কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। সর্বশেষ, পরিসংখ্যান অনুযায়ী জিডিপিতে কৃষির সামগ্রিক অবদান ১৮.৬৪ শতাংশ। দেশের মোট শ্রমশক্তির ৬৪% কৃষিতে নিয়োজিত। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে বিশ্বের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখ করে এফএওর জলবায়ু পরিবর্তন ও কৃষির অভিযোজনবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দিনগুলোয় বিশ্বের যে দেশগুলোতে খাদ্য উৎপাদন বাড়তে পারে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। কৃষি বিজ্ঞানীদের নব নব আবিষ্কারের ফলেই এ সাফল্য এসেছে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেরেস পদক পেয়েছেন। কৃষিতে বাংলাদেশের আশাব্যঞ্জক খবরগুলো হচ্ছে- বাংলাদেশ বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশ। বিশ্বে ছাগল উৎপাদনে ৪র্থ, বিশ্বের ২য় বৃহত্তম ছাগলের দুধ উৎপাদনকারী এবং ছাগলের মাংস উৎপাদনকারী ৫ম বৃহত্তম দেশটির নাম বাংলাদেশ। আম উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম এবং পেয়ারা উৎপাদনে অষ্টম স্থানে বাংলাদেশ। বিশ্বের ৪র্থ বৃহত্তম মাছ উৎপাদনকারী, বিশ্বের বৃহত্তম ইলিশ উৎপাদনকারী, বিশ্বের ২য় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ পাট রপ্তানিকারক, বিশ্বের ২য় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী এবং বিশ্বে সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ। কৃষি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই খবরগুলো যে কাউকে দেশ সম্পর্কে আশাবাদী করবে। বঙ্গবন্ধুর সেই কথাটি অনুরণীয় হতে পারে- ‘…শিক্ষিত সমাজকে আর একটা কথা বলব। আপনাদের চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। একজন কৃষক যখন আসে খালি গায়ে, লুঙ্গি পরে, আমরা বলব, ‘এই বেটা, কোত্থেকে আইছিস, বাইরে বয়, বাইরে বয়।’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে তাদের সঙ্গে কথা বলেন। তাদের তুচ্ছ করেন। এর পরিবর্তন করতে হবে। আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ওই গরিব কৃষক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক। ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে।’
বাংলার কৃষকদের লাল সালাম
কৃষি ক্ষেত্রে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে প্রকৃতি ও জনসংখ্যার সঙ্গে সমন্বয় করে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার আগে যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন চাহিদায় হিমশিম খেতে হতো, কালের পরিক্রমায় স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক পর ষোল থেকে আঠারো কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মিটানোর সংগ্রামে নিয়োজিত বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী এবং কৃষকরা। কৃষিকে বহুমুখীকরণে বাংলাদেশ এখন অনেক অগ্রগামী। কৃষি সেক্টরে ধান, পাটের পাশাপাশি মৎস্য ও পশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন, নার্সারি, বনায়ন এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটছে। তাই কৃষি আমাদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস। কৃষি মানে এখন আর শুধু ধান, পাট আর কিছু শস্য উৎপাদনে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিতে সারাবছর ফলানো হয় সবজি, ফল, মাছ চাষ, গবাদি পশুপালন এমনকি কৃষিভিত্তিক শিল্পস্থাপন হচ্ছে। তাই কৃষকের ন্যায্য প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। দিতে হবে সম্মান, ফসলের নায্যমূল্য, সার, সেচ, বীজ, ফসল সংরক্ষণ, ঋণ সুবিধা, সুদ মওকুফ সুবিধা, স্বাস্থ্য, কৃষি সেবা, প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রাম বাংলার কৃষক।
সাফল্যের নেপথ্যে কৃষি বিজ্ঞানীরা
বিজ্ঞানীদের নিরলস শ্রম, আবিষ্কৃত ফসল আবাদে মাঠ সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের চেষ্টা, কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, সুষম সার ব্যবস্থাপনা সর্বোপরি কৃষিক্ষেত্রের সাফল্যের নেপথ্যে কাজ করেছেন কৃষি বিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এ পর্যন্ত ২০০টিরও বেশি ফসলের ৪৭১টি উচ্চফলনশীল, রোগ প্রতিরোধক্ষম ও বিভিন্ন প্রতিকূল পরিবেশ প্রতিরোধী জাত এবং ৪৫২টি অন্যান্য প্রযুক্তিসহ এ পর্যন্ত ৯০০টিরও বেশি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। ফলে গম, তেলবীজ, ডালশস্য, আলু, সবজি, মসলা এবং ফলের উৎপাদন ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমে উদ্ভাবিত ৮২টি নতুন জাতের ধান অঞ্চলভিত্তিক চাষাবাদে অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া গেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রতিকূলতা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের কৃষি বিজ্ঞানীরা আটটি লবণসহিষ্ণু, দুটি জলমগ্নতাসহিষ্ণু, চারটি খরাসহিষ্ণু এবং দুটি শীতসহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। বিশ্বে প্রথমবারের মতো ব্রি উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল এবং স্বল্পমেয়াদি জিঙ্কসমৃদ্ধ আমন ধানের নতুন জাত ব্রি ধান৬২ অবমুক্ত করেছে। বাংলামতি সুগন্ধি ধান ইতোমধ্যেই দেশজুড়ে কৃষকের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। মঙ্গা এলাকায় ব্রি-৩৩ ও ৩৯ জাতের ধান আবাদ করে মানুষের খাদ্যসংকট এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। ব্রি-৪২ ও ৪৩ খরাসহিষ্ণু উফশী জাতের বোনা আউশ ধান বিশেষত খরা ও বৃষ্টিবহুল এলাকায় যেমনথ ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা এলাকায় ধান ছিটিয়ে এবং ডাবলিং পদ্ধতিতে বপন করে ভালো ফলন পাওয়া গেছে। ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে ময়মনসিংহে অবস্থিত বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট বিনায় গবেষণার মাধ্যমে দেশে কৃষিতে যুক্ত হলো আমনের নতুন জাত গ্রিন সুপার রাইস বা বিনা ধান১৭ জিএসআর। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) বেশ কয়েকটি জাত ছাড়াও এরই মধ্যে পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন কৃষিতে নতুন বিস্ময়।
