করোনা টিকা আর অগ্রাধিকারের প্রতিশ্র“তি

করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির উপায় কী? আপাতত সর্বজনগ্রাহ্য উত্তরÑ ভ্যাকসিন। যার পরিভাষা- টিকা। চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ঘাম ঝরে যাচ্ছে সেই ভ্যাকসিন আবিষ্কারে। উহানে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিষেধক হিসেবে টিকা, ওষুধ, প্লাজমা থেরাপি, হার্ড ইমিউনিটি অনেক কিছুর কথা শোনা গেছে। টানা সাত মাস চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের প্রাণপাত করা চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত মুক্তির আলো হিসেবে দেখা যাচ্ছে ভ্যাকসিনকে। আর সেই ভ্যাকসিন  তৈরির দৌড় শুরু করছে অনেক দেশ। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষও করেছে কয়েকটা  দেশ। তবে সবার আগে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শেষ করে সাফল্য দাবির ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মেয়ে শরীরে ভ্যাকসিন নিয়েছেন।  তেমন ঘোষণাও এসেছে। তবে ভ্যাকসিন তৈরির দৌড়ে এগিয়ে থাকার ঘোষণাটা মূলত রাজনৈতিক এবং অবশ্যই বাণিজ্যিক। ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তেমনটা মনে করছেন অনেকে। রুশ ভ্যাকসিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কতটা সফল তার অনেক কিছুই অজানা খোদ বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার। তবে করোনা মহামারীর এই সংকটকালে রুশ ভ্যাকসিন সত্যি মানুষের মনে স্বস্তি আর আশার আলো নিয়ে এসেছে। তবে করোনা নিয়ে এখনো অস্বস্তিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষ। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা সেটা আবারও বলল, করোনা সংক্রমণ কমলেও ব্যতিক্রম এই অঞ্চল। আতঙ্ক আর হতাশার মাঝে এ অঞ্চলের মানুষ তাকিয়ে আছে কবে ভ্যাকসিন পাবে তারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষ থামছেই না। পাশাপাশি বইছে ভ্যাকসিন নিয়ে আশা আর প্রতিশ্র“তির বন্যা। যে উহান এই করোনা ভাইরাসের জন্মভূমি সেই চীনা বিশেষজ্ঞরাও এসে গেছেন বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথ বাতলে দিতে! এ দেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে চীনা বিশেষজ্ঞরা যা বলে গেছেন তার সঙ্গে এখনো বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তারা প্রতিশ্র“তি দিয়ে গেছেন, চীনে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। কেউ  কেউ এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, চীনা ভ্যাকসিনের কিছু ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বাংলাদেশে হবে। কিন্তু কবে? এর সান্তনাসূচক উত্তরÑ ‘না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হওয়া ভালো।’ তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রাণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্তাদের সাম্প্রতিক বক্তব্যে মনে হয়, ওই কথাটাও বলা এখন আর সহজ নয়। তবে প্রতিশ্র“তি শুধু চীন নয়। দিনকয়েক আগে ভারতও দিল। ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা খুব নীরবে ঢাকা সফরে এসে সরবে বলে গেলেন, ভারতের করোনা ভ্যাকসিনে অগ্রাধিকার পাবে বাংলাদেশ। মহামারী বিধ্বস্ত এই সময়ে, তুমুল অনিশ্চয়তা  যেখানে চিকিৎসা নিয়ে, সেখানে কার সঙ্গে কার রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সেই দ্বন্দ্বে কার কী লাভ-ক্ষতি হবে, সেটা দূরে সরিয়ে রেখে এসব প্রতিশ্র“তি এখন আমাদের আশার মন্ত্র। প্রতিষেধক টিকার দুনিয়ার পরশমণি হলো হার্ড ইমিউনিটি বা গোষ্ঠী প্রতিরোধ ক্ষমতাÑ এমন একটা অবস্থায় পৌঁছানো, যেখানে জনগোষ্ঠীর অধিকাংশের ক্ষমতার মধ্যেই সংক্রমণটির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোষ্ঠী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জনগোষ্ঠীর ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ লোককে টিকা দেওয়া প্রয়োজন। পৃথিবীর সব দেশে, সব সমাজে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সব ধরনের টিকা দেওয়া সম্ভব নয়। যেমনÑ সদ্যোজাত শিশু, কম বয়সী শিশু, নির্দিষ্ট কিছু রোগে ভোগা মানুষ। তবে গোষ্ঠী প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলে এদেরও সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। দুনিয়াজুড়ে বিজ্ঞানী আর বিশেষজ্ঞরা কোভিড-১৯ এর প্রতিষেধকের জন্য প্রাণপাত চেষ্টা চালাচ্ছেন। আর মানুষ ব্যাকুল হয়ে পড়েছে করোনা ভ্যাকসিন পাওয়ার জন্য। তবে এই তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আবার বড় বিপদকে ডেকে আনা না হয়! শঙ্কা কিন্তু থাকছে। ইতিহাসে তেমন নজিরও আছে। ১৯৫৫ সালে  পোলিও নিয়ে সে রকম বিপত্তি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। সে বছর এপ্রিলে দুলাখের  বেশি শিশুকে পোলিও টিকা দেওয়া হয়েছিল। তাতে বড় একটা গন্ডগোল হয়েছিল। যে পদ্ধতিতে টিকা তৈরি হয়েছিল তাতে লাইভ ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করার পদ্ধতিটি কাজ করেনি। এর পরই আসতে শুরু করে দুঃসংবাদ। একের পর এক শিশু পঙ্গু হতে শুরু করে। এখন করোনা ভাইরাসের টিকা বাজারজাতকরণ নিয়ে যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে, তাতে টিকা যে বাজারে আসছে তাতে সন্দেহ  নেই। তবে সেটা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কতটা সফল তা নিয়ে সংশয় থাকতেই পারে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রাথমিক পর্যায়ে সফল টিকা আবিষ্কারের দৌড়ে থাকা প্রায় সব দেশ। তবে গবেষণার কোনো একটা ধাপে সাফল্যের খবর আর কার্যকর প্রতিষেধক তৈরির মাঝে বড় ফারাক। ট্রায়াল হয় সুস্থ স্বেচ্ছাসেবীদের শরীরে। আর টিকা প্রয়োগ করা হবে সুস্থ, অসুস্থ সবার শরীরে। আবার আবিষ্কারে সফল হবে যে টিকা, তা কতদিন কার্যকর থাকবে, বিশ^জুড়ে কতশত কোটি ডোজ প্রয়োজন হবে, প্রতিবছর কত টিকা তৈরি করতে হবে, এ রকম জটিল অনেক সমীকরণের মধ্যদিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে করোনা টিকা আবিষ্কার প্রক্রিয়া। তা ছাড়া এসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিপুল অঙ্কের খরচ। তাই আমরা যদি ভাবি করোনা ভাইরাস টিকা বাজারে এলেই যুদ্ধ জয় সম্ভব হবে, সেটা ভিত্তিহীন আশাবাদ। বিশেষ করে আমাদের মতো দেশের মানুষের জন্য। সবাই আমাদের প্রতিশ্র“তি দিচ্ছে, টিকা আবিষ্কার হলে বাংলাদেশ অগ্রাধিকার পাবে। হ্যাঁ, পাবে। কিন্তু তাতে সাধারণ মানুষ বা রোগীরা কতটা লাভবান হবেন? টিকা আবিষ্কারের পর তা  জোগাড়ে আমরা কি প্রস্তুত? সবশেষ প্রতিশ্র“তি দিয়েছে ভারত। তারা এরই মধ্যে অক্সফোর্ডের অ্যাস্টাজেনের সঙ্গে চুক্তি করেছে। তারা যদি টিকা আবিষ্কারে সফল হয়, তা হলে ২০২১-এর মধ্যে ভারতে তারা ১শ কোটি টিকা রপ্তানি করবে। ভারত পেল। ভারতীয়  কোম্পানি টিকা আবিষ্কারও করল। কিন্তু যতই অগ্রাধিকার দেওয়া হোক বাংলাদেশকে, ভারত কেন, অন্য কোনো দেশই কি নিজের দেশের মানুষকে টিকা না দিয়ে অন্য দেশের জনগণের জন্য টিকা পাঠাবে? কারও অগ্রাধিকারের প্রতিশ্র“তির ওপর বিশ^াস রেখে বসে না থেকে বাংলাদেশ যদি টিকা আমদানি করতে যায়, সেখানে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে। সে আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। চীন-ভারত সম্পর্ক, ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বাজারে করোনা টিকার জোগান কীভাবে হবে সেটাও বড় এক প্রশ্ন। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন সব বাধা-বিপত্তি  পেরিয়ে যদি করোনা টিকা বাংলাদেশের বাজারে ঢুকে পড়ে, তা হলে  সেটা গরিব মানুষের থাকবে? আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু নেই। গরিবের জন্য আর পাঁচটা অসুবিধার মতো এই করোনা টিকা পাওয়াও বড় একটা অসুবিধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এটা বড়লোকদের টিকা হয়ে যাবে না তো? করোনা ভাইরাস বাংলাদেশে সংক্রমিত হতে শুরু করার পর থেকে বিলাপে-দৈব্য-বিশ^াসী বাঙালি জনমানসে আত্মনিয়ন্ত্রণহীন কপাল-চাপড়ানো রূপ কিন্তু দেখা  গেছে। করোনা টেস্ট করাতেই অনীহা গরিব সাধারণ মানুষের। তাদের অনেকের বিশ^াস, করোনা তাদের করুণা করছে। এই রোগটা বড়লোকদের। বিত্তবানরাই মরছেন বেশি। কৃষক-শ্রমিক-খেটে খাওয়া মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে না। এ রকম একটা ধারণা নিয়ে জীবনযাপনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারও তোয়াক্কা করছেন না তারা। আক্রান্ত হলে হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না! কারণ তারা বিশ^াস করতে শুরু করেছেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেলে কেউ জীবিত ফিরছেন না! করোনা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিন সরকার কেন বন্ধ করে দিল তাও পরিষ্কার বোঝা গেল না! বরং জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, সরকার  বোধহয় তথ্য লুকাতে করোনা বুলেটিন বন্ধ করেছে! সেই বিশ^াস আরও দৃঢ় ভিত্তি  পেয়ে যায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কথায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বদলে, স্বাস্থ্য খাত নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির রোজকার খবরে। করোনা মহামারীগ্রস্ত নগর, শহর, গঞ্জ, জনপদের মানুষ বিভ্রান্ত নাকি ভাগ্যে বিশ^াসী হয়ে নেতিয়ে পড়েছেন! এদের মনে সাহস আর বিশ^াসের আপাতত একটাই ওষুধ। ভ্যাকসিন বা টিকা। কবে বাংলাদেশের জনগণ পাবেন সেই টিকা? আবিষ্কারের পর হাত পাতলেই টিকা পাওয়া যাবে না। প্রক্রিয়াটা দীর্ঘসূত্র। ভ্যাকসিন পাওয়ার ব্যাপারে রাজনৈতিক-কূটনৈতিক-বাণিজ্যিক চাপান-উতোরের উপাদান আছে। কিন্তু বহু কাঙ্খিত সেই ভ্যাকসিন পেতে যদি অতিবিলম্ব হয় তা হবে বঞ্চনার শামিল। তাতে ঝরে যেতে পারে আরও অনেক প্রাণ। করোনা ভাইরাসের টিকা তৈরির সাধ্য আমাদের আছে কি না সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে টিকা পাওয়া আমাদের সাধ্যায়াত্ত কিনা সে ব্যাপারেও পরিষ্কার কোনো বক্তব্য নেই। বরং বিভ্রান্তি ছড়ানো বক্তব্য আসছে  খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছ থেকে। ‘করোনা এমনিই চলে যাবে। ভ্যাকসিন লাগবে কি না বলা যাচ্ছে না।’ অদৃশ্য ঘাতক করোনা কীভাবে দাঁত বসিয়েছে সুস্থ সমাজে  সেটা মনে হয় মন্ত্রী বুঝতে পারছেন না! সংক্রমণের এই মহামারীকালে জনস্বাস্থ্যবান্ধব মন্ত্রীর মতো কর্মতৎপরতা না দেখাতে পারেন, গণপরিসরে নিজেকে দায়িত্বহীন ব্যক্তি হিসেবে হাজির করবেন না। তাতে করোনাকালে আর্তের অবহেলার দায়টা সরকারের ওপর চেপে বসবে, যা কোনোভাবে কাম্য হতে পারে না। লেখক ঃ সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক

 

 

 

আরো খবর...