজাহানের এ কথায় চরম নাখোশ হয় মোল্লারা। এ ঘটনার পর দ্বিতীয়বারের মতো গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয় নূরজাহান ও তাঁর মেয়ে। ঢাকার একটি বাড়িতে আশ্রয় মিললেও সেখানেও তাঁর স্বামী ও কতিপয় ধর্মান্ধ দুর্বৃত্তরা হামলার পরিকল্পনা করে। থানায় গেলেও মামলা নেয় না পুলিশ। স্থানীয় সাংবাদিকেরা তাঁর সম্পর্কে জানতে গেলে নূরজাহান বলেন, এখন আমার সাক্ষাতকার নিবেন না। তাতে আমি আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবো। হয়তো কোন একদিন এই চক্রের ঘুম ভাঙবে। অথচ নূরজাহান এলাকা ছাড়া হওয়ায় উদ্বেগ-আতঙ্কে আছেন নারীরা। কারণে-অকারণে তাদেরকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। তাঁত বুননের কাজ ছাড়তে চাপ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রাণের ভয়ে এলাকা ছাড়লেও মৃত্যুভয় তাড়া করে ফিরছে। জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে গেলেও সুরক্ষা মেলেনি। গিয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে। উল্টো নাজেহাল হয়েছেন সেখানেও। উপরন্তু মাতব্বররাই যোগ দিয়েছে মৌলবাদীদের দলে। সেই থেকে মৃত্যুভয় পিছু ছাড়ছে না নূরজাহানের।

আরো খবর...