কেশ জটিলতা!

একশ্রেণির যুবক চুল এমনভাবে কাটেন যে তাদের দুই কানের ওপরের অংশে চুল থাকেই না। কিন্তু মাথার ওপরের অংশে ঘন চুল থাকে। এই চুল বেশ দীর্ঘ হয়। হাঁটার সময় কিংবা মোটরসাইকেল চালানোর সময় এই চুল বাতাসে দুলতে থাকে। এভাবে চুল কাটানোকে ‘বখাটে কাটিং’ বলছে মাগুরা জেলার পুলিশ। এই স্টাইলে চুল না কাটতে সেলুনমালিক ও নরসুন্দরদের লিখিত নির্দেশনা দিয়েছে মাগুরা সদর থানা-পুলিশ। আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এ বিষয়ে ব্যাপক মাইকিং, সেলুন কর্মীদের নিয়ে বৈঠকসহ নানা রকম প্রচারণা চালানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে সেলুন মালিকদের জানানো হচ্ছে, কোনো সেলুনকর্মী কারো চুল কিংবা দাড়ি যেন মডেলিং ও বখাটে স্টাইলে না কাটেন। তবে বিষয়টি নিয়ে নাগরিকরা নানা রকম প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। সম্প্রতি মাগুরায় কিশোর ও উঠতি বয়সের যুবকদের হাতে খুনসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, যেটির পেছনে তাদের অস্বাভাবিক জীবনযাপন ও আচরণের যোগসূত্র পেয়েছে পুলিশ। এ কারণে নতুন প্রজন্মকে সচেতন করতে এ প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘মানুষের লাইফস্টাইলের সঙ্গে তার আচরণের নানা যোগসূত্র রয়েছে। অনেকে উদ্ভট পোশাক পরে এবং উদ্ভট স্টাইলে চুল কাটে, যা দৃষ্টিকটু ও অস্বাভাবিক। সেটি তার জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই ফেলবে। এ কারণে এটি প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে সবার আগে জরুরি সচেতনতা। সে কাজটিই আমরা করছি। এরই মধ্যে এর ইতিবাচক ফলও পাচ্ছে শহরবাসী।’ কিন্তু কোনো কোনো নাগরিক ভিন্ন কথা বলছেন। তাদের মতে, চুল কাটার সঙ্গে অপরাধের কোনো সংযোগ নেই। এভাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। চুলের ছাঁট দেখে একজন অপরাধী কি না, তা কীভাবে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব, তা মাথায় আসে না। তাছাড়া এটা নাগরিকের একদম ব্যক্তিগত ব্যাপার। আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে, যেগুলোতে পুলিশের নজর নেই। এতে অনেক নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হতে পারে। আবার অনেকে পুলিশের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখেছেন। উঠতি বয়সি অনেক ছেলেকে পরিবার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাদের কাছে মা-বাবা অসহায়। পুলিশের এই পদক্ষেপ তাদের কাছে একটি বার্তা দিচ্ছে যে প্রশাসনের নজর তাদের ওপর আছে। এতে তাদের অপরাধপ্রবণতা কিছুটা হলেও কমবে বলে বিশ্বাস। একজন তো দেখলাম এই পুলিশ-নির্ধারিত ‘বখাটে কাটের’ বিরুদ্ধে একটি দৈনিক পত্রিকায় রীতিমতো ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তার মতে, চুলের কোন ধরনের ‘কাট’কে ‘বখাটে কাট’ বলা হয়ে থাকে? এই ‘কাটটি’ যে ‘বখাটে কাট’ সেটি রাষ্ট্রের কোন বিধিতে কোন কর্তৃপক্ষ নির্ধারণ করেছে? কোনো আইনে, কোনো কর্তৃপক্ষীয় সিদ্ধান্তেÑ চুলের কোনো বিশেষ কাটকে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করা হলে পুলিশ সেই ‘কাট’-এর বিরুদ্ধে অভিযান চালায় কীভাবে? চুলের ‘বখাটে কাট’-এর ব্যাপারটাকে প্রথমে আমার কাছে হাস্যরস মনে হয়েছিল। পত্রিকায় খবর পড়ে এখন দেখছি সেটি মোটেও হাস্যরস নয়। পুলিশ খুবই সিরিয়াস। মাগুরার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি এতটাই ভালো যে পুলিশ কোনো কাজ না পেয়ে তরুণদের চুলের কাটের পেছনে দৌড়ঝাঁপ করছে! ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশের যে-কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলেমেয়েরা বিশ্বের হালনাগাদ ফ্যাশনের খবর পেয়ে যায়। সেগুলো তারা অনুসরণ করতে চাইতেই পারে। আর চুলের কাট দিয়ে, পোশাকের স্টাইল দিয়ে কি বিশেষ কিছু ইঙ্গিত করার সুযোগ আছে? আমার তো মনে হয় না। চুলের তথাকথিত ‘বখাটে কাট’ নিয়ে পুলিশের ভূমিকার ব্যাপারে আমার প্রবল আপত্তি আছে। আজ পুলিশ চুল কাটা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছে, কাল পোশাক নিয়ে করবে, পরশু হাঁটার ভঙ্গি নিয়ে করবে। আমাদের তরুণরা কি পুলিশি খবরদারির মধ্যে তাদের দৈনন্দিন জীবন-যাপন করবে? পুলিশের উচিত তথাকথিত ‘চুলের বখাটে কাট নিয়ে’ ‘পুলিশি বখাটেপনা’ থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখা। আসলে চুল নিয়ে অনেকেরই অনেক রকম ‘স্পর্শকাতরতা’ আছে। এর কারণও আছে। চুল যে মানুষের শরীরের কত প্রয়োজনীয় একটি অংশ তা কেবল যার মাথায় চুল নেই, সে-ই জানে। কচ, কুন্তল, কেশÑ চুলেরই ভিন্ন ভিন্ন নাম। এই চুল নিয়ে কত কবিতা-গান-সাহিত্য হয়েছে। ঘন কালো চুল সবার নজর কাড়ে। কবি জীবনানন্দ দাশের ভাষায় ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’। নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা গানের ভাষায়Ñ ‘একটা ছিল সোনার কন্যা/ মেঘবরণ কেশ/ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ’, ‘খায়রুন লো তোর লাম্বা মাথার কেশ চিরল দাঁতে হাসি দিয়া পাগল করলি দেশ’ মমতাজের এই গান তো একসময় বাংলাদেশের মানুষের মুখে মুখে ফিরত। চুল নিয়ে কার যেন এক অবিস্মরণীয় রচনা পড়েছিলাম। লেখকের নাম মনে নেই, কিন্তু রচনাটি মনে আছে : ‘কেশের সহিত আমাদিগের দৈহিক ও মানসিক, এক বাক্যে আত্মিক সম্পর্ক অতি প্রাচীন। অদ্য হইতে বহু বত্সর পূর্বে, যে সময়ে আমাদিগের পরম শ্রদ্ধেয় আদি পিতামহ/মহীগণ প্রকৃতির বুকে সদর্পে বিরাজমান ছিলেন, তৎকালে তাঁহাদের কলেবর-স্থিত কেশের প্রতুলতা বহুলাংশে তাঁহাদের কীটপতঙ্গ, আবহাওয়ার খামখেয়ালীপনা হইতে রক্ষণ করিত এবং তাঁহাদের ‘বন্য-মানব’ পরিচয়ের যথার্থতা বহন করিত। অতঃপর ‘বিবর্তন’ নাম্নী মহা ক্ষৌরকার আসিয়া আমাদিগের কলেবরে হস্তশিল্পের অদ্ভুত নমুনা প্রদর্শন করিলে, আমাদিগের কলেবরে কেশ দুর্লভ হইয়া আসিল। এই দুর্লভতার কারণেই হয়তো মানবসমাজে বর্তমানে ইহার কদর এত অধিক। মানবদেহ হইতে কেশ ব্যবচ্ছেদের মুহূর্তে প্রকৃতি দেবী ও বন্য মানব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধির কোনো কথোপকথন হইয়াছিল কি না, সে বিষয়ে কোনো প্রামাণ্য নথি উপলব্ধ নয়। উপরন্তু এই বিষয়ে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ পাইবার আশাও বর্তমানে রহিয়াছে বলিয়া মনে হইতেছে না। তবে যদি কদাচিত্ এরূপ কথোপকথন সম্পন্ন হইয়া থাকে, তবে তাহা নিশ্চিত রূপে এমনতর হইবে বলিয়া মনে হয়Ñ প্রকৃতি : ওহে ধরিত্রীবাসী বর্বর সম্প্রদায়, তোমরা প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ বুদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছ। কিন্তু