কুষ্টিয়ায় যুবলীগ নেতা আলীমকে অস্ত্র ও ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ

সিসিটিভির ভিডিও ভাইরাল

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ কুষ্টিয়া সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল আলীমকে অস্ত্র’ গুলি ও ইয়াবা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে র‌্যাবের বিরুদ্ধে। অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়ার একটি ভিডিও ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। চরমপন্থি নেতা লিপটন ও জেলা পরিষদের সদস্য মামুন র‌্যাবকে দিয়ে আব্দুল আলিমকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে বলে পরিবারের লোকজন অভিযোগ করেছে। আব্দুল আলিম ও মামুনের বাড়ি একই এলাকায়। আলিম ভাদালিয়ার স্বস্তিপুর গ্রামের মাদার বক্সের  ছেলে। সুষ্ঠু তদন্ত শেষে দোষীদের কঠোর শাস্তি দাবি পরিবার ও এলাকাবাসীর।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, হাসপাতালে ভর্তি অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে গত বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে সদর উপজেলার উপজেলার ভাদালিয়ার বাড়ি থেকে শহরে আসার উদ্দেশ্যে বের হন। পথে চৌড়হাস এলাকায় সোহাগ জুয়েলার্সের পাশে একটি ৫ তলা আবাসিক ভবনের সামনে আলিম করো জন্য অপেক্ষা করছিল। এ সময় সেখানে একটি কারো গাড়ি নিয়ে যান জেলা পরিষদের সদস্য মামুন অর রশিদ। এরপর ভবনটির দারোয়ান, মামুন ও আলিম কথা বলছিল। মামুন কথা বলে ওপরে ওঠে যাওয়ার পর পরই তিনজন সাদা পোষাকধারী ব্যক্তি আলিমকে ঝাপটে ধরে।

সিসিটিভির ভিডিও দেখা যাচ্ছে, তিনজন আলিমকে ধরে একটি অস্ত্র বারবার তার মাজায় গুঁজে দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে সে টাইট প্যান্ট ও গেঞ্জি পরে থাকায় ও বাঁধা দেয়ায় অস্ত্র গুঁজতে গিয়ে বেগ পেতে হয় তাদের। এরপর গুঁজে দেয়ার সময় অস্ত্রটি মাটিতে পড়ে যায়। সেটি মেঝে থেকে তুলে হাতে করেন এ সদস্য। পরে আলিমকে মারধর করে তার কোমরে সেটি আবার গুঁজে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। তাকে চোখ বেঁধে ফেলার চেষ্টাও করা হয়। এরপর র‌্যাবের একটি গাড়ি ঘটনাস্থলে আসে।  এ সময় এলাকার ব্যবসায়ী ও সাধারন মানুষ সেখানে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে র‌্যাব সদস্যরা সরিয়ে দেয়। সেখান থেকে আলিমকে আটক করে র‌্যাব কুষ্টিয়া ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয়।

র‌্যাব কুষ্টিয়া ক্যাম্প থেকে একটি প্রেস রিলিজ দিয়ে জানানো হয় চৌড়হাস এলাকায় বৈঠক করার সময় অস্ত্র, গুলি ও মাদকসহ চরমপন্থি আব্দুল আলিমকে আটক করা হয়। পরে আলিমকে অস্ত্র ও মাদক মামলায় আসামী দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

আলিমের ভাই অ্যাডভোকেট দলোয়ার হোসেন বলেন, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আধিপত্য নিয়ে আলিমকে অপদস্ত, হয়রানী করতে মামুন অস্ত্র দিয়ে তাঁকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। র‌্যাব সদস্যরা তাকে জোর করে কোমরে পিস্তুল গুঁজে দেয়ার চেষ্টা করে। এলাকার সাধারন মানুষের সামনেই এ কাজ করার চেষ্টা করে র‌্যাব। তিনি বলেন, মামুন নিজেই বিতর্কিত, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকের মামলা রয়েছে। সে র‌্যাবের কথিত সোর্স। তারা অস্ত্র ব্যবসা ও সরবরাহ করে। তারা নিরীহ লোকজনকে ফাঁসিয়ে দেয়। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত শেষে র‌্যাব ও মামুনের শাস্তি দাবি করছি।’

