করোনা যা শেখাচ্ছে আমাদের

করোনার তান্ডবে বিপর্যস্ত আজ সারা বিশ্ব। মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই  যেখানে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। অবশ্য শুধু মানবজীবন বললে ভুল হবে। বলতে হবে, এই ধরাতলে এমন কোনো সৃষ্টি নেই যা সর্বগ্রাসী এ ভাইরাসের প্রভাব থেকে মুক্ত। মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, নদীনালা, খালবিল, সাগর-মহাসাগর, আকাশ-বাতাস, পাহাড়-জঙ্গল- করোনার ধাক্কা  লেগেছে সর্বত্র।

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিত্যদিন এর ক্ষতিকর প্রভাবগুলো আলোচিত হওয়ায় এর যে কিছু ইতিবাচক প্রভাবও আছে, তা কিন্তু আড়ালে থেকে  গেছে। অথচ নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি ইতিবাচক প্রভাবগুলোও আলোচনায় আসা প্রয়োজন। না হয় পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র থেকে আমরা বঞ্চিত হব, যা আসন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে ক্রটিগ্রস্ত করবে। কারণ এ প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ লাভ-ক্ষতি বিশে¬ষণের জন্য নেতিবাচক প্রভাবগুলোর পাশাপাশি ইতিবাচক প্রভাবগুলোকেও বিবেচনায় আনতে হয়। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে নীতির কাঙ্খিত ফলাফল পাওয়া যাবে না। যেহেতু করোনাজনিত মহামারীর মোকাবেলায় প্রচুর নীতিসংশি¬ষ্টতা থাকবে, সেহেতু ইতিবাচক প্রভাবগুলোর সঠিক মূল্যায়ন জরুরি। বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক মহামারীর সর্বাধিক আলোচিত এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক ফল হল প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষত কিছুটা হলেও সেরে ওঠা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত নিবিড় অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ফলে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশ দিনের পর দিন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বৈশ্বিক উষ্ণতা। ক্ষীণ হয়ে গিয়েছে মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে পৃথিবীকে রক্ষাকারী ওজোনস্তরের পুরুত্ব। পানি দূষণ সব গ্রহণযোগ্য মাত্রাকে অতিক্রম করেছে। বিপন্ন হওয়ার পথে রয়েছে পৃথিবীর এক অমূল্য সম্পদ জীববৈচিত্র্য। মহামারীজনিত কারণে মানুষের যাবতীয় কর্মকান্ড সীমিত হয়ে আসায় পরিবেশের এ ক্ষতগুলো আস্তে আস্তে সেরে উঠতে শুরু করেছে। বায়ুদূষণ, পানি দূষণসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ দূষণ কমতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ, নাসা এবং ইউরোপিয়ান স্পেইস এজেন্সির পলিউশন মনিটরিং স্যাটেলাইট নিশ্চিত করেছে  যে, ২০২০ সালের ফেব্র“য়ারি মাসে পূর্ব এবং মধ্য চীনের বাতাসে ফুসফুসের জন্য ক্ষতিকর নাইট্রোজেন ডাই অক্সাইডের মাত্রা অন্যান্য স্বাভাবিক বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০-৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এর সঙ্গে করোনাভাইরাস বিস্তারের সম্পর্ক আছে বলে দাবি করা হয়েছে। স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে এ বছরের এপ্রিল মাসের  দৈনিক কার্বন নিঃসরণের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭ শতাংশ হ্রাস  পেয়েছে। ওই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, লকডাউনের ফলে কার্বন নিঃসরণের বাৎসরিক পরিমাণ ৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় পতন হিসেবে পরিগণিত হবে। মহামারীর কারণে মৎস্য আহরণ কমে যাওয়ায় সামুদ্রিক মৎস্য ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে। জার্মান বিশেষজ্ঞ রাইনার ফ্রয়েস বলেছেন এভাবে চলতে থাকলে ইউরোপে কোন কোন মাছের মজুদ এক বছরে দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। এদিকে  কোলাহল কমে যাওয়ায় সমুদ্রতীর ও এর নিকটবর্তী স্থানীয় প্রজাতির প্রাণী ও উদ্ভিদদের আচরণে পরিবেশবান্ধব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে ইতোমধ্যে ডিম পাড়ার জন্য সামুদ্রিক কচ্ছপ আগমনের ঘটনা প্রত্যক্ষ করা গিয়েছে। সৈকতে নীল জলে নানা জাতের ডলফিনের খেলায়  মেতে ওঠার ঘটনাও ঘটেছে। লাল কাঁকড়ার বিচরণ বৃদ্ধি পেয়েছে চোখে লাগার মতো। দলবেঁধে মায়াবী হরিণের ছোটাছুটিও সবার নজর কেড়েছে। মানুষের অতিরিক্ত পদচারণায় এ  সৈকতের বিভিন্ন প্রজাতির ঘাস, লতাপাতা ও বৃক্ষ প্রায় বিলীন হয়ে গিয়েছিল। বিগত কয়েক মাসের লকডাউনে এদের জীবনে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। দেখা মিলেছে ফুলে ফুলে সুশোভিত সাগরলতার। লকডাউনে বাসায় আটকে পড়াদের হাতে পর্যাপ্ত সময় থাকায় অনেকেই বাসার ছাদে কিংবা বারান্দায় বাগান করছেন। এ বাগান একদিকে প্রতিদিনকার শাকসবজির চাহিদা মিটাচ্ছে, অন্যদিকে সবুজায়নের মাধ্যমে অক্সিজেন সরবরাহ বাড়িয়ে পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়নে অবদান রাখছে। আবার অনেকে বাগানে ফুল চাষের মাধ্যমে প্রতিবেশগত সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে চিত্তের খোরাক জোগাচ্ছেন। স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করোনাজনিত মহামারীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক প্রভাব। বিভিন্ন জীবাণুঘটিত রোগ বিস্তারের জন্য বহুলাংশে দায়ী হাত ধোয়ার অভ্যাস না থাকা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সরকারি ও  বেসরকারি সংস্থার ব্যাপক প্রচারণার পরও বিশেষ করে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের জনগণকে হাত ধোয়ায় অভ্যস্ত করা যাচ্ছিল না। চলমান মহামারীর শুরু হওয়ার পর থেকে হাত ধোয়ার ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা চর্চার অন্য দিকগুলোও মানুষের অভ্যাসের অংশ হতে শুরু করেছে।  যেমন- হাঁচি-কাশি দিতে কনুই ব্যবহার করা, যত্রতত্র থুথু না ফেলা, বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখা, পরিধেয় বস্ত্র নিয়মিত ধৌত করা ইত্যাদি ব্যাপারে মানুষ পূর্বের  চেয়ে অনেক বেশি সচেতন। ধূমপানের অভ্যাসেও ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয়। অ্যাকশন অন স্মোকিং অ্যান্ড হেলথ নামক একটি বেসরকারি সংস্থার এক জরিপে  দেখা গিয়েছে, করোনাভাইরাস বিস্তার লাভের পর ব্রিটেনের ১০ লাখ মানুষ ধূমপান ছেড়ে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, গণমানসের ওপরও ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে এ মহামারীর। ধারণা করা হয়, করোনা মানুষকে আরও মানবিক করে তুলেছে। পারস্পরিক মমত্ববোধকে গভীর থেকে গভীরতর করেছে। অত্যন্ত ছোঁয়াচে এ জীবাণুর কাছে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সমান। শারীরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গলদ আছে এমন যে কারও ওপর এর আঘাত অপক্ষপাতমূলক। তার মানে সবার ঘাড়ের ওপর ঝুলছে বিপদের খক্ষ। এমন সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে হৃদয় বিগলিত হওয়া এবং পারস্পরিক সহমর্মিতা বৃদ্ধি পাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক। ফলে পারস্পরিক হিংসা, বিদ্বেষ ও ক্রোধের ভাব কমেছে। মানুষের মধ্যে দানশীলতার অনুভূতি বৃদ্ধি পেয়েছে। সবাই সাধ্যমতো একে অপরের সহযোগিতায় হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকেই বিনামূল্যে খাদ্য, চিকিৎসাসেবা, ওষুধ ও চিকিৎসা উপকরণ বিতরণ করছে। অনেকে এসব সাহায্য প্রয়োজনীয় মুহূর্তে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে। মানুষের প্রতি মানুষের যে ভালোবাসা