করোনা : মানুষের জীবন আজ গভীর সংকটে

॥ মোহাম্মদ নজাবত আলী ॥

বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর আকাশ করোনায় কালো মেঘের ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। তাই থমকে গেছে পৃথিবী, থমকে গেছে সময়। দুরন্ত ছুটে চলা পৃথিবী করোনাভাইরাসের কাছে যেন হার মেনেছে। সারা পৃথিবীতে এ ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। লাখ লাখ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং ইতিমধ্যে তিন লাখ মানুষ মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন করোনায় ঝুঁকিপূর্ণ। তারা তিনটি নির্দেশনা দিয়েছেন। প্রথমত, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরবন্দি হয়ে থাকা। দ্বিতীয়ত, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় না যাওয়া। তৃতীয়ত, সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাইরে বের না হওয়া। এ ভাইরাসের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে ইউরোপ আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে লকডাউন চলছে। করোনাভাইরাস গোটা পৃথিবীর মানুষকে যেন একঘরে করে  রেখেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে। তবে আমরা আশাবাদী এ অন্ধকার কেটে যাবে। নতুন সূর্যোদয়ে আলোকিত হবে সমগ্র পৃথিবী। গোটা পৃথিবীর মানুষের জীবন আজ গভীর সংকটে। ইউরোপ আমেরিকাসহ পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো এ ভাইরাসের হাত থেকে মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রাণান্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবুও যেন থামছে না মৃত্যুর মিছিল। পিতা, মাতা, স্ত্রী, পুত্র, কন্যা বা আপনজনের মৃত্যুতে মানুষ শুধু কান্নায় ফেটে পড়ছে, শোকে পাথর হচ্ছে তবুও লাশ দেখা বা বুকে জড়িয়ে ধরতে পারছে না। এমনকি জানাজায় শরিক হতেও মানা। কারণ, এ ছোঁয়াচে জীবাণু মৃতব্যক্তির দেহ থেকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ আশঙ্কায় আপনজনের লাশের কাছে যাওয়াও নিষিদ্ধ। সরকারের নির্দিষ্ট কিছু লোকজন ধর্মীয় বিধান মতে লাশ দাফন-কাফন ও কবরের ব্যবস্থা করছে। কী! এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে সমগ্র পৃথিবীতে। এ ধরনের মহাদুর্যোগের মুখে পতিত হবে গোটা পৃথিবী হয়তো তা কেউ ভাবেনি। যা ভাবা হয়নি, কল্পনার অতীত ছিল সেটা  মেনে নিতে হচ্ছে। অতীতে অনেক দুর্যোগ মহামারি কেটে গেছে; কিন্তু এভাবে পৃথিবীর মানুষ একঘর হয়ে পড়েনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এ এক কঠিন বাস্তবতাকে না মানার কোনো উপায়ই  নেই। কারণ পৃথিবীতে করোনাভাইরাস মানুষের শান্তি, আনন্দ উচ্ছ্বাস কেড়ে নিয়েছে। সংগত কারণে মানুষের মনে কোনো সুখ নেই, শান্তি  নেই, শুধু আতঙ্ক। করোনার বাইরে দেশে এখন অন্য কোনো খবর নেই। এমন দুর্যোগ আমরা অতীতে দেখিনি। এ এক মহামারি। এ দুর্যোগ কবে কখন শেষ হবে তা বলা মুশকিল। তবে হয়তো সময়ের ব্যাপার, এ দুর্যোগ মহামারি, অন্ধকার কেটে যাবে। পূর্বাশার আলো দেখা যাবে। তাই করোনা নিয়ে শংকিত না হয়ে আমাদের মনোবল বাড়াতে হবে। দুর্বল হলে চলবে না। তবুও আমাদের কোনো স্বস্থি নেই। আমরা এখনো বিপদমুক্ত নই। কারণ বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যু বাড়ছে। আমাদের ভয় এবং উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক বার্তা দিয়েছে এ ভাইরাস আরও অনেক দিন থাকবে। তাই আমাদের সতর্ক হওয়া ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। করোনা রোগের চিকিৎসার জন্য আগেই ডাক্তার বা নার্সদের সুরক্ষা প্রয়োজন এটা অস্বীকার করার  কোনো উপায় নেই। কারণ তারাই যদি সুরক্ষিত না হয়, নিরাপদ না হয় তাহলে রোগীর চিকিৎসা দেয়া কঠিন। বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায় ডাক্তার-নার্সরা রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। আমাদের দেশের চিত্রও তাই। আমরা জানি ডাক্তাররাও এ সমাজেরই অংশ। ভিন্ন কোনো গ্রহের মানুষ নয়। একজন ডাক্তার তার পেশায় বলে দেবে তাকে কী করতে হবে।  