কৃষকের ঘরে পাট থাকলে দাম থাকে না

দাম নিয়ে চিন্তিত পাট চাষীরা, সরকারী ক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের দাবী

কাঞ্চন কুমার ॥ বাংলাদেশের অর্থকারী ফসলের মধ্যে পাট অন্যতম। পাটের পন্যে ব্যবহারে সরকারী উদ্যোগ এবং দেশের আবহাওয়া পাট চাষের জন্য উপযোগী এবং পরিবেশ বান্ধক হওয়ায় পাট চাষে কয়েক বছর কৃষকরা আগ্রহ দেখিয়েছে। জেলা পাট অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দাবী, জেলায় এবার পাটের উৎপাদন ভালো, পাটের চাহিদাও রয়েছে রয়েছে। বিগত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পাটের আবাদ বেশি হয়েছে। তবে দাম নিয়ে চিন্তিত জেলার পাট চাষীরা। সরকারী দাম প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা না পাওয়ায় আগামীতে পাট চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে চাষীরা বলে জানায় একাধিক পাট চাষীরা। এজন্য চাষীরা দায়ী করছেন পাটের ভরা মৌসুমে ন্যায্য দাম না পাওয়াকে। অর্থকারী ফসল হিসাবে পাটের গুরুত্ব রয়েছে চাষীদের কাছে। তবে চাষীর ঘরে পাট থাকা পর্যন্ত পাটের দাম বৃদ্ধি পায় না। কৃষকরা তাদের পাটের ন্যায্য মূল্য পায় না। এর পরিবর্তে মধ্যসত্ত্যভূগি ও পাটের অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ পাট চাষীদের। জেলা পাট অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে কুষ্টিয়ায় পাট চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করা হয় ৮৮ হাজার ৭শ ৩৫ একর। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হয়েছে ৪ লক্ষ ৭০ হাজার ৯শ ৫১ বেল। চলতি মৌসুমে পাট চাষ হয়েছে ৮৯ হাজার ৫শ ৩৫ একর জমিতে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮শ একর বেশি। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও অতিক্রম করবে বলে জানানো হয়। এদিকে ২০১৮ মৌসুমে ৬৮ হাজার ৮শ ১৩ একর জমিতে পাট চাষ করা হয়েছিলো। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিলো ৩ লক্ষ ২১ হাজার ৯শ বেল। উৎপাদন হয়েছিলো ৩ লক্ষ ৬১ হাজার ৯শ ৫৪ বেল। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০ হাজার ৫৪ বেল বেশি উৎপাদন হয়েছিলো। গত বছরের তুলনায় এবছর জেলায় পাট চাষ বেড়েছে ২০ হাজার ৭শ ২২ একর। এদিকে পাট চাষীদের দাবী গত বছরের তুলনায় এবছর পাটের চাষ কম হয়েছে। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমিক সংকট, শ্রমিকের মুল্য বৃদ্ধি এবং কৃষকরা ন্যায্য মুল্য না পাওয়ায় পাট চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন তারা। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার পাট চাষী আব্দুল খালেক জানান, আমি গত বছর ৩ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলাম। চাষের খরচ, লেবার খবর দিতেই আমার হিমসিম খেতে হয়েছিলো। পাট নিড়ানী, পাট কাটা, পাটের আঁশ ছাড়ানোর সময় লেবার পাওয়া যায় না। আর পাওয়া গেলেও দ্বিগুন মুজুরি দেওয়া লাগে। এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে নিড়ানী, কাটা, টানা, জাগ দেওয়া, আঁশ আলাদা করা, শুকাতে প্রায় ৩৩টি লেবার লাগে। পাটের জন্য জনপ্রতি ৩শ টাকা করে দেওয়া লাগে এতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এছাড়াও জমি এবং সার-বীজ তো আছেই। সব চেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা টাকার জন্যই পাট চাষ করি তবে আমাদের ঘরে যখন পাট থাকে তখন পাটের বাজার দর মনপ্রতি ৯০০-১২০০ টাকা