আলিমের অসুস্থ স্ত্রী আঁখি খাতুন মালা বলেন, আমাকে দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার পর মামুন তাকে ফোনে চৌড়হাস যেতে বলে। সেখানে যাওয়ার পর বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে সেখানে একটি মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। চৌড়হাস সোহাগ জুয়েলার্স এবং তার সংলগ্ন জর্জ সাহেবের বিল্ডিং হিসেবে খ্যাত ৬ তলা বিল্ডিং এর সামনের ফাকা জায়গায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে থাকা অবস্থায় মামুন তার কালো চার চাকার গাড়িটি নিয়ে সেখানে পৌছায়। গাড়ী থেকে নেমে ভাই একটু অপেক্ষা করেন আমি আসছি বলে, উক্ত ৬ তলা বিল্ডি এর এটিএম বুথের ২য় তলায় চলে যায়। ঠিক ঐ সময়ে আমার স্বামী আব্দুর আলীমের ৩ দিক থেকে সিভিল পোষাকে আনুমানিক ৪০ বছরের নিচে বয়স্ক তিনজন ঘিরে ধরে।

এরপর সাদা পোষাকে র‌্যাব পরিচয় দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে  কোমরে পিস্তল গুঁজে দেয়ার চেষ্টা করে র‌্যাব। তাকে মারধর করা হয়েছে। মিথ্যাভাবে তাকে প্রকাশ্যে দিনের বেলা অস্ত্র দিয়ে ফাঁসিয়ে দেয়া হলো, এদেশে কি কোন বিচার নেই? চরমপন্থি লিটপন মামুনকে দিয়ে আমার স্বামীকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। তিনি র‌্যাব সদস্য, লিপটন ও মামুনের শাস্তি দারি করার পাশাপাশি আলিমের মুক্তি দাবি করেন।

আলিমের প্রতিবেশি ও স্বজনরা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, লিপটন নিজেই শীর্ষ চরমপন্থি। তার ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত মামুন।  ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।

যেখানে ঘটনা সেই চৌড়হাস মোড়ে ব্যবসায়ীরা নিজেদের বাড়তি নিরাপত্তার জন্য গাছে সিসিটিভি স্থাপন করেছেন। এই সিসিটিভিতে শিশু আকিফাকে যখন বাসে ধাক্কা সেই সেই দৃশ্য ধরা পড়ে।

একইভাবে যুবলীগ নেতা আব্দুল আলিমকে জবরদস্তিমূলক ফাঁসিয়ে দেয়ার ঘটনা অন্য পাশাপাশি থাকা অন্য একটি ক্যামেরায় ধরা পড়ে। বিষয়টি জানাজানির পর র‌্যাব সিসিটিভি ফুটেজ ডিলিট করে দিয়ে যায়। এ নিয়ে মুখ না খুলতেও হুমকি দেয়া হয় আশেপাশের লোকজনকে।

স্থাণীয় সোহাগ জুয়েলার্সের মালিক বলেন, সেদিন আমি দোকানে কেনাবেচা করছিলাম। এরপর হট্টগোল শুনে এগিয়ে গিয়ে এক ব্যাক্তিকে ঝাপটে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ধস্তাধস্তি হচ্ছে। পরে র‌্যাব জানায়, অস্ত্রসহ তাকে আটক করা হয়েছে। মাদকও পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, অস্ত্রটি সে সময় র‌্যাবের একজনের হাতে ছিল।’

জেলা পরিষদের সদস্য মামুন অর রশিদ বলেন,‘ আমার বাসা চৌড়হাস মোড়েই। আমি বুথে টাকা তুলতে যাওয়ার সময় গাড়ি থেকে নেমে দেখি সেখানে আলিম দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশে গোয়েন্দা সংস্থার লোক দেখে আমি দ্রুত চলে যায়। এরপর এসে দেখি আলিমকে অস্ত্র, গুলি ও মাদকসহ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আমার সাথে তার কোন বিরোধ নেই। শুধু শুধু আমাকে হেয় করতে মিথ্যাভাবে নাম জড়ানো হচ্ছে। একই এলাকায় বাড়ি হওয়ায় আমার নাম আসছে। এ ঘটনার সাথে আমি জড়িত নয়।’

র‌্যাব-১২ কুষ্টিয়া ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার (ভারপ্রাপ্ত)  লেফটেনেন্ট এএম.এম.এইচ ইমরান সাংবাদিকদের ফোনে জানান, অস্ত্র ও গুলি দিয়ে ফাঁসানোর যে অভিযোগ সেটি সঠিক নয়, র‌্যাব কখনো এ ধরনের কাজ করে না।’

আব্দুল আলিম সদর উপজেলা যুবলীগের সাবেক সাধারণ ছিলেন। এছাড়া জেলা যুবলীগের আহবায়ক কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন তিনি রাজনীতির সাথে জড়িত।

আরো খবর...