রোগীর সেবা দিতে হবে। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে  রোগ শনাক্তের মাধ্যমে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা এটাই ডাক্তারদের মানবসেবা।  কেননা চিকিৎসা একটি মহৎ সেবা ও পেশার নাম। এ পেশায় নিয়োজিত ডাক্তার, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছে অর্থের চেয়ে একটি কঠিন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করার যে আত্মতৃপ্তি ও প্রশান্তি তা অন্য কোনো পেশায়  নেই। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রোগীর সেবা করতে হয়। বর্তমান করোনায় আক্রান্ত  রোগীর সেবা আরও ঝুকিপূর্ণ। ইতিমধ্যেই করোনায় আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে কয়েকজন ডাক্তার, নার্স ও পুলিশ সদস্য মারা যান। ইতিপূর্বে বিদেশেও করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে বেশ কয়েকজন ডাক্তার-নার্স মারা যান। তবুও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের দেশেও ডাক্তাররা ঝুঁকি নিয়ে করোনা রোগীর চিকিৎসা দিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে দুর্বল নিরাপত্তার কারণে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশ সদস্যসহ অনেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাই ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, পুলিশসহ সংশি¬ষ্টদের পিপিইসহ অন্যান্য সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। সুতরাং বলতে চাই, মানুষের সেবা করাই তাদের প্রধান ব্রত। এ থেকে তারা পিছপা হবেন না। সরকার ইতিমধ্যে করোনা রোগীর চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সংশি¬ষ্ট ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ সংশি¬ষ্ট অন্যদের বিশেষ আর্থিক সম্মানী দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। সারা বিশ্বের উন্নত ও শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো প্রাণঘাতী করোনার ছোবল থেকে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সরকার, ডাক্তাররা হিমশিম খাচ্ছে। বড় বড় শহরে লকডাউন ঘোষণা করে মানুষকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশও অঘোষিত লকডাউন চলছে। করোনাভাইরাস ৬৪  জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। লকডাউন মানেই ঘরবন্দি হয়ে থাকা। বাইরে না যাওয়া। এ বন্দি হয়ে থাকা মানেই নিজে ও পরিবারকে করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরবন্দি হয়ে থাকতে পারলে এ ভাইরাসের হাত থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমরা এখনো সচেতন হতে পারিনি। নানা অজুহাতে লকডাউন উপেক্ষা করে মানুষ রাস্তায় নামছে। সেনাবাহিনী, পুলিশের টহলরত সদস্যরা বারবার মাইকিং করেও মানুষকে সচেতন তথা লকডাউন মানতে বাধ্য করা যাচ্ছে না। প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে, আইন দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয় না। এমনকি জরিমানা বা প্রতীকী শাস্তি দিয়েও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সবার আগে ব্যক্তিগত সচেতনতা। আমাদের অবশ্যই সচেতন হওয়া দরকার। