খোকসায় আওয়ামী লীগের সম্মেলন ঘিরে দফায় দফায় সংঘর্ষ জড়ালো নেতা-কর্মিরা, আহত অর্ধশতাধিক

কেন্দ্রীয় নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন
বাবুল আখতার সভাপতি ॥ তারিকুল ইসলাম সম্পাদক

খোকসা প্রতিনিধি ॥ ৭ বছর পর কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনকে ঘিরে কয়েক দফায় সংঘর্ষে জড়ায় নেতা-কর্মিরা। মাঠ দখল, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষে জড়ায় তারা। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করে। আহত হয়েছে উভয় পক্ষের কমপক্ষে অর্ধশত নেতা-কর্মি। আহতদের অনেককে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতাল ও খোকসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে ভর্তি করা হয়েছে।

জানা গেছে, দীর্ঘ ৭ বছর পর খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের দিন ধার্য ছিল ২৫ নভেম্বর সোমবার। গতকাল সোমবার দুপুর ২টায় জানিপুর হাইস্কুল মাঠে এ সম্মেলনের অয়োজন করা হয়। সম্মেলন উপলক্ষে উপজেলায় ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। তবে সকাল ১০টায় মাঠ ও চেয়ার দখলকে কেন্দ্র করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল আখতার ও সাধারন সম্পাদক তারিকুল ইসলামের সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। বাবুল আখতার স্থাণীয় সাংসদ ব্যারিষ্টার সেলিম আলতাফ জর্জ অনুগত আর তারিকুল ইসলাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খানের অনুগত।

এরপর দুপুর ২টার আগে আরো দুই দফা সংঘর্ষ হয় তাদের মধ্যে। ভাংচুর করা হয় দোকান-পাট। এ সময় দুই পক্ষের কমপক্ষে অর্ধশতাধিক নেতা-কর্মি আহত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে আসে। সংঘর্ষ নিয়ে দুই গ্র“পের নেতা-কর্মিরা একে অন্যকে দোষারোপ করেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালেই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবুল আখতার ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আল মোর্শেদ খান শান্তর সমর্থকরা পুরো মাঠ দখল করে নেয়। এ সময় সদর উদ্দিন খান ও তারিকুল ইসলামের সমর্থকরা এসে চেয়ার দখলকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে দুই গ্র“পের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এ সময় আহত কমপক্ষে ১৫জন।

জানা গেছে, এরপর খোকসা পৌর এলাকার তেল পাম্প এলাকায় জড়ো হয় সদর উদ্দিন ও তরিকুলের কয়েক হাজার সমর্থক। তাদের হাতে ছিল লাঠি, দা, কুড়াল, রামদাসহ দেশীয় অস্ত্র। তারা মিছিল নিয়ে সম্মেলনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। এ সময় পুলিশ অনেককে লাঠি না নিয়ে যাওয়ার জন্য বাঁধা দেয়। অনেকেই এ সময় জোর করে লাঠি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

এরপর বাবুল আখতারের লোকজন টেন পেয়ে পুলিশের সামনেই লাঠি, হাসুয়া, হাত কুড়াল ও রামদা নিয়ে তাদের ধাওয়া করলে তারা পিছু হটে। এ সময় দুইপক্ষ সংঘর্ষ জড়িয়ে পড়ে। বাবুল আখতার সমর্থকরা সদর উদ্দিন খানের অনুগতদের রাস্তায় ওপর ধরে ব্যাপক মারপিট করে। এতে গুরুতর জমখ হয় অনেকে। তাদেরকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা। এ সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যাপক লাঠিচার্জ করে। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় পুরো এলাকাজুড়ে। ভয়ে শহরের দোকান পাট বন্ধ হয়ে যায়। ভাংচুর করা হয় বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

