খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের করণীয়

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের আশঙ্কা দেখছে জাতিসংঘ। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো টোরেটো এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে বিভিন্ন দেশের সরকারের নেয়া সংরক্ষণশীল পদক্ষেপের কারণে এ সংকট দেখা দিতে পারে। তিনি বলেছেন, ফলন ভালোই হয়েছে এবং প্রধান খাদ্যশস্যের ফলন বেশ আশাব্যঞ্জক পর্যায়ে ছিল। তবে করোনাভাইরাসজনিত সংকটের কারণে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সংরক্ষণবাদী পদক্ষেপ হিসেবে আমদানি-রফতানি নিষিদ্ধ করায় সামনের দিনগুলোয় সমস্যা দেখা দিতে পারে। তার মতে, এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ যেটা ঘটতে পারে তা হল বিভিন্ন দেশের সরকার কর্তৃক খাদ্য প্রবাহে বিধিনিষেধ আরোপ। তিনি এমন বিধিনিষেধ কিংবা বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা আরোপের বিরোধিতা করে বিশ্বজুড়ে খাদ্য প্রবাহের সুরক্ষা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে সৃষ্ট শঙ্কা এবং এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করণীয়, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য। বিশ্ব যে একটি ‘গে¬াবাল ভিলেজ’- এমন ধারণা এ মুহূর্তে অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। করোনায় আক্রান্ত প্রায় সব দেশই নিজেদের জনগণকে সুরক্ষা দিতে নিয়েছে সংরক্ষণশীল পদক্ষেপ। বেশিরভাগ দেশ ভিসা প্রদান বন্ধ করে দিয়েছে। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থা প্রায়ই বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে স্টেডিয়ামের খেলা থেকে শুরু করে বড় বড় সব বৈশ্বিক আয়োজন। অর্থাৎ অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে গোটা বিশ্ব। করোনার প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাণিজ্যে। বিশ্বব্যাপী আমদানি-রফতানি হ্রাস পাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বহুজাতিক ব্যাংকিং ও হোল্ডিং কোম্পানি জেপি মর্গা বলেছে, পরপর আগামী দুই প্রান্তিকে বিশ্ব অর্থনীতিতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি দেখা দেবে করোনাভাইরাসের প্রভাবে। চলতি বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০১৯ সালের চেয়ে অর্ধেক কমে যাবে, জানিয়েছে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর সংগঠন ওইসিডি। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে করোনাভাইরাসের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ৩৫টি দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের কারণে চীনের মধ্যবর্তী পণ্য রফতানি দুই শতাংশ কমলে যে ৩৫টি দেশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, বাংলাদেশ তার একটি। করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের বস্ত্র ও তৈরি পোশাকশিল্প খাত, কাঠ ও আসবাবশিল্প এবং চামড়াশিল্পে ক্ষতির আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি শ¬থ হওয়ায় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে চামড়াশিল্পে। এ শিল্পে ১৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বস্ত্র ও আসবাবপত্র শিল্পে এক মিলিয়ন ডলার করে ক্ষতি হতে পারে। এদিকে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের ১৪টি খাত করোনার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পোশাক খাতের অ্যাক্সেসরিজ, প্রসাধন, বৈদ্যুতিক পণ্য, পাট সুতা, মুদ্রণ শিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম, চশমা, কম্পিউটার ও যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক পণ্য, কাঁকড়া ও কুঁচে এবং প¬াস্টিক শিল্প। এখন বৈশ্বিক খাদ্য সংকট প্রসঙ্গে ফেরা যাক। করোনাভাইরাসের শেষ কোথায় এবং মানুষ কবে নাগাদ তাদের স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারবে- এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এ মুহূর্তে কারও জানা নেই। কেউ বলছেন, আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কমে এলেও করোনাভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি শেষ হতে অনেক সময় নেবে। আবার কেউ বলছেন, এ সময় সম্ভবত কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে। বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব চলাকালে বৈশ্বিক খাদ্যের সরবরাহ ও চাহিদা নিয়ে এফএও’র কিছু ধারণা প্রকাশিত হয়েছে। সরবরাহের দিক থেকে এগুলো হল- ক. এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান না হলেও খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পাওয়া; খ. আগামী এপ্রিল- মে মাসে খাদ্য সরবরাহ চেইন বা প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া; গ. শ্রমিক স্বল্পতার কারণে খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ, বিশেষ করে শ্রমিকনির্ভর শস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যাহত হওয়া। ঘ. গবাদিপশুর খাদ্যের অভাব এবং পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে কসাইখানাগুলোর পুরোপুরি সদ্ব্যবহার না হওয়ায় মাংস উৎপাদন কমে যাওয়া; ঙ. যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা ও সঙ্গনিরোধ পদক্ষেপগুলোর ফলে বাজারে কৃষকদের আগমনে বাধা সৃষ্টি হওয়া এবং বিক্রয় ব্যবস্থা ভেঙে পড়া; চ. যানবাহন গমনাগমনের পথ বন্ধের ফলে নতুন খাদ্যের সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়াসহ খাদ্যের অপচয় বৃদ্ধি। চাহিদার দিক থেকে এগুলো হল- ক. করোনাভাইরাস বিস্তারের শুরুর দিকে খাদ্যের চাহিদা বৃদ্ধি; খ. অনানুপাতিক হারে মাংসের ব্যবহার কমে যাওয়া; গ. ছোঁয়াচে ভীতিতে খাবার বাজারে ক্রেতাদের যাতায়াত কমে যাওয়ায় খাদ্য ভোগ হ্রাস পাওয়া; ঘ. খাদ্য বিক্রয়ের ধরনে পরিবর্তন আসা। যেমন ই-কমার্সের মাধ্যমে খাবার সরবরাহ এবং বাড়িতে খাবার খাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে রেস্তোরাঁয় খদ্দের হ্রাস; ঙ. খাদ্য আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য বড় সমস্যা সৃষ্টি হওয়া। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এফএও’র এসব ধারণার কিছু কিছু ইতিমধ্যে বাস্তবরূপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কাজাখস্তান ইতিমধ্যেই গমের আটা রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে এবং শাকসবজি রফতানির ওপর সীমা আরোপ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গম রফতানিকারক রাশিয়া পণ্যটির রফতানিতে সীমা আরোপ করতে পারে।  বৈশ্বিক চাল রফতানিতে শীর্ষ দেশ ভারত এরই মধ্যে তিন সপ্তাহের লকডাউনে চলে গেছে। ফলে ভারত থেকে পণ্যটির সরবরাহ চ্যানেল এখন থমকে দাঁড়িয়েছে। ভিয়েতনাম চাল রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। একই পথে হাঁটতে পারে থাইল্যান্ডও। রফতানি সীমাবদ্ধতার কারণে বাড়ছে চালের দাম। উলে¬খ্য, এর আগে ২০০৮ সালের খাদ্য সংকটকালে চালের মূল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছিল টনপ্রতি ১ হাজার ডলারের কাছাকাছি। সে সময় রফতানিতে সীমা আরোপ এবং আতঙ্কে ক্রয়প্রবণতা বৃদ্ধির কারণে আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছিল পণ্যটির মূল্য। রাশিয়ার ভেজিটেবল অয়েল ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে সূর্যমুখীর বীজ রফতানিতে সীমা আরোপের আহ্বান জানানো হয়েছে। পাম অয়েলের দ্বিতীয় শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ মালয়েশিয়ায় পণ্যটি উৎপাদনের গতিও এখন বেশ শ¬থ হয়ে এসেছে। বিপরীতে আমদানিকারক দেশগুলোয় খাদ্যপণ্যের চাহিদাও এখন বাড়তির দিকে। ইরাকে গঠিত এক ‘ক্রাইসিস কমিটি’ দেশটিতে