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া। যদি বের হতেই হয় তাহলে অবশ্যই সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখা। এর ব্যত্যয় হলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। সরকারের পুলিশ প্রশাসন, সশস্ত্র বাহিনী জনগণকে সচেতন করতে দিন-রাত পরিশ্রম ও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। জনগণ যদি সচেতন না হয়, ঘরবন্দি হয়ে না থাকে তাহলে সরকারের নানা ধরনের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে। অনেকেই বলছেন, সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। মানুষকে সচেতন করার  ক্ষেত্রে আইন প্রশাসন কঠোরতার চেয়ে জনগণের বোধগম্যতা ও সচেতনতা বেশি জরুরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনা মেনে চলা, ঘরবন্দি হয়ে থাকলে এ অন্ধকার কেটে যাবে বলে আমরা মনে করি। তবে দেশের প্রতিটি গ্রাম, পাড়া-মহল¬ায় কোভিড-১৯ অর্থাৎ করোনা রোগের উৎস খুঁজে বের করা, রোগীকে আলাদা করা, পরীক্ষা করা, শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে এ ভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। যদিও এ কাজের জন্য পর্যাপ্ত জনবল দরকার। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলায় লকডাউন চললেও বলা যেতে পারে প্রায় সারা দেশেই অঘোষিত লকডাউন চলছে। তবে ঘরবন্দি মানুষ কিছুটা হলেও বিপাকে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষ জীবন ও জীবিকার সংকটের মধ্যে পড়েছে। যান চলাচল বন্ধ। রিকশা-ভ্যান বা অটোরিকশাও চলছে না। গ্রাম ও শহর এলাকায় এসব অসহায় মানুষের জীবন সচল রাখার জন্য সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। চাল-ডাল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি এই দুর্যোগময় মুহূর্তে অসহায় পরিবারের কাছে পৌঁছে  দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ত্রাণ ছাড়াও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন, সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক বিমাসহ সমাজের বিত্তবান মানুষ এ সময় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তারা নগদ অর্থ ও খাদ্যদ্রব্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে জমা দিচ্ছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধ ও অসহায় মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে সরকার অত্যন্ত তৎপর ও করণীয় সবকিছুই করে যাচ্ছে। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, দেশের কোনো কোনো এলাকায় সরকারের ত্রাণসামগ্রী দুস্থ ও অসহায় মানুষ অনেকেই পাচ্ছে না। এ দুঃসময়ে হতদরিদ্রের ত্রাণসামগ্রী লুটপাট হচ্ছে, চুরি হচ্ছে আবার কেউ কেউ গোপনে মজুত করছে। প্রশাসন এ ব্যাপারে তৎপর এবং তাদের অনেককে আটক করছে এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে  দেশবাসি জানতে পারছে। ধরা পড়া বা আটক হওয়া অধিকাংশই সরকারদলীয়  নেতাকর্মী ও ইউপি চেয়ারম্যান এবং সদস্য। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টত জানিয়ে দিয়েছেন, এ দুর্যোগে যারা দুর্নীতি করবে, হতদরিদ্রদের ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ছিনিমিনি  খেলবে তা বরদাস্ত করা হবে না এবং তাদের কোনো ছাড় নেই। আমরাও মনে করি তাদের কঠিন শাস্তি হোক।  যেখানে সরকার ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এ দুর্যোগ মহামারিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন, সেখানে গরিবের ত্রাণ চুরি বা লুটপাট কোনোভাবেই  মেনে নেয়া যায় না। আসুন আমরা ঘরবন্দি হয়ে নিজে বাঁচি এবং পরিবারকে বাঁচাই। একদিন এ অন্ধকার কেটে যাবে। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীর আকাশে করোনায় কালো  মেঘের ছায়া কেটে যাবে। প্রধানমন্ত্রী, বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশনাগুলো মেনে চলি। এতে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র বাঁচবে। পূর্বাশার আলো উদিত হবে। গোটা পৃথিবী এখন নতুন সূর্যোদয়ের প্রত্যাশায়। কবি বলেছেন, ‘মেঘ দেখে করিসনে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ লেখক ঃ শিক্ষক ও কলাম লেখক

 

আরো খবর...