সভাস্থল ও আশ পাশ এলাকায় হামলা পাল্টা হামলায় রবিন খান (২৮), জয়নাল মোল¬া (৫৫), শ্রমিক লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম ওরফে সাইদুল (৪৩), আকাশ (১৮), আছিব (১৬), উজ্জল (৪৮), সাগর (২৬), নয়ন (৩০), লিটন (৩০), জিহাদ (১৭), দুলাল (২৮), মতিন শেখ (৩৫), হজরত (৩২), রওশন(৪৫), আলম (৫৫), হাসান খা (৫৫), মাহাতাব মন্ডল (৫৪), ময়েন উদ্দিন (৪৭), আবু বক্কর (৬৫), রহমত জোয়াদ্দার (৬০), তানছের খান (৬০), রানা (২৬), মমিন (৩৫), গোলাম মস্তোফা (৫০), ইসমাইল (৬০), শরিফুল (৩৫), আমিরুল (৪৯), মাজেদ (৩৫), আলহাজ্জ (৪০), উজ্জল (৪০), হাফিজুল (৩৬), মনোয়ার (৩৫) আহত হয়। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপে¬ক্সে ভর্তি করা  হয়েছে। এ ছাড়া বাঁকীরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।

সংষর্ঘ চলাকালেই সম্মেলনস্থলে আসেন কেন্দ্রীয় ও জেলার নেতারা। তারা উপস্থিত নেতা-কর্মিদের লাঠি ফেলে দিতে বলে। এ সময় মাইক নেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। তিনি নেতা-কর্মিদের শান্ত থাকার আহবান জানান। এক পর্যায়ে ব্যাপক পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

বেলা তিনটার দিকে পুলিশী পাহাড়ায় জাতীয় সংসদের হুইপ ও কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাইদ আল মাহামুদ স্বপন, এসএম কামাল হোসেন এমপি, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, সিনিয়র সহ-সভাপতি হাজী রবিউল ইসলাম, কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনের সংসদ সদস্য সেলিম আলতাফ জর্জ,  জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক বাবু স্বপন কুমার ঘোষ সভাস্থল খোকসা জানিপুর সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে পৌঁছায়। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বাবুল আখতারের সভাপতিত্ব প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। পরে জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে দ্বিতীয় অধিবেশন শুরু হয়। এ অধিবেশনে বাবুল আখতারকে সভাপতি ও তারিকুল ইসলামকে সাধারন সম্পাদক করে খোকসা উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষনা করা হয়।

বাবুল আখতারের সমর্থকরা জানান, সদর উদ্দিন খানের লোকজন প্রথমে হামলা করে।  এতে আমার অনেক সমর্থক আহত হয়।

আর তরিকুল ইসলাম বলেন, বাবুলের লোকজন হামলা করে আমার শতাধিক লোককে আহত করেছে।

কেন্দ্রীয় নেতা আবু সাঈদ বলেন, দল ক্ষমতায় না থাকলে কারো পিঠের চামড়া থাকবে না। তাই গুন্ডাগিরি ও গিট্টু লাগানো ছাড়েন। সোজা পথে আসেন। সব পক্ষকে এক হয়ে এক সাথে রাজনীতি করতে হবে। যত বড়ই নেতাই হন না কেন শেখ হাসিনা ধরলে খবর আছে। তাই সাবধান হয়ে যান। সবাই শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করবেন। কেউ কারো ওপর হামলা করবেন না।

পরে দুই পক্ষের নেতাদের মঞ্চে ডেকে একে অন্যের সাথে মিল করিয়ে দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান কমিটি ঘোষনা করেন। পুনরায় বাবুল আখতারকে সভাপতি ও তারিকুল ইসলামকে সাধারন সম্পাদক করে ৬ সদস্যের কমিটি ঘোষনা করা হয়।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন, পুলিশ কঠোর ভূমিকা রেখেছে। যারা সংঘাতে জড়িয়ে পরে তাদের ওপর অ্যাকশন নেয়া হয়েছে। বিশৃংখলাকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। পুরো পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আছে।’

আরো খবর...