করোনা মহামারীতে পতিত মনুষ্যত্ব

ধনতান্ত্রিক সমাজ-রাষ্ট্র ব্যবস্থার নির্লজ্জ-উলঙ্গ রূপ আর দানবীয় চরিত্রকে উন্মোচন করে দিয়েছে করোনা ভাইরাস। ছদ্মবেশী কপট গণতন্ত্রের গোপন আর কিছু রইল না। রাষ্ট্র সংঘ আর ধনবাদী বিশ্ব রাষ্ট্রগুলোর সংবিধানে সাধারণ জনগণের মানবাধিকার আর স্বাস্থ্যের অধিকারের বিষয়ে যে বড় বড় বাণী বর্ণিত আছে তা আসলে কাগুজে গপ্পো বই কিছু নয়। করোনা ভাইরাস বা কোভিড দেখিয়েছে সুস্থ থাকার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার কেবল ধনবান আর ক্ষমতাধরদেরই রয়েছে ষোল আনা। যদিও মহাবলবান করোনা শ্রেণিনিরপেক্ষ। ধনী-নির্ধন কাউকে ছাড় দেয় না। ব্যাধি মহামারীতে প্রাচীন ও মধ্যযুগে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগত জনগোষ্ঠী নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আর্কিউলজিক্যাল সার্ভে দেখিয়েছে, প্রাচীন বহু নগরসভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছে অজ্ঞাত কোনো রোগের মহামারী। মাটির তলায় চাপা পড়ে আছে ধ্বংসপ্রাপ্ত সভ্যতা। প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা, বাবিল সভ্যতা, মায়াসভ্যতা, হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো সভ্যতা ধ্বংসের কারণ আজও বিতর্কিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ নাকি অজানা কোনো সংক্রামক ব্যাধি এর পেছনের কার্যকারণ, তা আজও বিতর্কিত। তবে পাল¬া ভারী ব্যাধিরই। কেননা আধুনিক ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা মিসরের প্রাচীন মমি বা  কেনিয়ার মানবদেহের ফসিল বিশে¬ষণ করে মৃত্যুর কারণ অজ্ঞাত ব্যাধিরই কাজ বলে বিশ্বাস করতে চান। ঘনবসতির নগরের প্রতি করোনার বিদ্বেষ অধিক। আপাতত গ্রামগুলো রক্ষিত থাকলেও, অধিককাল তা থাকবে না। উন্নত বিশ্বের কৃষি আর প্রকৃতিনির্ভর গ্রাম বলে কিছু নেই। কৃষকরাও বসবাস করে নগর বিকল্প বাস্তুসভ্যতার আধুনিকতার ভেতর। সমস্যা এখানেই। একুশ শতকের দরিদ্র অনুন্নত দেশের গ্রামগুলোকে উন্নয়নের নামে বিশ্বব্যাংকের অর্থানুকূল্যে ছোট-বড় শহরের সঙ্গে পাকা সড়কের সংযোগ ঘটানো হয়েছে। আসল উদ্দেশ্য উন্নয়ন নয়, শিল্পপতিদের শিল্পপণ্যের বাজার সৃষ্টি। কম খরচে কৃষিপণ্যের নগরযাত্রার সুযোগ তৈরি। একই পথে তখন নাগরিক মরণব্যাধি গ্রামে মাইগ্রেট হয়ে যায়। করোনার বেলায়ও এমনটা ঘটতে পারে। এই প্রথম মানবতা পর্যুদস্ত হলো, মনুষ্যত্বকে গ্রাস করল আতঙ্ক। হাজার বছর ধরে মানব সমাজের অর্জিত মায়া-মমতা-ভালোবাসার হৃদয়বৃত্তিগুলোর পরাজয় ঘটল। মানুষ একাকী হয়ে গেল মর্মান্তিকভাবে। করোনার রোগী! মনে হচ্ছে মানুষ কেন, প্রিয়জন কেন, ঈশ্বরও তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন। মূর্তিমান আতঙ্ক। নাম শুনেই পালাচ্ছে সবাই।  