বিভিন্ন অবয়বে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করেছে এ মহামারীর উসিলায়। তাছাড়া পরিবর্তন এসেছে মানুষের অগ্রাধিকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে। পরিবর্তন এসেছে দৃষ্টিভঙ্গিতে, জীবনবোধে ও উপলব্ধি করার ক্ষমতায়। সৃষ্টি জগতের জড় কিংবা জৈব প্রতিটি সত্তার একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা যে কতটা তীব্র তা করোনাপূর্বকালে এত ভালো করে বোঝা যায়নি। আবার করোনাপূর্বকালে যে আমরা কত আরামে ছিলাম তাও কিন্তু এখন টের পাচ্ছি। বোধের এ পরিবর্তনগুলো নিশ্চিতভাবে ইতিবাচক। স্বাভাবিক সময়ে চাকরিজীবী পিতামাতা সন্তানদের তেমন একটা সময় দিতে পারেন না। ঘরবন্দি থাকার সুবাদে তারা এখন সারাক্ষণই সন্তানদের সান্নিধ্যে থাকছেন। এটা সন্তানদের (বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের) মানসিক বিকাশে অত্যন্ত সহায়ক। গৃহবধূ স্ত্রীরাও স্বামীর সান্নিধ্য পাচ্ছেন আগের চেয়ে বেশি। পরিবারের সদস্যদের এ পারস্পরিক সান্নিধ্য পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা যায়। ক্রেতাদের মানব-নৈকট্য পরিহার করার প্রবণতার ফলে সশরীরে কেনাকাটার জায়গায় স্থান করে নেয় ভার্চুয়াল কেনাকাটা। লাফ দিয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে ক্রয়-বিক্রয় মীমাংসাকারী বিদ্যমান অনলাইন প¬াটফরমগুলোর ব্যবহার। যেখানে এতদিন এ প¬াটফরমগুলোর পরিচিতি সীমাবদ্ধ ছিল সমাজের হাতেগোনা দু’-চারজনের মধ্যে, সেখানে বর্তমানে এগুলোর কদর এক ধরনের সার্বজনীন রূপ লাভ করেছে। এতে অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটার পরিমাণ অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি  পেয়েছে এবং এর ফলে এ খাতে নিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে সমান তালে। করোনার ফলে সার্বিকভাবে নিয়োগের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল, তা কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে অনলাইন প¬াটফরমগুলোর এ ভূমিকার ফলে। করোনার বিস্তার বৃহত্তর পরিসরে কিছু চমৎকার সামাজিক পরীক্ষণের দুর্লভ সুযোগ করে দিয়েছে।  কোন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশি¬ষ্ট যাবতীয় যোগাযোগ অনলাইনে সম্পন্ন করা হলে ওই কার্যক্রমের ফলাফল কীভাবে প্রভাবিত হবে? অথবা শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সাফল্যের ওপর অনলাইন পাঠদানের প্রভাব কী? এ জাতীয় বিষয়ের ওপর গবেষণার ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরীক্ষণ (ন্যাচারাল এক্সপেরিমেন্ট) যথাযথ কার্যকারণ সম্পর্ক নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রাকৃতিক পরীক্ষণ ব্যতিরেকে এরূপ গবেষণার ফলাফল ক্রটিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রাকৃতিক পরীক্ষণের সুযোগ কিন্তু খুব সীমিত। করোনা আমাদের জন্য সেরকম একটা দুর্লভ সুযোগ সৃষ্টি করে দিল। জেরুজালেমের হিব্র“ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক যিউভাল নোয়াহ হারারি ফিনান্সিয়াল টাইম্স পত্রিকায় প্রকাশিত তার এক নিবন্ধে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উলে¬খ করেন। করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী সংঘটিত মহামারীর মোকাবেলায় নীতিনির্ধারকরা কতটুকু সফল হবেন, তা নির্ভর করবে তাদের গৃহীত নীতি কতটুকু দক্ষতার সঙ্গে প্রণয়ন করা হয়েছে তার ওপর। আর দক্ষ নীতি প্রণয়নের জন্য প্রয়োজন যথাযথ তথ্য-উপাত্তের। সেই হিসেবে ওই মহামারীর নেতিবাচক ফলাফলের পাশাপাশি ইতিবাচক ফলগুলোকেও বিবেচনায় নেয়ার মাধ্যমে প্রণীত নীতির গুণগত মান বৃদ্ধি করা যাবে বলে আশা করা যায়। লেখক ঃ অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

আরো খবর...