কৃষকের জ্ঞানের স্বীকৃতি চাই

কৃষি প্রতিবেদক ॥ কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামবাংলার কৃষক। কৃষকরা স্বভাবগতভাবে প্রকৃতির উদ্ভাবক। তারা অসীম সৃজনীক্ষমতার অধিকারী। খাঁটি ও সাদা মনের মানুষ। কৃষকরাই প্রকৃত দেশপ্রেমিক। কবি যথার্থই বলেছেন- সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা। কি বন্যা, কি খরা, কত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধুয়ে-মুছে নিয়ে যায় কত স্বপ্নমিশ্রিত ঘাম ঝরানো সোনার ফসল। তবু দমে যাননি বাংলার কৃষক। কোনো বিপর্যয়ই তাদের দমাতে পারেনি। বন্যার পর দেখা যায় বন্যার জল সরতে না সরতেই নতুন ফসল বোনার জন্য আবারো মাঠে নামেন তারা। খরার সময় ক্ষেতে পানি দেন ঘাম ঝরানো পরিশ্রমে। ফসল রক্ষায় তারা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করেন মসজিদে, মন্দিরে। নিঃস্ব, শূন্য অবস্থান থেকেও বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বাংলার কৃষক। ফলিয়েছেন সোনার ফসল। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নেই। এক মণ ধান বেচে একটি ইলিশ খাওয়ার সাধ্য নেই। তবু তারা অভিযোগহীন। নিজেদের অভাব-অনটন, দুর্গতি ভুলে তারা নতুন করে কাজে নামেন। আবাদের জমি কমছে, দ্রুত বাড়ছে জনসংখ্যা; তারপরও খাদ্য সংকটে পড়েনি বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সবরকম দুর্যোগ, দুর্গতি মোকাবেলা করে বাংলার কৃষকরা কৃষি উৎপাদনে ফুলে, ফলে, ফসলে সর্বক্ষেত্রেই বিশ্ব সূচকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলাদেশকে। কৃষকদের কল্যাণে খাদ্য ও পুষ্টি ঘাটতির বাংলাদেশ আজ খাদ্যে কেবল স্বয়ংসম্পূর্ণই নয় উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সাফল্য দেখিয়েছে এবং এরই পাশাপাশি পুষ্টি ঘাটতি অনেকাংশে কমিয়ে সহনীয় মাত্রায় নিয়ে এসেছে। এই কৃষকরাই রক্ষা করছেন আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা। বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখছেন কৃষকরা। এ কারণে বলা যায় অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে কৃষকের জুড়ি নেই। তারপরও কৃষকের মূল্যায়ন হয় না।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)-এর কৃষি শুমারি-১৯-এর প্রাথমিক রিপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক কোটি ৬৫ লাখ ৬২ হাজার ৯৭৪ পরিবার। এ ক্ষেত্রে শহরে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৫৫ পরিবার এবং গ্রামে এক কোটি ৫৯ লাখ ৪৫ হাজার ১১৯ পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। আমাদের দেশে কৃষকের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না বলেই অনেক সম্ভাবনা মাঠে মারা যায়। কোনো সূত্র বা পরীক্ষার সুযোগ ছাড়াই যুগের তালে অনাদিকাল থেকে এই কৃষিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন বাংলা কৃষক। আমরা জানি ঝিনাইদহের সাধারণ কৃষক হরিপদ কাপালির অবিস্মরণীয় ধান আবিষ্কার দেশজুড়ে সুনাম কুড়িয়েছে। এজন্য হরিপদ কাপালি পেয়েছেন চ্যানেল আই কৃষিপদক। আরো বলা যেতে পারে, রাজশাহীর নাটোরের খোলাবাড়িয়ার ভেষজ কৃষক আফাজ পাগলার কথা। বাড়ির পাশে ঘৃতকুমারীর গাছ রোপণ করে বদলে দিয়েছেন তার গ্রামের নাম ‘ঔষধি গ্রাম’। এভাবে বাংলাদেশের কৃষকরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে আহরিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করছেন নতুন নতুন পদ্ধতি, এমনকি নতুন জাতের ফসল। তাদের উদ্ভাবিত পদ্ধতিগুলো কৃষি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে তাদের উদ্ভাবিত নতুন জাতের ফসলের জন্য তাদেরকে স্বীকৃতি দেওয়া বা সন্মানিত করা হচ্ছে না এটা খুবই দুঃখজনক। একথা সত্যি, কৃষি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে। তারা গবেষণাগারে দিবারাত্রি অকাতরে শ্রম দিয়ে নতুন নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবন করছেন এবং সেগুলো মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদে সফলতা দেখিয়েছেন। আমার আজকের প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য আমাদের সন্মানীয় কৃষিবিজ্ঞানীদের সঙ্গে স্বশিক্ষিত কৃষকদের অভিজ্ঞতার সেতুবন্ধ রচনার ক্ষেত্রে সদাশয় সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি গবেষণা কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। আমরা এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে কৃষকরা প্রকৃতির খেয়ালকে কাজে লাগিয়ে, তাদের আহরিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে যেসব ফসলে নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে তাদের স্বীকৃতি দেওয়া বা সন্মানিত করার দাবি জানাই।
লেখক : এস এম মুকুল, উন্নয়ন গবেষক ও বিশ্লেষক।

আরো খবর...