কৃষিজ উৎপাদনে বিপ্লব
কৃষির অন্যতম সাফল্য হলো- দেশে ধান উৎপাদনে এসেছে বিপ্লব। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চারগুণ। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিলে বিদেশে শুঁটকি মাছ রপ্তানি করে বছরে ১০০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। আমাদের দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রজাতির শুঁটকি মধ্যপ্রাচ্য, পাকিস্তান, বৃটেন, আমেরিকা, চীন, হংকং, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বাংলাদেশ ডিহাইড্রেশন সিফুডস রপ্তানিকারক সমিতি সূত্রে, বর্তমানে প্রতিবছর ১০০ কোটি টাকার শুঁটকি মাছ বিদেশে রপ্তানি হয়। মৎস্য উৎপাদন বাড়ায় অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মৎস্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশ্বে চতুর্থ এবং অভ্যন্তরীণ বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে পঞ্চম স্থান লাভ করেছে বাংলাদেশ। বিবিএসের সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী দেশে গড়ে মাছের বার্ষিক উৎপাদন সাড়ে ৩৫ লাখ টন, বাজারমূল্য প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রতিবছর পাঁচ হাজার কোটি টাকার চিংড়ি উৎপাদন করা সম্ভব। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট মৎস্যসম্পদের উৎপাদন ও প্রজনন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গবেষণায় ১৬ শতাংশ অধিক উৎপাদনশীল রুইজাতীয় মাছের নতুন জাত এবং দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে চাষ ব্যবস্থাপনা ও প্রজনন বিষয়ক ৪৯টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। সরকার মাছ রপ্তানি করে বছরে প্রায় চার হাজার কোটি টাকা আয় করছে। উদ্যোক্তাদের অভিমত, কাঁচা ফুল রপ্তানি করে ৫০০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। বাংলার আপেল নামে পরিচিত স্বরূপকাঠির পেয়ারা দ্বারা উন্নতমানের জেলি তৈরির কাঁচামাল হিসেবে বিশ্বের কয়েকটি দেশ পর্তুগাল, মেক্সিকো, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, ভারত, মালয়েশিয়া ও পাকিস্তানে রপ্তানি হচ্ছে। জুম চাষ প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং লাভ কম হওয়ায় পাহাড়িরা কৃষি গবেষণা কেন্দ্র উদ্ভাবন করেছে মিশ্র ফল চাষাবাদ পদ্ধতি। পাহাড়ে উৎপাদিত প্রচলিত ফল আনারস, কাঁঠাল, কলা, পেঁপের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কমলা ও মাল্টা। কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান মতে, দেশে প্রায় ২৬ হাজার হেক্টর কাঁঠাল আবাদ হয়, তাতে উৎপাদন ২ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন এবং হেক্টরপ্রতি ফলন ১০ মেট্রিক টন’। গত কয়েক বছরে দেশের অভ্যন্তরে গরু, মহিষ, ছাগল পালন ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কোরবানিসহ সারা দেশে এখন গরুর মাংসের চাহিদা পূরণে দেশীয় গরু পালনে স্বনির্ভরতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে বাংলাদেশ। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের কৃত্রিম প্রজনন পদ্ধতিতে কুঁচিয়া মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে চীন, থাইল্যান্ড এবং দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিশ্বের ১৫টি দেশে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান বলছে, আলু উৎপাদনে বিশ্বে সপ্তম বাংলাদেশ। বাংলাদেশে বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন এবং কৃষকদের প্রচেষ্টায় আলু চাষের সফলতা এসেছে। গত এক যুগে আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীরা ৬১টি আলুর জাত উদ্ভাবন করেছেন। পোল্ট্রি শিল্পটি বড় হচ্ছে নীরবে নিভৃতেই। দেশে বর্তমানে মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১ হাজার ৭০০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় দুই থেকে সোয়া দুই কোটি। একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার সাপ্তাহিক উৎপাদন প্রায় এক কোটি। ডিম ও মুরগির মাংস রপ্তানি করে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্টরা। দেশের একমাত্র কুমির খামার থেকে কুমির রপ্তানি করে বছরে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। চার দশকে দেশে সবজির উৎপাদন বেড়েছে কয়েকগুণ। বর্তমানে দেশে বার্ষিক মোট সবজি উৎপাদন হয় ২২ লাখ টন। দেশে বর্তমানে প্রায় আট লাখ হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ২০ লাখ টনের অধিক সবজি উৎপাদন হচ্ছে। এখন দেশের প্রায় সব এলাকায় সারা বছরই ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শাক-সবজি রপ্তানি করে ৬০০ কোটি টাকার বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে বাংলাদেশ। দেশে প্রায় ৬০০ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ থাকলেও ওষুধশিল্পে বর্তমানে ১০০ ধরনের ওষুধ উদ্ভিদ থেকে দেড় শতাধিক ওষুধ উৎপাদন হয়। কৃষিজ উৎপাদনে সফলতার এমন হাজারো তথ্য উপাত্ত বাংলাদেশের সমৃদ্ধিতে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করছে।
লেখক : এস এম মুকুল, কৃষি ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।

আরো খবর...