করোনা মহামারী, লুটপাট ও শ্রেণিসংগ্রাম

 ॥ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ॥

মাসপাঁচেক আগে বিনা নোটিশে বিশ্ববাসীর ওপর ‘ঘাতক করোনা’ হামলে পড়েছে। এ ধরনের ভয়াবহ ও সর্বত্রব্যাপ্ত মহামারী সাম্প্রতিককালে আর দেখা যায়নি। ‘অজানা-অচেনা-অদৃশ্য-ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র এই হানাদার ঘাতক ভাইরাসটি আজ সব দেশের সব মানুষের ওপর একসঙ্গে আঘাত  হেনেছে। এটিকে একটি বৈশ্বিক ‘পেনডেমিক’ অর্থাৎ মহাদুর্যোগ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষ আজ মরণভয়ে ভীত, জীবন-জীবিকা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা। এই অতর্কিত হামলার মুখে মানুষ আজ অরক্ষিত ও অসহায়। একাত্তরের ‘হানাদার’ বাহিনীর বিরুদ্ধে দেশবাসীকে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। বর্তমানে দেশবাসীকে ‘নব্য-হানাদার’ করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে জটিল ও কঠিন নতুন আরেকটি যুদ্ধ চালাতে হচ্ছে। এই ঘাতক ভাইরাসের কাছে মানুষ আজ বস্তুত অরক্ষিত ও অসহায়। এর একটি বড় কারণ, এই হামলাকারী ঘাতক শক্তির বৈশিষ্ট্য হলো ‘ছলনাময়ী’ এবং এখনো বহুল পরিমাণে ‘অজানা’।

এই রোগের প্রতিষেধক এবং ওষুধ যে কী, তা এখনো মানুষের জানা নেই। সেজন্য গবেষণা চলছে। তবে সেসব প্রতিষেধক-ওষুধ আবিষ্কার হতে এবং ‘ট্রায়াল’ দিয়ে তা ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত প্রমাণিত হতে আরও অনেক সময় লাগবে। কতদিন লাগবে, সে কথাও কেউ বলতে পারে না। করোনা- পেনডেমিকের কাছে মানুষ তাই এখনো অসহায়। বাঁচার জন্য মানুষকে এখনো প্রধানত ‘দৈহিক দূরত্ব’ বজায়  রেখে চলা, ‘লকডাউন, সাবান দিয়ে ঘন ঘন হাত ধোয়া’ ইত্যাদির মতো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বাঁচার জন্য মানুষকে সমাজের সব শক্তি-সামর্থ্য সমবেত করে, ‘পারস্পরিক যৌথতার’ ভিত্তিতে পরিচালিত কর্মপন্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। গত কয়েক মাসে মানুষ যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে তা থেকে সে আজ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে, ‘একা একা কেউ বাঁচতে পারবে না। বাঁচতে হলে সবাই মিলে একসঙ্গে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে।’ সমগ্র বিশ্ববাসীর মাঝে আজ সেই উপলব্ধি ক্রমাগতভাবে প্রসারিত হচ্ছে। করোনা থেকে বাঁচার চেষ্টার মধ্যদিয়ে ‘বিশ্ব ভ্রাতৃত্ববোধ’, ‘মানবিকতা’, ‘সহমর্মিতা’’, ‘সামাজিক দায়িত্ববোধ’ ইত্যাদির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আজ মানুষের মধ্যে নতুন এক উপলব্ধির জন্ম হচ্ছে। অভিজ্ঞতাই তাকে আজ এ কথা জানিয়ে দিচ্ছে যে, ‘মানব অস্তিত্বের’ সুরক্ষার জন্য আগামী দিনের বিশ্বকে ‘আত্মস্বার্থ কেন্দ্রিক’ ও ‘মুনাফাতাড়িত’ পুঁজিবাদের পথ পরিত্যাগ করে, ‘সামষ্টিক স্বার্থতাড়িত’ ও ‘সমতাভিত্তিক’ ভিন্নতর পথ খুঁজে নিতে হবে। হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু, লাখ লাখ রোগাক্রান্ত