গ্রামীণ সাংবাদিকতার প্রবাদপুরুষ কাঙ্গাল হরিনাথ’র ১৮৬তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন

কুমারখালী প্রতিনিধি ॥ উনবিংশ শতাব্দীর কালজয়ী সাধক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক সমাজসেবক ও নারী জাগরণের অন্যতম দিকপাল কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের ১৮৬তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন করা হয়েছে। এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টায় কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর হলরুমে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ।

কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মুহাম্মদ নূর- এ আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সচিব (যুগ্ম সচিব) মো: আবদুল মজিদ, কুমারখালী পাবলিক লাইব্রেরীর সাধারন সম্পাদক মমতাজ বেগম।

প্রধান আলোচক হিসাবে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তণ অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী। আলোচক হিসাবে বক্তব্য রাখেন, মুজিবনগর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন রায়, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল মো: আনছার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদর্শক প্রভাষক সৈয়দ এহসানুল হক। এ ছাড়াও স্থানীয় সাংবাদিক কে, এম আর শাহীন বক্তব্য রাখেন। আলোচনা অনুষ্ঠান শেষে স্থানীয় শিল্পীদের পরিবেশনায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কালজয়ী এই সাংবাদিক ১২৪০ সালের ৫ই শ্রাবণ (ইংরেজি ১৮৩৩) কুষ্টিয়া জেলার (তদানীন্তন নদীয়া) কুমারখালী শহরের কুন্ডুপাড়ায় বাবা হলধর মজুমদার ও মা কমলিনী দেবীর সংসারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। শৈশবেই মাতৃ ও পিতৃহারা হয়ে চরম দারিদ্রতার মধ্যদিয়ে বেড়ে উঠেন কাঙ্গাল হরিনাথ। ৬৩ বছরে জীবনকালে তিনি সাংবাদিকতা, আধ্যাত্ম সাধন, সাহিত্যচর্চা সহ নানাধরণের সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। কালজয়ী এই সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ ছিলেন অত্যার ও জুলুমের বিরুদ্ধে আপসহীন। তৎকালীন সময়ে তিনি (১৮৫৭ সাল) প্রাচীন জনপদ কুমারখালীর নিভৃত গ্রাম থেকে হাতে লেখা পত্রিকা মাসিক গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা প্রকাশ করেন। তিনি গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায় ইংরেজ নীলকর, জমিদার ও শোষক শ্রেণীর অত্যাচার, জুলুম, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সামাজিক কু-প্রথার বিরুদ্ধে খবর প্রকাশ করেন। হাজারো বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে তিনি পত্রিকাটি প্রায় একযুগ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে মাসিক থেকে পাক্ষিক এবং ১৮৬৩ সালে সাপ্তাহিক আকারে কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারতœ প্রেস থেকে নিয়মিত প্রকাশ করেন। এতে চর্তুদিকে সাড়া পড়ে যায়। ১৮৭৩ সালে কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার তাঁর সুহৃদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়’র বাবা মথুরনাথ মৈত্রয়’র আর্থিক সহায়তায় কুমারখালীতে এম, এন প্রেস স্থাপন করে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র প্রকাশনা অব্যাহত রাখেন। সাধকপুরুষ ও কালজয়ী সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার বাংলা ১৩০৩ সালের ৫ বৈশাখ (ইংরেজি ১৮৯৬ সাল, ১৬ এপ্রিল) নিজ বাড়িতে দেহত্যাগ করেন। তিনি মৃত্যুকালে তিন পুত্র, এক কন্যা এবং স্ত্রী স্বর্ণময়ীকে রেখে যান। সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার প্রায় ৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর কয়েকটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তবে বেশিরভাই অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। তাঁর গ্রন্থগুলোর মধ্যে বিজয় বসন্ত একটি সফল উপন্যাস। গবেষকদের মতে, কাঙ্গাল হরিনাথ রচিত বিজয় বসন্ত উপন্যাসটিই বাংলা ভাষায় লেখা প্রথম উপন্যাস। আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কালজয়ী সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি রক্ষার্থে সরকারি উদ্যোগে কুমারখালীতে সাংবাদিক কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ করা হলেও এখনো অবহেলিত রয়েছে তাঁর জন্মভিটা (বাস্তুভিটা)। এ ছাড়াও কাঙ্গাল হরিনাথ ব্যবহৃত ও গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’র সেই মুদ্রণ যন্ত্রটি এখনো অযতœ অবহেলায় অন্ধকার একটি ভাঙ্গা ঘরে পড়ে রয়েছে। এজন্য অনতিবিলম্বে ঐতিহ্যবাহি এই মুদ্রণ যন্ত্রটি কাঙ্গাল হরিনাথ স্মৃতি জাদুঘরে স্থানান্তর এবং কাঙ্গালের সমাধিসহ জন্মভিটা (বাস্তুভিটা) সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবী জানান বক্তারা।

আরো খবর...