দেশে দেশে কত অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটছে। পে¬গ নিয়ে বিশ্বসাহিত্যে কালজয়ী গল্প-উপন্যাস রচিত হয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে বহু দেশে। আজ হাজার লাখো কোটি মানুষ কেবল ব্যাধি মহামারীতেই সীমাহীন শারীরিক কষ্ট  ভোগ করেই মরছে না, অন্য মানুষের ভালোবাসার বঞ্চনা নিয়েও মরেছে এবং মরবে। সে এক অবিশ্বাস্য বিশ্ববাস্তবতা। এ নিয়েও সাহিত্য হবে। যা ঘটছে এ যেন রূপকথা-বৈজ্ঞানিক কল্পকথার এক বিশ্বকোষ। নেটে ভাইরাস হয়ে ছড়িয়ে পড়া মর্মান্তিক দৃশ্য। বিশ্বের অগণিত দৃষ্টি তাতে আছড়ে পড়েছে। বিহারের এক শ্রমিক যুবক, যুবতী স্ত্রী ও শিশুকন্যাকে দিলি¬ থেকে ট্রেনে তুলে দিয়েছে বাড়ির উদ্দেশে। নিজে রয়ে যায়, অন্তত স্ত্রী-সন্তান করোনার আক্রমণ থেকে বাঁচুক। আসলে যুবতী মা ছিল আক্রান্ত অর্থাৎ করোনা পজিটিভ। কেউ তা বুঝতে পারেনি।  ট্রেনেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। দিন-রাত দীর্ঘ  রেলযাত্রার পর গন্তব্য স্টেশন মোজাফফরপুর প¬াটফর্মে  কোনোক্রমে নেমেই জ্ঞান হারিয়ে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকে। এক সময় তার মৃত্যু ঘটে। অবুঝ ক্ষুধার্ত শিশুকন্যা ঘুমন্ত (মৃত) মাকে জাগাতে চায় গায়ের চাদর টেনে। শত শত যাত্রী আর  রেল কর্তৃপক্ষ কেউ তাকে সহায়তাই করল না। কে এই মর্মান্তিক দৃশ্যের চিত্রগ্রহণ করে নেটে ছড়িয়ে দিল তাও অজ্ঞাত। শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ পেটের দায়ে নিজের রাজ্য  ছেড়ে অন্য রাজ্যে গিয়েছিল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে। এই তার পরিণাম। মানুষ, মনুষ্যত্ব আর মানবতার দৃষ্টান্ত বটে। করোনা এমনি অসংখ্য ঘটনা ঘটিয়েছে এবং ঘটে চলেছে। মনে হবে এটাই সভ্যতার ইতিহাসের বিধান। সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর চিকিৎসাবিহীন মৃত্যু। মৃতদেহ অদৃশ্য। প্রিয়জনরা কিছুতেই জানতে পারল না কবে, কখন ঘটেছে মৃত্যু। কোথায় হয়েছে দাহ বা কবর। দিনক্ষণটা প্রয়োজন পড়ে ধর্মীয় বিধানমতে নানা ক্রিয়ার জন্য। জন্মের সার্টিফিকেট আছে যার, মৃত্যুর ক্ষণ তার অজ্ঞাত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর নিখোঁজ মৃতদেহ পাওয়া গেল অন্য হাসপাতালের মর্গে। মৃতদেহ পড়ে রইল প্রহরের পর প্রহর জীবিত রোগীর ভিড়ের ভেতর। মৃতদেহের হাতে বা পায়ে বেঁধে রাখা নম্বরের কাগজের টুকরো হারিয়ে যায়, লাশ হয়ে যায় অজ্ঞাত-বেওয়ারিশ। লাশের অপেক্ষায় বসে আছে প্রিয়জন মর্গের গেটে, তিন দিন পর জানতে পারে এ নামের কোনো লাশ মর্গে নেই। পেটের দায়ে বেকার মানুষ এক রাজ্য ছেড়ে পাড়ি দেয় অন্য রাজ্যে, যেখানে মজুরি অধিক। করোনার দাপটে হারায় কাজ। লডকাউন। ক্ষুধার ভয়ে ফিরতে চায় আপন রাজ্যের আপন ঘরে। কিন্তু রেল-বাস-বিমান পরিষেবা বন্ধ। ক্ষুধার্ত-ভয়ার্ত হাজার হাজার মানুষ উন্মাদপ্রায় হেঁটে ছুটছে হাজার- দেড় হাজার মাইল দূরের