মানুষের যন্ত্রণা, কোটি কোটি অসহায় মানুষের দুর্ভোগ ও হাহাকারের মাঝেও মানুষ সাহসের সঙ্গে করোনা-পেনডেমিকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে চলেছে। মানুষের ভেতর মৈত্রী, সংহতি, সৌভ্রাতৃত্ব, সাম্য ইত্যাদি মহৎ অনুভূতি ও চিন্তার বিস্তার ঘটার ফলে করোনা-পেনডেমিকের বিরুদ্ধে তারা আজ লড়াই চালাতে সাহস ও শক্তি পাচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। তাই করোনা সংক্রমণ যদি এ দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে তা হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে খুবই কঠিন। এ ধরনের মহাবিপর্যয় রোধ করা দেশ ও জাতির সামনে এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ। অথচ কিছুসংখ্যক ‘নরপিশাচ’ সে পথ গ্রহণের বদলে, একজন ‘মানুষ’ হিসেবে এই মহাদুর্যোগের সময়টিতে যেটি তার ‘মানবিক’ দায়িত্ব হওয়ার কথা, সে দায়িত্ব পালনের বদলে মানুষের দুর্যোগকালীন অসহায়ত্বের সুযোগে ‘লুটপাটের’ মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে নিজেদের ‘আখের গোছাতে’ ব্যস্ত রয়েছে। একাত্তরে বাংলাদেশে আমরা ‘হানাদার বাহিনীর’ বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। সে সময় কিছু লোক ‘রাজাকারি’ করেছিল। সে সময়ের মতো আজও, ‘নব্যহানাদার’ করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধের এই কঠিন চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে, দেশে একশ্রেণির ‘নব্যরাজাকার’ তৎপর রয়েছে। হিংস্র হায়েনার  লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে, স্বল্পসংখ্যক এই ‘অপশক্তি, আজ তাদের  শ্রেণিগত শোষণ-লুণ্ঠনের মাত্রা বাড়ানোর আয়োজন করছে। মহাদুর্যোগের এই ভয়াবহতার মাঝেও তারা তাদের ‘শ্রেণি- শোষণের’ লালসা বিন্দুমাত্র শিথিল করেনি। বরং তা তারা আরও বাড়িয়েছে। করোনা-মহামারী সর্বত্রব্যাপ্ত জীবনঘাতি ভয়াল পরিস্থিতির মাঝেও এভাবে চলছে ‘মানবীয়’ ও ‘দানবীয়’ শক্তির মধ্যে  শ্রেণি-সংগ্রামের ফল্গুধারা। করোনা মহামারীর কারণে যে অবস্থা আজ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হবেন বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তারা হিসাব করে দেখেছেন যে, গ্রামাঞ্চলের ৮০ লাখ মানুষ এবং শহরাঞ্চলের আরও ১ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ নতুন করে গরিব হবেন (সূত্র : বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক বিনায়ক  সেন)। একটি শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের ফলে এমন হওয়াটিই স্বাভাবিক। এতে অবাক হওয়ার বিশেষ কিছু কারণ নেই। তবে অবাক হওয়ার ও পরিতাপের কথা হলো এই যে, কিছু মানুষ এ বিষয়টিকে দেখেও না দেখার, বুঝেও না বোঝার ভান করে থাকছে। এ রকম ‘অমানবিক’ আচরণের ঘটনা নতুন দেখা যাচ্ছে না। শ্রেণিবিভক্ত সমাজে বারবার এমন ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মৃতদেহ দাফন ও সৎকারের অর্থ লুট করে, বিয়াল্লিশের মন্বন্তরের সময় রিলিফের