কুমারখালিতে দিনে দুপুরে খালের জায়গার শতশত গাছ কেটে সাবাড় করছে প্রভাবশালীরা

জিকের কতিপয় কর্মকর্তার সহযোগিতায়

নিজ সংবাদ ॥ গঙ্গা কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্প (জিকে)’র কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় কুষ্টিয়ার কুমারখালিতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) আওতাধীন খালপাড়ের সরকারি শতশত গাছ দিনে দুপুরে কেটে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে।  স্থাণীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জিকের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এসব গাছ কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে। সরকারি এসব সম্পদ দিনে দুপুরে তছরুফ করা হলেও কেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না। বরং বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে গাছ কেটে নেয়া হচ্ছে। আর গাছ কাটার এ ঘটনা চলছে কুমারখালী উপজেলা নিয়ামত বাড়ি গ্রামে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগীতায় পাউবোর কয়েকজন কর্মকর্তারা গাছ কাটার সাথে জড়িত বলে স্থাণীয় একধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এ জন্য লেনদেন হয়েছে অর্থ। অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়নবোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পিযুষ কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন,‘সরকারি গাছ দরপত্র ছাড়া কাটার কোন বিধান নাই। বিষয়টি জানার পর থানায় মামলা করা হয়েছে। এঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা সূত্র জানায়, প্রায় ১৫ বছর আগে গবরা চাঁদপুর ইউনিয়নের নিয়ামত বাড়ি গ্রামের পাশে জিকে প্রকল্পের খালপাড়ে অন্ততঃ আধা কিলোমিটার এলাকায় কাঁঠাল, আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির ওষুধি, বনজ ও ফলজ গাছ লাগানো হয়েছিল। গত শুক্রবার সকাল থেকে হঠাৎ করে ২০-৩০ জন শ্রমিক গাছ কাটতে থাকেন। চাঁদপুর গ্রামের প্রভাবশালী সহরাব উদ্দীনসহ কয়েকজন ব্যক্তি খালের পাড়ের গাছগুলো বিক্রি করে দেয়। তারা কুষ্টিয়া পাউবো কার্যালয়ের কর্মকর্তা উপসহকারি প্রকৌশলী পিয়াস চন্দ্র চৌধুরী ও  কার্যালয়ের কার্য সহকারী আবদুর রশীদের সাথে যোগসাজসে এসব গাছ বিক্রি করেন। এর বিনিময়ে তারা মোটা অঙ্কের নিয়েছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে সোহরাব উদ্দীনের বাড়িতে গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। সাংবাদিক আসার খবরে সটকে পড়েন তিনি।

গতকাল সোমবার এ বিষয়ে এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খালের পাড়ে গাছের শতাধিক গুঁড়ি পড়ে আছে। কাটা গাছ নসিমন করিমনে করে অন্যত্র নেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি গাছ শ্রমিকেরা কুড়াল দিয়ে কাটছে। অন্তত পাঁচটি গাছ কাটতে দেখা গেল। তারমধ্যে একটি গাছের গায়ে লাল কালি দিয়ে ১২৬৭ লেখা দেখা পাওয়া যায়। তার মানে এর আগে ১২৬৬টি গাছ কাটা হয়েছে।

স্থানীয় এক নারী রাজিয়া খাতুন কাটা কাঁঠালগাছের খড়ি ও পাতা সংগ্রহ করছিলেন। তিনি জানান, ‘এখানে বড় বড় শত শত কাঁঠাল ও আমগাছ ছিল। লোকজন কেটে নিয়ে গেছে। পড়ে থাকা খড়ি ও পাতা জ¦ালানীর জন্য বাড়িতে নিচ্ছেন।’

গাছ কাটা প্রসঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির সাথে কথা হয়। জমির উদ্দীন নামে ওই ব্যক্তি পেশায় কাঠ ব্যবসায়ী। তিনিও অন্তত দশজন শ্রমিক দিয়ে গাছ কাটছেন। জমির উদ্দীন বলেন, ‘সহরাবের কাছ থেকে তিনি ৪০টি গাছ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছেন। এভাবে রফিকুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন কাঠ ব্যবসায়ী গাছ কিনেছে। তবে এ গাছের মূল্য আরো অনেক বেশি।

তিনি আরও বলেন,‘পাউবোর কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র চৌধুরী ও আবদুর রশীদ ১৫ দিন আগে গাছগুলো লাল কালি দিয়ে চিহিৃত করে যায়। এরপর খালের জমির পাশে ব্যক্তিমালিকানা জমির মালিকদের মাধ্যমে গাছগুলো কাটতে বলে। এর বেশি কিছু আর জানা নাই।’

একজন কাঠ ব্যবসায়ী বলেন, পনের দিন ধরেই পাউবোর কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে এলাকায় আসছে। আজকে  (সোমবার) সকালেও এসেছিল। গাছ বিক্রি করার টাকা থেকে তারা ৬০ ভাগ টাকা নিয়ে যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খালপাড়ের আরেক বাসিন্দা বলেন, তিন কিলোমিটার জুড়ে থাকা গাছের মধ্যে অন্তত ৪০ ভাগ গাছ কেটে সাবাড় করা হয়েছে। বাকি গাছগুলো কয়েকদিনের মধ্যে কাটা শেষ হয়ে যাবে। প্রতিটা গাছ গড়ে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা করে দাম হবে। পাউবোর কর্মকর্তারা লাল কালি দিয়ে চিহিৃত করে দেওয়ায় কেউ কিছু বলার সাহস পায়নি। সবমিলিয়ে গাছগুলোর দাম প্রায় কোটি টাকা হবে।

পাউবো কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, সম্প্রতি নিয়ামতবাড়ি এলাকার খালটি খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কাজও শুরু হয়েছে। তবে খালের পাড়ে থাকা গাছ কাটার কোন দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক মোঃ আসলাম হোসেন বলেন, সরকারি গাছ কাটার কোন বিধান নেই। টেন্ডার ছাড়াও গাছ কাটা আরও বড় অন্যায়। যারা জড়িত থাক তাদের খুঁজে বের করে মামলার দেয়ার জন্য জিকের কর্মকর্তাদের বলা হবে। কোন ছাড় দেয়া হবে। সরকারি কোন লোক জড়িত থাকলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরো খবর...