কোনো শহর কিংবা গ্রামে। অবিশ্বাস্য ঘটনা। মনে পড়ে ইরাক কিংবা সিরিয়ার যুদ্ধের কথা। ভয়ার্ত মানুষ ছুটছে সীমান্তের দিকে। মাথার ওপর যুদ্ধবিমান। পেছনে বিদ্রোহী সেনাবাহিনী। রাস্তায় ঠান্ডায়, ক্ষুধায়, রোগে পড়ে মরছে মানুষ। জীবিতরা তাদের পরিত্যাগ করে জীবন নিয়ে পালাচ্ছে। ভারতের ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, দিলি¬, কেরেলা থেকে পালাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ত্রিপুরা, আসাম ইত্যাদি দরিদ্র রাজ্যের শ্রমিকরা। সরকারি ভাষায়, ওরা ‘পরিযায়ী’  শ্রমিক। অত্যন্ত অসম্মানজনক নাম। যেন শীতের পাখি, পরিযায়ী পাখি, মানুষ নয়। একমাত্র বাম কমিউনিস্ট সরকারশাসিত কেরেলা সরকারই এদের সম্মান জানিয়েছে ‘অতিথি শ্রমিক’ নামে  ডেকে। এই শ্রমিকদের দলে ছিল অসংখ্য করোনা আক্রান্ত শ্রমিক। লকডাউন ঘোষণার আগে শেষ ট্রেনযাত্রায় হাজার হাজার শ্রমিকের ভেতর ট্রেনের ভেতর ক্ষুধা-পিপাসায় কিংবা বিনা চিকিৎসায় অসহায় অবস্থায় অনেকে মরেছে। লাশের সঙ্গে জীবিতরাও ছুটে চলেছে। এ যেন দু-তিন দিনের বিরামহীন রেলযাত্রা। মৃত্যুযাত্রা। নরকযাত্রা। এমন ঘটনাও ঘটেছে উত্তরপ্রদেশে। ঘরে ফেরা শ্রমিকদের সঙ্গে মৃত শ্রমিকের দেহও বাসে তুলে দেয় পুলিশ। কেননা করোনার মৃতদেহ। বাসের ভেতর পচন ধরা লাশ। জীবিত মানুষ। মৃত মানুষ আর জীবিত মানুষের এমন সহযাত্রা কবে  দেখেছে মানুষ? এমন মানুষের ভেতর কেবল অবাঙালি নয়, বাঙালি শ্রমিকও ছিল। এমন বাঙালি শ্রমিকও ছিল যাদের পূর্বপুরুষ ১৯৪৭ সালে  দেশভাগের শিকার পূর্ববঙ্গের মানুষ। ছিল এমনো শ্রমিক, একাত্তরে যারা খুব ছোটবেলায় বাংলাদেশের যুদ্ধতাড়িত পরিবারের মানুষ। এমন হতভাগ্যরা গ্রামে ফিরেও ঘরে ফিরতে পারেনি। গ্রামের মানুষ তাদের পথরোধ করে করোনা  রোগী সন্দেহে। কোনো মায়া নেই, মমতা নেই। তাদের আশ্রয় নিতে হয় কোনো স্কুলঘরে। ঝড়-বৃষ্টিতে কেউ বা শ্মশানের নির্জন ভয়াল-অন্ধকার বিশ্রামগৃহে। অবিশ্বাস্য সত্য  যে, স্ত্রী-সন্তানের মুখের আহার জোগাতে চলে যায় দূর, বহু দূরে, অমানুষিক শ্রম দিয়ে টাকা পাঠিয়েছে সংসারে, সেই সংসারের স্ত্রী-সন্তানরা ঘরে ফেরা মানুষটিকে বাড়ি ঢুকতে  দেয়নি। পড়শিদের বাধা আর করোনার ভয়। করোনা ভাইরাস প্রিয় মানুষের বুক থেকে কেড়ে নিয়েছে ভালোবাসা, মায়া-মমতা-মনুষ্যত্ব। কেননা করোনাভীতি আর মৃত্যু আতঙ্ক প্রিয় মানুষকে এতটা অসহায় করে দেয় যে, ঘরে ফেরা মানুষটিকে গ্রহণ করা, করুণা দেখানো যেন পাপ। কী অসহায় মানবিকতা। কে না জানে পেটের দায়েই মানুষ ঘর ছাড়ে, দেশ ছেড়ে পরবাসী হয়। হোক তা একই দেশের ভেতর দূর জেলা বা ইউরোপ-আমেরিকা। আধা শিক্ষিত বা অশিক্ষিতরা আমেরিকা যায় রুটির লোভে। আর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার যায় পাকোরার (ডালের বড়া) লোভে। একমাত্র গবেষণা বা উচ্চশিক্ষা নিয়ে দেশে ফেরে যারা তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এটা  তো সত্য, আমাদের দেশে উন্নত বিশ্বের কেউ শিক্ষার জন্যও আসে না, চাকরির জন্যও নয়। আমরা পিছিয়ে পড়া দরিদ্র  দেশের নাগরিক। এটা তো বাস্তব সত্য। করোনায় মৃত্যুর অন্যান্য কারণ এবং কার্যের সঙ্গে দারিদ্র অতি অবশ্যই একটি। ধনী দেশে দরিদ্রদের মৃত্যুর হার অধিক। কেননা ওরা পুষ্টিহীন, স্বাস্থ্য অসচেতন। ঘনবসতির ঘিঞ্চি ঘরে বাস করে ওরা। আর রয়েছে সামাজিক-রাষ্ট্রীয়  বৈষম্য বর্ণবাদ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে করোনা আক্রান্ত এবং মৃত্যুহার অধিক। জীবনের গড় আয়ু বেশি, বৃদ্ধের সংখ্যা অধিক। করোনা বৃদ্ধদেরই সহজে আক্রান্ত করে। বাঙালিদের মধ্যে করোনায় মৃত্যুর হার কম। কেননা বৃদ্ধ হওয়ার আগে ওরা কবর বা শ্মশানে চলে যায়। বৃদ্ধের সংখ্যা এমনিতে কম। অন্যদিকে আমেরিকা হচ্ছে কাগজে বর্ণিত সাম্য-স্বাধীনতা-গণতন্ত্রের দেশ। বাস্তবে তার উল্টো। বর্তমান রাষ্ট্রপ্রধান ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেছেন বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গদের  ভোটে জিতে। এশীয় অভিবাসীদের দেশ থেকে দাবড়িয়ে  খেদানোর অঙ্গীকার করে। করোনা ভাইরাস তাকে সহায়তা করছে। তাই প্রায় বিনা চিকিৎসায় মরছে কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকানরা আর এশীয়রা। বাংলাদেশি আর ভারতীয়দের মৃত্যুহার অধিক। গৃহযুদ্ধ চলাকালীন আমেরিকান সৈন্যদের গণহত্যার শিকার হলো রেড ইন্ডিয়ানরা আর আদিবাসী ইনকারা। গণহত্যার নায়ক কর্নেল জেনারেলদের কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় পর্যন্ত তুললেন না গণতন্ত্র আর মানবতার মানসপুত্র আব্রাহাম লিঙ্কন থেকে জর্জ ওয়াশিংটন পর্যন্ত। আমাদের  কোমলমতি শিশুদের পড়ানো হয় আমেরিকা, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা আবিষ্কারকদের নাম এবং ধন্য ধন্য ধ্বনি দিতে শিখানো হয়। এটা শেখানো হয় না এই সমুদ্রযাত্রী কিংবা নাবিকরা আসলে ছদ্মবেশী খুনি লুটেরা জলদস্যু। তারা ছিল বাণিজ্যিকশ্রেণি আর উপনিবেশ স্থাপনকারীদের ভাড়াটে দস্যু। যেমন ভাস্কোদাগামা। মোট কথা কৃষ্ণাঙ্গ অভিবাসী হোক কিংবা দেশের দরিদ্র মানুষই হোক, করোনা ভাইরাস এসে পুঁজিবাদী সমাজকে উলঙ্গ করে তার আসল চেহারাটা দেখিয়ে দিল। কোথায় রইল মানুষের গণতন্ত্র, সাম্য আর স্বাধীনতা? পচনশীল এই পুঁজিবাদ তার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে বিশ্বে। মানবতা, মনুষ্যত্ব, মানুষের বাঁচার অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকার যে একটা ফাঁকা বুলি তা দেখিয়ে দিল করোনা মহামারী। তাই করোনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জারি রাখলে চলবে না, রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখতেই হবে।  লেখক ঃ কথাশিল্পী

 

 

আরো খবর...