কৃষিতে আশার আলো দেখাবে জীবাণুসার

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিতে আশার আলো দেখাবে জীবাণুসার। ডাল জাতীয় শস্যের জমিতে এ সার ব্যবহার করলে ইউরিয়ার দরকার হবে না। পাশাপাশি ধানের জমিতে জীবাণুসার ব্যবহার করলে ইউরিয়ার সাশ্রয় হবে শতকরা ২৫ ভাগ। প্রায় ৫০ কেজি ইউরিয়া সারের কাজ করে দেয় মাত্র এক কেজি জীবাণুসার, যার উৎপাদন খরচ মাত্র ৭৫ টাকা। বায়োফার্টিলাইজার বা জীবাণুসার বলতে বোঝায় একগুচ্ছ জীবন্ত সার। বায়ো অর্থ ক্ষুদ্র জীব এবং ফার্টিলাইজার অর্থ হলো সার। শাব্দিক অর্থ হলো জীবাণুসার। জীবাণুু যখন মাটির পুষ্টি উপাদান ঘাটতি মেটানোর জন্য সার হিসেবে ব্যবহৃত হয় তাকে জীবাণুুসার বলে।

বাংলাদেশের ধান ও ডালজাতীয় শস্যের জমিতে জীবাণুসার প্রয়োগ নিয়মিত করলে দেশের ইউরিয়া সারের আমদানিতে সাশ্রয় হবে কোটি কোটি টাকা। এমনই আশাবাদ পোষণ করেন দেশের কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তাদের গবেষণায় স্বপ্ন দেখছেন কৃষকরা। সম্প্রতি জীবাণুসার তৈরি করতে সক্ষম মসুর ডালের শিকড়ে গুটি বা নডিউল সৃষ্টিকারী নতুন তিনটি ব্যাকটেরিয়ার শনাক্তকরণ ও নামকরণ করে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউটের (বিনা) বিজ্ঞানী ড. হারুন-অর-রশীদ। প্রায় ছয় বছর গবেষণার পর আবিষ্কৃত তিনটি ব্যাকটেরিয়ার দ্বারা তৈরি হবে জীবাণুসার। ফলে সাশ্রয় হবে ইউরিয়া।

বৈজ্ঞানিক নামকরণের স্বীকৃতি প্রদানকারী আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘ইন্টারন্যশনাল জার্নাল অব সিস্টেমিক অ্যান্ড ইভলিউশনারি মাইক্রোবায়োলজিতে এ তিনটি ব্যাকটেরিয়ার নাম প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার বিষয়ে ড. হারুন-অর-রশীদ বলেন, ২০০৯ সালে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ৩০টি ব্যাকটেরিয়া সংগ্রহের পর সেগুলোর মধ্য থেকে সাতটির জিন সিক্যুয়েন্স করে বায়ো-ইনফরমেটিক অ্যানালাইসিস, ডিএনএ ফিঙ্গার প্রিন্টসহ আরো অন্যান্য বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার পর দেখা যায়, বাংলাদেশে যে প্রজাতির ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় তা অন্যান্য থেকে আলাদা। তিনি বলেন, ওই ব্যাকটেরিয়াগুলো দ্বারা উৎকৃষ্ট মানের জীবাণুসার  তৈরি সম্ভব হবে, যা মসুর ছাড়াও খেসারি এবং মটরশুঁটি ফসলে ব্যবহার করা যাবে। ফলে আগামীতে ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমে আসবে এবং ওই ফসলগুলোর ফলন বাড়ানো যাবে বলে মনে করেন ড. হারুন।

তাছাড়া এসব ব্যাকটেরিয়াগুলো থেকে ভালো জীবাণুসার তৈরি করে ইউরিয়া সারের প্রয়োগ কমাবে এবং উৎপাদন খরচ কমবে। ফলে আগামীতে ডাল ফসলগুলোর ফলন ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে বলেও জানান তিনি।

কার্যভেদে জীবাণুসার প্রধানত তিন প্রকার ক) নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী, খ) ফসফরাস দ্রবীভূতকারী ও গ) কম্পোস্ট তৈরিকারী।

নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী জীবাণুসার : উদ্ভিদের অত্যাবশ্যকীয় উপাদানগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেন অন্যতম। পরিমাণমতো নাইট্রোজেন সরবরাহ থাকলে গাছ সবুজ ও রসালো হয়। তার অভাবে গাছ বেটে হলদে ও কম শিকড়বাহী হয় এবং বাহ্যিকভাবে অপুষ্টির লক্ষণ প্রকাশ পায়। মাটিতে এ ঘাটতি  মোকাবেলায় ইউরিয়া সার ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে ফসল উৎপাদন বাড়ানোর জন্য ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে জীবাণুসার ব্যবহার করা হয়। এ সারে যেসব জীবাণু ব্যবহার করা হয় তা হলো রাইজোরিয়াম, অ্যাজোলা, অ্যাজোটোব্যাফটার, নীল, সবুজ, শেওলা, অ্যাজোপোইরিলাম ইত্যাদি।

ফসফরাস দ্রবীভূতকারী জীবাণু সার মাটিতে গ্রহণযোগ্য আকারে ফসফরাসের প্রাণ্যতা বৃদ্ধি করে গাছের পুষ্টি ঘাটতি পূরণ করে সেগুলো ফসফরাস গঠিত জীবাণু সার। এগুলো হলো ব্যাসিলাস, সিওভোসোনাস, পেনিসিলিয়াম, অ্যাসকারবজিলাস, গ্লোমাস ইত্যাদি।