কৌশলগত খাদ্য মজুদ গড়ে তোলার সুপারিশ জানিয়েছে। এর ভিত্তিতে দেশটি এরই মধ্যে ১০ লাখ টন গম ও আড়াই লাখ টন চাল আমদানির প্রয়োজনীয়তার কথা ঘোষণা দিয়েছে। চাল আমদানিকারক দেশ ফিলিপাইনে মাত্র দু’মাসের চাল মজুদ আছে। চালের বাণিজ্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থবির হয়ে থাকলে ফিলিপাইনসহ এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশ নাজুক অবস্থায় পড়বে। শীর্ষ আমদানিকারক ইন্দোনেশিয়াসহ এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশগুলোর হাতে জুন পর্যন্ত গমের মজুদ আছে। এখন প্রশ্ন হল, এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কী করণীয়? এটা ঠিক, অনুকূল আবহাওয়ার কারণে আমাদের প্রধান খাদ্য চালের উৎপাদন সন্তোষজনক হওয়ায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী গত অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি খাতে পণ্যটির আমদানি মাত্র ২ লাখ ৫ হাজার টনে সীমাবদ্ধ থাকে। চলতি অর্থবছরেও চাল উৎপাদনে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা আমনের উৎপাদন ভালো হয়েছে। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকের মতে সদ্য সমাপ্ত আমনের উৎপাদন গত অর্থছরের উৎপাদনকে (১ কোটি ৫৩ লাখ টন) ছাড়িয়ে যাবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত শুধু বেসরকারি খাতে ৪ হাজার ১৮ টন চাল আমদানি হয়েছে। চাল উৎপাদনে শীর্ষস্থানে থাকা আসন্ন বোরো ফসলের উৎপাদন সন্তোষজনক হবে বলে আশা করা যায়, যদি না ২০১৭ সালের মতো আগাম বন্যায় হাওরাঞ্চলের বোরো ফসল অথবা ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশের অন্যত্র ফসলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চাল উৎপাদনে আমরা স্বনির্ভরতার কাছাকাছি পৌঁছলেও পণ্যটির আমদানির প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে যায়নি। করোনাভাইরাসের জন্য শীর্ষ রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ার শঙ্কায় চাল আমদানির বর্তমান উচ্চহারের শুল্ক কিছুটা হ্রাস করে বেসরকারি খাতে দুই লাখ টন চাল আমদানির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। খাদ্যশস্যের চাহিদায় দ্বিতীয় স্থানে আছে গম। পণ্যটির বার্ষিক চাহিদা কমবেশি ৭০ লাখ টন। আমরা উৎপাদন করি ১২ থেকে ১৩ লাখ টন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ২৩ মার্চ পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি খাতে ৫১ লাখ ৭৮ হাজার টন গম আমদানি করা হয়েছে। রফতানিকারক দেশগুলো থেকে পণ্যটির রফতানি সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা এবং বড় বড় আমদানিকারক দেশগুলোর বাড়তি চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় অবশিষ্ট গম আমদানি ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন। মাংস, ভোজ্যতেল, ডাল, চিনি, গুঁড়োদুধ, ফলমূল, পেঁয়াজ, রসুন, আদাসহ বিভিন্ন মসলায় আমরা বহুলাংশে আমদানিনির্ভর। এসব খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা মজুদ গড়ে তুলতে এখনই পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। খাদ্যনিরাপত্তার সংজ্ঞানুযায়ী তখনই খাদ্যনিরাপত্তা বিরাজমান যখন সবার কর্মক্ষম, স্বাস্থ্যকর ও উৎপাদনমুখী জীবনযাপনের জন্য সবসময় পর্যাপ্ত পরিমাণে নিরাপদ এবং পুষ্টি মানসম্পন্ন খাদ্যের লভ্যতা ও প্রাপ্তির ক্ষমতা বিদ্যমান থাকে। এ সংজ্ঞানুযায়ী বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান মোটেই সন্তোষজনক নয়। সবশেষে বলতে চাই, বৈশ্বিক করোনাভাইরাসের কারণে খাদ্য রফতানিকারক দেশগুলোর খাদ্যপণ্য রফতানিতে রক্ষণাত্মক মনোভাবের কারণে কমপক্ষে আগামী ছয় থেকে নয় মাসের জন্য খাদ্যপণ্যের সন্তোষজনক মজুদ গড়ে তুলতে সরকারকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। লেখক ঃ সাবেক খাদ্য সচিব।

 

 

 

আরো খবর...