কুষ্টিয়া পৌরসভায় দুদুকের হঠাৎ অভিযান

ড্রেণ নির্মাণে অনিয়ম ও ধীরগতি

নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া পৌরসভায় আকস্মিক অভিযান চালিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গতকাল রোববার এ অভিযান পরিচালিত হয়। দুদকের কুষ্টিয়া কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ জাকারিয়া হোসেন ছয় সদস্যের একটি দলের এঅভিযানের নেতৃত্ব দেন। দুদক জানিয়েছে, কুষ্টিয়া পৌরসভা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ চলছে। তারমধ্যে অন্যতম হল- শহরের প্রধান সড়ক এনএস রোডের উভয় পাশে ড্রেণ নির্মাণ করা হচ্ছে। এই সড়কসহ আরও কয়েকটি সড়ক সংষ্কার করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব কাজ হচ্ছে। সঠিক সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় জনগণের ব্যাপক ভোগান্তি হচ্ছে।

নালা ও সড়ক নির্মাণে বিভিন্ন সময়ে সংবাদপত্রে সংবাদ ও জনগণের অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভোগান্তির বিষয় বিবেচনায় এ অভিযান চালানো হয়। নকশা ও কাজের মান দেখতে পৌরসভায় যাওয়া হয়। বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিটে দুর্নীতি দমন কমিশন কুষ্টিয়ার উপ-পরিচালক মো: জাকারিয়ার নেতৃত্বে ৫ সদস্যের দল পৌরসভায় প্রবেশ করেন। তারা গাড়ি থেকে নেমেই সরাসরি পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলামের কক্ষে যান। তার কাছে চলমান নালা ও সড়ক নির্মাণের যাবতীয় তথ্য চান। কাজের নকশার ফটোকপি নেন। প্রায় ২০ মিনিট তারা প্রকৌশলীর সাথে নালা ও সড়ক নির্মাণ নিয়ে বিভিন্ন কথা বলেন।

দুদকের কর্মকর্তারা প্রকৌশলীকে জানায়, নালা ও সড়ক নির্মাণ দীর্ঘদিন হচ্ছে। এতে কুষ্টিয়াবাসী অতিষ্ঠ। এটা মেনে নেওয়া যায় না। ঠিকাদার কাজ করতে না পারলে করবে না। যাদের সক্ষমতা আছে তারা করবে। এক পর্যায়ে প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম দুদক কর্মকর্তাদের জানান, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দক্ষ জনবল না থাকায় এবং জনবল কম থাকায় সঠিক সময়ে কাজ শেষ করতে পারেনি। এ ব্যাপারে তাকে একাধিকবার চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে।

এরপর দুদকের দলটি শহরে এনএসরোডে যান। সেখানে শাপলা চত্বর এলাকায় নির্মাণাধীন নালা নির্মাণের চলমান কাজ ঘুরে দেখেন। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের লোকজন ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের সাথে সেখানেও কথা বলেন। কাজে ত্র“টি আছে এবং মান নিয়ে তারা সংশয় প্রকাশ করেন। এরপর তারা এনএসরোডে মৌবনের সামনের সড়কের ইট বালু ঠিকমত আছে কিনা সেটা দেখেন। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় অভিযান শেষ হয়। অভিযান প্রসঙ্গে দুদকের উপপরিচালক মোহাম্মদ জাকারিয়া হোসেন বলেন, ‘নালা ও সড়ক নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছেÑএমন অভিযোগে অভিযান চালানো হয়। সেটা সরেজমিন দেখা হয়েছে। কিছু সমস্যা আছে। কাগজপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে কমিশনে প্রতিবেদন পাঠানো হবে। নালা ও সড়ক নির্মাণের কিছু অনিয়ম আছে।’

কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কাজের মান নিয়ে তাদের কোন অভিযোগ নেই জানালেও, সরেজমিন পরিদর্শন আর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। ৩৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকা ব্যায়ে শহরের এনএস  রোডের রাস্তা প্রশস্তকরন, ড্রেন নির্মাণ, আরসিসি রোড নির্মান, এনএস রোড সড়কের মাঝে ডিভাইডার নির্মান, ইলেক্ট্রিক পোল স্থানান্তর, কালভার্ট নির্মান ও ফুটপাতে টাইলস বসানোর কাজ পায় ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নেশন টেক। ২০১৮ সালের প্রথমদিকে কাজ শুরু করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী যা শেষ হওয়ার কথা ছিলো চলতি বছরের মে মাসে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান  নেশন টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইফতেখারুল ইসলাম জানান, কাজ শুরুর পর থেকে আমরা নির্ধারিত সময়ে মানসম্মত কাজ বুঝিয়ে দেয়ার  চেষ্টা করে আসছি। কাজ শুরুর পর বেশকিছু প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।  পৌরসভা কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তহীনতা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনে ধীরগতির কারনে আমাদের পূরো কাজের উপর প্রভাব পড়েছে। নিজেদের যথেষ্ট সক্ষমতা আছে দাবি করে, এই ঠিকাদার জানান, আমরা সারাদেশে অনেক বড় বড় কাজ করেছি অনেক সুনামের সাথে। কোথাও  কোন কাজে কোন ধরনের অভিযোগ নেই। কিন্তু কুষ্টিয়া পৌরসভার কাজ করতে গিয়ে আমরা বেশকিছু সমস্যার মধ্যে পড়ি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো, ড্রেন নির্মান ও রাস্তাপ্রশস্তকরন। বড় এই দুটি কাজে অনেক বাধার সৃষ্টি হয়। সেসব বাধা দেখার বিষয়টি পৌরসভার। আমরা যখন যেখানে বাধার সম্মুখীন হয়েছি পৌরসভা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা সেটা সমাধান করেছে সময় নিয়েছে যার প্রভাব পুরো কাজের উপর পড়েছে। তিনি বলেন, রাস্তাপ্রশস্তকরন কাজটি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে বিদ্যুতের খুটি অপসারন না করায়। এখন পর্যন্ত এনএস রোডের একটি বিদ্যুতের খুটিও অপসারন করা হয়নি, যার কারনে আমরাও প্রশস্তকরন কাজটি সম্পন্ন করতে পারছি না। এই দায়িত্বটি ছিলো পৌরসভা কর্তৃপক্ষের, কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তারা বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে সমন্বয় না করায় আমাদের কাজে সময় বেশি লাগছে। ড্রেন নির্মান করতে গিয়ে অনেকবার বাধার মুখে পড়ে কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। এই বাঁধাগুলো সাথে সাথে সমাধান করতে পারলে আমরা আরো দ্রুত সময়ে কাজ শেষ করতে পারতাম। নির্মান কাজ ওয়ার্ক অর্ডার অনুযায়ী হচ্ছে দাবি করে এই ঠিকাদার জানান, সময় বাড়ানো হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। আমরা একমাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারবো কিন্তু আমাদের কাজের পরিবেশটি করে দিতে হবে। আমাদের কোনকিছুর ঘাটতি নেই। সারাদেশে নেশনটেক বড় বড় কাজ কাজ করছে, আমাদের সেই সক্ষমতাও আছে। কুষ্টিয়া পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাজ নিয়ে আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ নেই। কাজের মান সঠিক আছে দাবি করে তিনি বলেন, এরপরও যদি কোন অভিযোগ থাকে সেটা পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যাপার। দুদকের প্রতিনিধি দলকেও আমরা পৌরসভার পক্ষ থেকে বলেছি কাজের মান ঠিক আছে। দুদক আজ যে অভিযান চালিয়েছে সেটি মূলতঃ কাজের ধীরগতি নিয়ে। তাছাড়া সুনির্দিষ্ট কোন অভিযোগ ছিল না। কাজের ধীরগতির জন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষ দায়ী কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের কিছু দায় হয়তো আছে। কারণ এতোবড় কাজ শেষ করতে সময় লাগবে এটাই স্বাভাবিক। এন এস রোডের বিদ্যুতের খুটি না সরানোর ফলে কাজের ধীরগতির দায় কুষ্টিয়া পৌরসভার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের এমন অভিযোগের বিষয়ে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, বিদ্যুতের খুটি সরানো নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের সাথে সমন্বয় হতে একটু সময় লেগেছে। গতমাসের ১৬ তারিখ বিদ্যুৎ বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন ও টাকা পয়সা পরিশোধ করা হয়েছে। খুব দ্রুতই বিদ্যুতের খুটিগুলো স্থানান্তর করলে কাজ ৩০ ডিসেম্বর নির্ধারিত তারিখের মধ্যে শেষ হবে।

আরো খবর...