অর্থ আত্মসাৎ করে, কোরিয়ার যুদ্ধের সময় ‘জুট ব্যাগ’ সাপ্লাইয়ের কন্ট্রাক্টরি করে, মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘হানাদার বাহিনীকে’ মুরগি সাপ্লাই দিয়ে এবং এ ধরনের নানা দুর্যোগের সময় মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে, কারা কারা কীভাবে কীভাবে  বেপরোয়া লুটপাট চালিয়ে রাতারাতি বিশাল ‘টাকার পাহাড়’ গড়ে তুলতে পেরেছিল, সে কাহিনি অজানা নয়।  শ্রেণিবিভক্ত সমাজে কখনই শ্রেণি-সংগ্রাম বিরত থাকে না। একই রূপ নিয়ে না হলেও, বৈচিত্র্যপূর্ণ নানারূপে তার প্রকাশ ঘটে। তার অস্তিত্ব সব সময় সবার নজরে আসে না। তবে একটু ভালো করে নজর দিলে বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে, কোনো না  কোনো শ্রেণি-সংগ্রামের অস্তিত্বের উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। এ ধরনের দু-একটি ঘটনার কথা এখানে তুলে ধরছি। ১৯৮২ সালের কথা। সে বছর ১৮ মার্চ ‘বাংলাদেশ  ক্ষেতমজুর সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই সংগঠনের নেতৃত্বের দায়িত্ব নিয়ে আমি গ্রামাঞ্চলের ক্ষেতমজুরদের মধ্যে সরাসরি কাজে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলাম। ‘ক্ষেতমজুর সমিতির’ প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটিতে  বেশ কিছুসংখ্যক ক্ষেতমজুর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ঠাকুরগাঁও জেলার সেতাবগঞ্জের কমরেড ইমাজউদ্দিন। তিনি কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। তার সঙ্গে আগেই আমার ঘনিষ্ঠতা ছিল। সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথম সভায় যোগ দিতে তিনি দুই দিনের জন্য ঢাকা এসেছিলেন। সেই সভায় ক্ষেতমজুরদের অবস্থা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার গ্রামের কোনো  জোতদার-বড়লোক যখন ঢাকায় আসেন তখন তার মেয়ে আবদার করে তাকে বলে, ‘আব্বা, তয় মোর জন্যি কি নিয়া আসবু।’ আর আমি এবার ঢাকায় রওনা দেওয়ার সময় আমার মেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘আব্বা, তয়  মোর জন্যি কি থুয়া (রেখে)গেলু।’  ক্ষেতমজুর ইমাজউদ্দিন ছিলেন ‘দিন আনি দিন খাওয়া’ একজন দরিদ্র খেটে খাওয়া মানুষ। ঢাকায় গেলে সে দুই দিন কাজ করতে পারবে না। ফলে দুদিন তার পরিবারের  কোনো আয়-উপার্জনের উৎস থাকবে না। সে কারণে, দুদিন তাদের ঘরে খাবারও হয়তো জুটবে না। ইমাজউদ্দিনকে বিদায়  দেওয়ার সময় তার মেয়ে তাই তাকে সেই প্রশ্নই করেছিল। ভিন্ন ভিন্ন দুই শ্রেণির দুই পিতার দুই সন্তানের মুখে তাদের ‘আব্বার’ কাছে ছিল বিপরীত ধরনের দুরকম প্রশ্নÑ ‘কি নিয়া আসবু’ আর ‘কি থুয়া গেলু’! সমাজে শ্রেণিবিভাজন ও  শ্রেণিদ্বন্দ প্রকাশিত হওয়ার এটি একটি অতি সাধারণ দৃষ্টান্ত। আরেকটি প্রসঙ্গের কথা বলি। আশ্বিন-কার্তিক মাসের কর্মহীন অনাহারী দিনগুলো নিয়ে ক্ষেতমজুররা সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকে। এই সময়টাকে তারা ‘মড়া কার্তিক’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে। এই