কম্পোস্ট কালচার : শস্যর অবশেষ যেমন খড়, নাড়া, শিকড়, পাতা, তুষ, চিনিকল আবর্জনা (জাবড়া), পাতা, আগাছা কচুরিপানা, গোবর ইত্যাদি সাধারণভাবে পচতে বেশি সময় লাগে। কিন্তু বেশ কিছু জীবাণু আছে যারা মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পচিয়ে ফেলতে পারে। এভাবে পচানো কম্পোস্ট সার সাধারণ কম্পোস্টের চেয়ে মানেও হয় অনেক উন্নত। এই জৈব সারে নাইট্রোজেনের পরিমাণও বেশি থাকে। যেসব জীবাণু এখানে ব্যবহার করা হয় তা হলো অ্যাসপারজিলাস, অলটারনারিয়া, সেনুলোমোনাস, সাইটোফ্যাগা, ট্রাইকোভারনা, স্টেপটোমাইসিস।

জীবাণুসারের উপকারিতা : শস্যর ফলন বৃদ্ধিতে রাইজোরিয়াল জীবাণুসার ভালো যা শিমজাতীয় শস্যর ফলন বৃদ্ধি করে। এই সার ব্যবহারের ফলে মসুর ১৫-৪০% ছোলা ২০-৪৫% মুগ ১৮-৩৫% বরবটি ২৫-৪৫% খেসারি ২০-৫০%, মাষকালাই ২০-৩৫%, মটর ৩০-৪৫%, অড়হড় ২০-৫০%, ধইঞ্চা ৪০-৮০%, চীনাবাদাম ২০-৪০%, এবং সয়াবিন ৭৫-২০০% ফলন বৃদ্ধি পায়। এটি ব্যবহারে শস্যের আমিষের পরিমাণ শতকরা ২০ থেকে ১৫০ ভালো বৃদ্ধি পায়। মাটিতে কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত বৃদ্ধির মাধ্যমে মাটির রাসায়নিক গুণাবলি উন্নত করে। ফসলে রোগ বিস্তারের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। জীবাণুসার ব্যবহারে মাটি, ফসল, জলাশয়, পশুসম্পদ, মানবজীবন বা পরিবেশের ওপর কোনো প্রকার বিপদ প্রতিক্রিয়া ফেলে না। ইউরিয়ার তুলনায় জীবাণুসারের উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় ও পরিমাণ কম লাগায় শস্য উৎপাদন খরচ কম পড়ে।

ব্যবহারের নিয়ম : সুস্থ সতেজ শুকনা বীজ পরিমাণমতো চিঁটাগুড়ে মিশিয়ে নিতে হবে যাতে বীজগুলো আঠাল মনে হয়। চিটাগুড় না থাকলে ঠান্ডা ভাতের মাড় বা পানি ব্যবহার করা যায়। আঠাল বীজগুলোর সঙ্গে জীবাণুসার ঢেলে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে যাতে করে বীজে একটি কালো প্রলেপ পড়ে যায়। কালো প্রলেপযুক্ত বীজ ছায়ায় সামান্য শুকিয়ে নিতে হবে যাতে বীজগুলো গায়ে লেগে না থাকে। বেশি শুকালে জীবাণুসারের কার্যকারিতা কমে যায়। জীবাণুসার মিশ্রিত বীজ রোদ্রহীন বা খুবই অল্প রৌদ্রে বপন করে সঙ্গে সঙ্গে বপনকৃত বীজগুলো মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, ঠান্ডা, শুষ্ক,  রৌদ্রমুক্ত জায়গায় জীবাণুসার মিশ্রিত বীজ রাখতে হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যেই ব্যবহার করতে হবে।

যেসব ফসলে জীবাণুসার ব্যবহার করা হয় : জীবাণুসার ব্যবহারের ভিত্তিতে ফসলকে প্রধানত দুটি ভাগ করা হয়েছে।

সরাসরি প্রয়োগকৃত ফসল : লিগিওমিনিয়েসি পরিবারের ফসল সমৃদ্ধ এই  শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। যেসব ফসলের মূলে নডিউল তৈরি করে সেগুলো এই সার সরাসরি ব্যবহার করা যায়। ফসল সমৃদ্ধ হলো মসুর, ছোলা, মুগ, বরবটি,  খেসারি, মাসকালাই, মটর অড়হড়, ধইঞ্চা, চীনাবাদাম, সয়াবিন।

পরোক্ষভাবে প্রয়োগকৃত ফসল : ধান, পাট, সরিষা, গম, ভুট্টা, যব, ইক্ষু, আলু, তামাক, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ, টমেটো, মুলা প্রভৃতি এই  শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। আগের বছর লিগিউমজাতীয় ফসল উৎপাদন করার পর পরবর্তী বছর এসব ফসল উৎপাদন করলে ফসলের ফলন ২৪-৩০% বৃদ্ধি পায়।

জীবাণুসারের প্রাপ্তিস্থান : বাংলাদেশ কৃষি ও পরমাণু কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট, (বিনা) ময়মনসিংহ এবং প্রতি জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অফিস। আজকাল অনেক  বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বাণিজ্যিক ভিত্তিতে জীবাণুসার উৎপাদন করে থাকে।

 

 

আরো খবর...