কুষ্টিয়া চিনিকল হরিজন পল্লীর মেধাবী স্বপ্না রানী উচ্চতর ডিগ্রী নিয়ে সমাজে আলো ছড়াতে চাই

নিজ সংবাদ ॥ কুষ্টিয়া চিনিকল হরিজন পল্লীর মেয়ে স্বপ্না এবার পিএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়ায় পুরো পাড়ায় দারুন খুশির আমেজ। পরিবেশ পারিপার্শিকতার  কোন বাঁধা আটকাতে পারেনি তাকে। এখন হরিজন পল¬ীর আাঁধার ঘরের আলো স্বপ্না রানী। স্কুলে ভর্তি হতে অল্প বয়সেই করতে হয়েছে সংগ্রাম। দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে ছিনিয়ে এনেছে সাফল্য। ২০১৯ সালে পিএসসি পরীক্ষায় স্বপ্না রানী গোল্ডেন এ-প¬াস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

প্রথমবারের মত এই পল্লী থেকে পিএসসিতে ভাল ফল করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে হরিজন এই শিক্ষার্থী। বর্তমানে সে কুষ্টিয়ার জগতি এলাকার কেএসএম ঢাকা মিনাপাড়া কলেজিয়েট স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে অধ্যায়নরত। স্বপ্না এবং তার পরিবারের স্বপ্ন সে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিসিএস ক্যাডারে চাকুরীর সুযোগ নেবে। নিতান্ত গরীব ঘরের হরিজন পল্লীর সন্তান স্বপ্না রানী। বাবা হীরা লাল সারাদিন লাশের অপেক্ষায় বসে থাকেন কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে। মর্গে লাশ আসলেই কাটতে হবে। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের ডোম হিসেবে কর্মরত আছেন হীরা লাল। কুষ্টিয়া চিনিকল হরিজন পল¬ীতে স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন হীরা লাল। হরিজন পল্লীর এই পরিবার থেকে উঠে এসেছেন স্বপ্না রানী। কুষ্টিয়া চিনিকল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্র্থী ছিলেন স্বপ্না রানী। ক্লাসের ২য় ক্যাপ্টেন ছিল। এবার পিএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প¬াস পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তি হয়েছেন কেএসএম ঢাকা মিনাপাড়া কলিজিয়েট ৬ষ্ঠ শ্রেনীতে। স্বপ্নার পিতামহ কুষ্টিয়া চিনিকলে কর্মরত থাকার সুবাদে কুষ্টিয়া চিনিকল হরিজন পল্লীতে পিতা-মাতা ও পরিবারের সব সদস্যরা থাকেন এই পল্লীতে। আর সেই সুবাদে কেএসএম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ। মেধাবী স্বপ্না রানী নিজের প্রচেষ্ঠায় স্কুলের অন্যদের সাথে পাল¬া দিয়ে লেখাপড়া চালিয়েছে। স্বপ্না রানী জানায়, প্রথম দিকে হরিজন পল্লীর ছেলে মেয়েদের স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। স্কুলে ভর্তি হতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা স্যারের আন্তরিকতায় আমরা স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগ পায়। আমার মেধা দেখে খুশি হয়ে স্যার আমাকে স্কুলের লেখাপড়ার সুযোগ করে দেন। সে জানান, আমি শহরের ভাল স্কুলে পড়তে চাই। কিন্তু হরিজন শুনলেই কোন স্কুলে ভর্তি নিচ্ছে না। আবার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সব প্রশ্নের উত্তর লিখেও কেন জানি রেজাল্ট লিষ্টে আমার রোল আসছে না। প্রধান শিক্ষক গোলাম মোস্তফা বলেন, হরিজন পরিবারের সন্তানদের স্কুলে ভর্তি নেয়া নিষেধ ছিল। আমি যোগদান করে হরিজন পরিবারের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ভর্তি নেয়ার বিষয়টি ম্যানেজিং কমিটিতে উপস্থাপন করি। কিন্তু কমিটির অধিকাংশ সদস্য তাদের স্কুলে ভর্তি নেয়ার বিরোধিতা করেন। কমিটির সদস্যরা বলেন হরিজন ছেলে মেয়েদের সাথে অন্য শিক্ষার্থী বসতে চাইবে না। অনেক অনুরোধের পর শর্তসাপেক্ষে তাদের ভর্তি নেয়া অনুমোদন দেয় ম্যানেজিং কমিটি। শর্ত দেয়া হয় হরিজন শিক্ষার্থীদের আলাদা বেঞ্চে বসতে হবে। বর্তমানে আমি সেই শর্ত তুলে দিয়ে শ্রেণী কক্ষে সকল শিক্ষার্থীকে এক সাথে বসার ব্যবস্থা করেছি। আমার স্কুলে হরিজন বলে কিছু নেই, এখানে সবাই শিক্ষার্থী। মা শ্রীমতি রুমা রানীর অনুপ্রেরনায় হরিজন পল্লীর পরিবেশে নিজেকে একটু ভিন্নভাবে গড়ে তোলার লক্ষে পড়াশুনার প্রতি দারুন মনোযোগী ছিল স্বপ্না। সংসারে স্বপ্নারা দুই বোন ও এক ভাই। স্বপ্নার মা শ্রীমতি রুমা জানায়, আগে আমাদের হরিজন পরিবারে অল্প বয়সে মেয়েদের বিয়ে হয়ে সংসারে যেতে হতো কিন্তু এখন সেই যুগের পরিবর্তন এসেছে। এখন অল্প বয়সে বিয়ের প্রথাও উঠে যাচ্ছে। আমার পরিবার আমাকে অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে ভুল করলেও আমি আমার ছেলে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেব না। তাদের লেখাপড়া শেষে মানুষ করেই বিয়ে দেব। স্বপ্নার বাবা হীরা লাল বলেন, খুব কষ্ট করে মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু শহরের কোন ভাল স্কুলে মেয়েকে ভর্তি নিচ্ছে না। আপনাদের সহযোগিতায় আমার মেয়েকে ভাল স্কুলে ভর্তি করতে চাই।

আরো খবর...