দুটি মাস তারা যেন  কোনোরকমে হলেও বেঁচে-বর্তে পার করতে পারে, সেজন্য  ক্ষেতমজুররা এ সময় সৃষ্টিকর্তার কাছে দিনরাত একান্তভাবে প্রার্থনা করে থাকেন। অন্যদিকে লুটেরা শোষকদের কাছে আশ্বিন-কার্তিক এই দুটি মাস হলো বাড়তি লুটপাটের সুযোগের মাস। তারা সৃষ্টিকর্তার কাছে যে প্রার্থনা করে থাকেন তা হলোÑ আশ্বিন-কার্তিকে যেন গরিব মানুষের দুর্গতি ও অসহায়ত্ব আরও বৃদ্ধি পায়। তা হলে সেই সুযোগে তারা কম দামে গরিবের সম্পদ ‘কিনে নিতে’ অথবা কায়দা করে ‘হাতিয়ে নিতে’ পারবে। আশ্বিন-কার্তিক মাসে একই সৃষ্টিকর্তার কাছে দুই শ্রেণির মানুষের এই যে দুই ধরনের প্রার্থনা করাÑ  িেটই হলো শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রামের প্রকাশ।  দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমান ‘করোনা পেনডেমিকের’ ভয়াবহ ‘সর্বমানবিক’ বিপর্যয়কালে ১ শতাংশ লুটেরা শোষক এবং ৯৯ শতাংশ শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মধ্যে একইরকম  শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও শ্রেণিসংগ্রাম চলছে। করোনা মহামারী বিপর্যয়ের মুখে সরকারিভাবে দুর্গত মানুষের জন্য ‘অনুদান’ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় এক-চতুর্থাংশ মাত্র। কারও ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে এই ‘অনুদানের’ অর্থ জোগান দেওয়া হচ্ছে না। এর প্রায় সবটাই হলো রাষ্ট্রকে দেওয়া জনগণের ট্যাক্স, কর ইত্যাদির টাকা। জনগণের প্রয়োজনে ও তাদের বিপদে-আপদে খরচ করার জন্যই জনগণ রাষ্ট্রকে এই অর্থ দিয়ে  রেখেছে। সহায়তার নামে যে অর্থ বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়েছে  সেটিকে আমরা কোনোক্রমেই ‘আমার বা আমাদের দেওয়া অনুদান’ অথবা ‘খয়রাতি দান’ হিসেবে প্রচার করা অনৈতিক এবং বে-আইনি। ‘ভেড়ার লোম দিয়ে কম্বল তৈরি করে  সেটাই ভেড়াকে অনুদান হিসেবে দান করা’Ñ মর্মে ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে। এটি সে রকমই একটি ব্যাপার। তারপরও ঘটনা হলো, অনুদান হিসেবে  দেওয়া অর্থ বা সামগ্রী যাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তার সবটা তারা পাচ্ছেন না। এর বড় অংশ ‘প্রভাবশালীরা’ চুরি করছে। চলছে দলবাজি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রী এ পরিস্থিতির কথা নিশ্চয়ই জানেন। সে কারণেই তিনি সম্প্রতি ক্ষোভের সঙ্গে জনসমক্ষে বলেছিলেন যে, ‘কাফনের কাপড় বিলি করতে দিলেও তা দিয়ে যে আপনারা অনেকেই নিজের জন্য পাঞ্জাবি বানাবেন, তা আমি জানি।’ দুর্যোগের সময় সম্পদ ‘যার আছে’ তার থেকে ‘যার নেই’ তার কছে প্রবাহিত হবেÑ একটি ন্যূনতম ‘মানবিকতাসম্পন্ন’ সমাজে এমনটিই হওয়া উচিত। কিন্তু ঘটছে ঠিক তার উল্টো। খোঁজখবর থাকলে, ‘ত্রাণ চুরির’ ঘটনা চোখে দেখার সুযোগ আছে। কিন্তু আরও বড়-বড় লুটপাটের ঘটনা ঘটে চলেছে পুঁজিবাদী বাজার ব্যবস্থার ‘আইনি’ চাহিদা-সরবরাহের তথাকথিত স্বয়ংক্রিয় কাঠামোর আড়ালে। এসব লুটপাটের হদিস খালি চোখে পাওয়া যায় না। কীভাবে সেসব ‘ডাকাতির’ ঘটনা ঘটে চলেছে তা সহজে বোঝার সুবিধার্থে কৃষি খাতের লাভ-লোকসান-লুটপাটের একটি সহজ ও ছোট্ট হিসাব এখন এখানে তুলে ধরছি। সরকার ধানের মণপ্রতি দাম ১,০৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে। যদিও ১ মণ ধানের উৎপাদন খরচ এর থেকে বেশি বৈ কম হবে না। তবুও না হয় এই হিসাবকেই সঠিক বলে ধরে নিলাম। করোনা মহামারী আবির্ভাবের পর, দেশের হাওর এলাকার ধান কাটার কাজ ইতোমধ্যে প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ধারণা করা যায় যে, কৃষক এবার হাওর এলাকা থেকে ৩০ লাখ টন তথা ৭৫ লাখ মণেরও বেশি বোরো ধান কেটে তুলতে পারবে। সরকার তার ঘোষিত দামে এখনো কৃষকের কাছ  থেকে ধান কিনছে না। অথচ কৃষকদের, বিশেষত গরিব ও মাঝারি কৃষকদের, এখনই নগদ টাকা দরকার। তাই নগদ টাকার প্রয়োজনে তাদের বাধ্য হয়ে মধ্যস্বত্বভোগী ব্যাপারী-কারবারি-মহাজনের কাছে মণপ্রতি ৪০০ টাকা লোকসান দিয়ে হলেও ৬০০ টাকা দরে ধান বেঁচে দিতে হচ্ছে। এটিই বর্তমানে হাওর এলাকায় ধানের বাজারের অবস্থা। দেশের অন্যত্রও অবস্থা এ রকমই হবে। বাজারকে ‘সিন্ডিকেট শক্তির’ নিয়ন্ত্রণমুক্ত করার জন্য রেডিক্যাল ও বিপ্লবী পদক্ষেপ না নিলে এ রকমই হয়ে থাকবে গোটা দেশে কৃষিপণ্যের বাজার পরিস্থিতির সামগ্রিক চিত্র। উপরোক্ত হিসাব অনুসারে, কেবল হাওর এলাকার কৃষকদের তাদের বোরো ফসলের জন্য এবার (৭৫ লাখ ঢ ৪০০= ৩০০ কোটি) ৩০০ কোটি টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এটি হলো শুধু হাওর এলাকার এবং একটিমাত্র ফসলের ক্ষেত্রে  লোকসানের হিসাব। সারাদেশে এ বছর ধানের মোট উৎপাদন ৩.৯ কোটি টন হওয়ার কথা। এ পরিমাণ হলো হাওরের ধানের পরিমাণের চেয়ে প্রায় ১৩ গুণ। ধানের বাজারে কেনাবেচা ও দরদামের অবস্থা যদি বর্তমানের মতোই থাকে  সে ক্ষেত্রে তা হলে কেবল ধানের আবাদ থেকে সারা বছরে দেশের কৃষকের লোকসানের পরিমাণ হবে (৩০০  কোটি ঢ ১৩)= ৩৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে কৃষকবঞ্চিত হবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা থেকে। এর সঙ্গে অন্যান্য শস্য ও ফসল, শাকসবজি, ফলমূল, দুধ-ডিম ইত্যাদি থেকে অনুরূপ লোকসানের হিসাব যুক্ত করলে অনুমান করা যাবে যে কৃষক সমাজের কাছ থেকে এই বছরে কী পরিমাণ সম্পদ লুটে নেওয়ার আয়োজন করা হচ্ছে। বিভিন্ন দুর্যোগকালে প্রতিবার দেশে ‘দারিদ্র্য’ ও ‘বৈষম্য’ আরও এক ধাপ বেশি মাত্রায় বেড়ে যাওয়ার  যে ঘটনা প্রতিবার ঘটে থাকে তা এবার হতে দেওয়া যাবে না। ‘যার কম আছে’ তার হাত থেকে ‘যার বেশি আছে’ তার কাছে সম্পদ হস্তান্তর তথা লুটেরা শ্রেণির অনুকূলে বর্ধিত মাত্রায় সম্পদের পুনর্বণ্টনের চেষ্টার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ‘বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘুঘু তোমার বধিব পরান!’ এ কথা কার্যকর করার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় এসে গেছে। লেখক ঃ সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

 

আরো খবর...