হয়। যখন কৃষকের ঘরে পাট থাকে না তখন ১৮০০ থেকে ২২০০ পর্যন্ত হয়। এক বিঘা জমিতে ৭-৮ মন পাট হয়। তিনি আরো বলেন, আমরা তামাকের চাষ করি। তামাক পোড়ানোর ঘরের জন্য আমাদের পাট কাঠির প্রয়োজন হয়। এজন্য আমরা লস লাভের হিসাব না করে পাট চাষ করি। এবার আমি ২ বিঘা জমিতে পাটের চাষ করেছি। পাট ভালোই হয়েছে তবে আমরা তো সঠিক দাম পাবো না। দাম পাবে ব্যবসায়ীরা। কৃষাণী বিউটি খাতুন জানান, একই জমিতে বার বার পাট চাষ করলে পাট একটু কম হয়। কৃষকরা পাটের সঠিক দাম পায় তাহলে পাট চিকন হলেও লাভ হয়। যে লেবার খরচ তাতে এবার লস হতে পারে। পাট চাষী শরিফুল ইসলাম জানান, জাগ দেওয়ার পরে পাটের আঁশ আলাদা করার ক্ষেত্রে একজন লেবার দিনে ১৫ আটি পাট ধুয়ে থাকে। সে মুজুরি নেয় ৫০০ টাকা। পাট কাটা, টানা, আঁশ ছাড়ানোর হিসাব করলে এক আটি পাটে প্রায় ৫০ টাকা খরচ হয়ে যায়। আরেকজন চাষী লালন আলী জানান, গত বছর আমি ১২ কাঠা জমিতে পাটের চাষ করেছিলাম। সেই পাট মাত্র ২ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলাম। অতিরিক্ত লস হওয়ায় এবছর পাটের চাষ করিনি। চাষী আলফাত হোসেন জানান, পাট জাগ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত পুকুর, খাল-বিল-জলাশয় নেই। আর পাটের সঠিক দাম তো কৃষক পায়না, পায় ব্যবসায়ীরা। তো তারাই পাট চাষ করুক। মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রমেশ চন্দ্র ঘোষ জানান, অধিকাংশ কৃষক গরীব হওয়ায় তারা পাট শুকিয়ে তাড়াহুড়ো করে বিক্রি করে দেয় এতে তারা পাটের সঠিক দাম পায়না। সরকারী ভাবে পর্যাপ্ত পাট ক্রয় কেন্দ্র না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃষকদের দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তিনি আরো বলেন, এ অঞ্চলের মাটি পাট চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ অঞ্চলে তোষা পাটে চাষ বেশি হয়ে থাকে। এবছর পাটের মারাত্বক তেমন কোন পোকামাকড় দেখা দেয়নি। আশা করছি পাটের উৎপাদন ভালো হবে। জেলা পাট অধিদপ্তরের মুখ্য পাট পরিদর্শক সোহরাব উদ্দিন বিশ্বাস জানান, বর্তমানে পাটের বাজার দর ১৯২০ টাকা থেকে ২২০০ টাকা পর্যন্ত। আমরা কৃষকদের পাট চাষে উদ্বুদ্ধ করতে জেলার প্রায় ৩ হাজার পাট চাষীদের পাট চাষে প্রশিক্ষন দিয়েছি। সেই সাথে ১৮০০ কৃষককে বিনামূল্যে সার ও বীজ প্রদান করেছি। তিনি আরো জানান, পাটের চাহিদা বৃদ্ধিতে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করি। “পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামুলক আইন ২০১০” নিশ্চিতে আমরা কুষ্টিয়া জেলায় ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে এ পর্যন্ত ২০৯ টি ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করেছি। এসময় আমরা ৭ লক্ষ ৬১ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছি। এবং আমাদের এ অভিযান অব্যহত রয়েছে। তিনি আরো জানান, জেলার খোকসা উপজেলায় একটি মাত্র বিজিএমসি’র পাটক্রয় কেন্দ্র রয়েছে। পরিবহন এবং আর্থিক সংকটের কারনে প্রান্তিক কৃষকরা সেখানে তাদের পাট না নিয়ে গিয়ে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে। এতে প্রান্তিক কৃষকরা ন্যায্য মুল্য না পেয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। প্রতিটি উপজেলায় কমপক্ষে একটি করে সরকারী পাটক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হলে প্রান্তক কৃষকরা তাদের পাটের ন্যায্য মুল্য পেতে পারেন বলেন মনে করেন এই কর্মকর্তা।

আরো খবর...