প্রকৃতি ধারে কিছু প্রদান করেন না। অতএব ‘বিনিময় প্রথা’ অনুযায়ী তোমাদিগের কলেবরস্থিত কেশ বহুলাংশে বিলুপ্ত হইবে। বন্যমানব প্রতিনিধি :যদি আপনার এ নির্ণয় অটল হইয়া থাকে, তবে মানব সমাজ যেন এই কেশের অসীম গুরুত্ব ইহাকে ‘শিরোমণি’ হিসাবে বহন করিয়া, যুগ-যুগান্তর ধরিয়া উপলব্ধি করিতে পারে। অতঃপর প্রকৃতির আশীর্বাদের ফল বর্তমানে প্রতিটি মানবের মস্তকে অতিমাত্রায় প্রকট ও বাস্তব। অতঃপর নানা কারণে বাঙালি জাতির মাঝে শেষ রজনীতে দুঃস্বপ্ন দেখিবার প্রবণতা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। পূর্বে কেবল কন্যা দায়ভারগ্রস্ত পিতারাই মস্তকের কেশ ছিন্নবিচ্ছিন্ন করিবার অধিকার প্রাপ্ত হইতেন। বর্তমানে পিতারূপে প্রতিপন্ন হইবার বহু পূর্বেই, যুবাবস্থাতেই সেই অধিকার প্রাপ্ত হইতেছেন। প্রকৃতি দেবী কোন অপরাধের শোধ লইতেছেন, সেই চিন্তায় নিমগ্ন রহিয়া অবশিষ্ট কেশগুচ্ছকেও ঝরানো বাঙালির ধ্যান-জ্ঞান হইয়া উঠিয়াছে। অবশ্য বাঙালি মাত্রেই যেহেতু, ‘গোঁফের আমি, গোঁফের তুমি, গোঁফ দিয়ে যায় চেনা’ আদর্শে দীক্ষিত এবং গোঁফ ও কেশ যখন প্রায় সমার্থক, এমত পরিস্থিতিতে এরূপ গুরুতর সমস্যায় চিন্তামগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। ‘কেশ লইয়া মানবসমাজের এই দুশ্চিন্তা অমূলক নহে, কেশ কেবলমাত্র সৌন্দর্য নহে, পরাভবের ও প্রতীক। প্রাচীনকাল হইতে বর্তমান পর্যন্ত রচিত বিবিধ পুস্তকে কেশের মাহাত্ম্য বিদ্যমান। স্মরণ করিয়ে দেখ, মহাদেব তাহার কেশের জটাজালেই দেবী গঙ্গাকে ধারণ করিয়াছিলেন। বিদেশি উপকথায়ও কেশের মাহাত্ম্য বর্ণিত রহিয়াছে। রাজতনয়া রাপুঞ্জেল তাঁহার কেশের সহায়তায় যে অসাধ্য সাধন করিয়াছিলেন, তাহা সর্বজনবিদিত। বাস্তবের প্রেক্ষাপটেও পরিলক্ষিত হয়, বিশ্ববরেণ্য বিজ্ঞানবিদ আইনস্টাইন, কবিশ্রেষ্ঠ রবীন্দ্রনাথ, তাঁহাদের কেশসজ্জা তাহাদেরই ন্যায় দুর্লভ।’ ‘বলাবাহুল্য, বর্তমান মানবসমাজ তাহাদের কেশের (অবশিষ্ট) গুরুত্ব বুঝিয়াছে। এই বোধগম্যতার সূত্র ধরিয়াই বিভিন্ন কেশতৈল ও অন্যান্য কেশসংক্রান্ত প্রসাধন দ্রব্যের উদ্ভব ঘটাইয়া মানবসমাজ তাহাদের দুর্মূল্য সময় ও অমূল্য মস্তিষ্কের ক্ষয়সাধন করিয়া চলিতেছে। তবে বিশেষ আশার কোনো কারণ অবশিষ্ট নাই। পৃথিবী টিকিয়া থাকিলে, বিবর্তনের ধারায় আমাদিগের অবশিষ্ট কেশগুচ্ছও যে কেবলই জাদুঘরের শোভাবর্ধন করিবে, তাহার পূর্বাভাস আমরা প্রাণী তত্ত্ববিদদের নিকট হইতে প্রাপ্ত হইয়াছি।’ ছোটোবেলায় আমরা গ্রামে দেখেছি, মাঝে মাঝে ফেরিওয়ালার আগমন ঘটত। ছেঁড়া স্যান্ডেল, জুতা, বোতল ভাঙা, চিমনি ভাঙা, লোহা লক্কর দিয়ে ‘কটকটি’ নামক আজব এক জিনিস খেতাম। এখন সময় বদলেছে। কেশের বিনিময়ে এখন ফেরিওয়ালারা অনেক জায়গায় চুল সংগ্রহ করেন। কোনো রকম জিলেপি কিংবা কটকটির বিনিময়ে নয়, নগদ টাকার বিনিময়ে তা কিনে নেন। তবে বখাটে ছাঁট, এই ছাঁট, ঐ ছাঁট বন্ধ না করে সবার জন্য চুল রাখা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে এবং প্রতি দুই বছর পরপর সেই চুল বিক্রি করার একটা বিধানও চালু করা যেতে পারে। এতে ‘বখাটে ছাঁট’ যেমন বন্ধ হবে, চুল বিক্রি করে কিছু আয়-রোজগারেরও একটা ব্যবস্থাও হতে পারে। জাতীয় প্রবৃদ্ধিতেও তা অবদান রাখতে পারে। বিষয়টি সংশি¬ষ্টরা ভেবে দেখতে পারেন। লেখক ঃ রম্যরচয়িতা

 

 

আরো খবর...