করোনা জয় ও মানবতা

॥ কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ ॥

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বা কোভিড-১৯ থেকে নিজে বাঁচতে এবং অন্যদের বাঁচাতে, সবাইকে অন্য সব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। কিন্তু কিছু মানুষকে এ বিষয়ে মোটা বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে উদাসীন থাকতে দেখা যায়। তবে অসংখ্য মানুষ আছে যারা আলাদা থাকতে পারে না, কেননা তাদের পেটের তাগিদে কাজ করতে হয় অথবা বিভিন্ন সেবাব্যবস্থা চালু রাখতে তাদের কাজ করতে হয় বা কাজ করতে বাধ্য করা হয়। এছাড়াও এসব মানুষ চাইলেও আলাদা থাকতে পারে না। তাদের সেরকম বসবাসের ব্যবস্থা নাই। ছোটো ঘর থাকে অনেকে। উদাহরণ বাংলাদেশের গ্রাম এলাকায় এরকম অসংখ্য খানা আছে আর ঢাকা এবং অন্যান্য শহরে বস্তির কথা বলাই বাহুল্য। করোনার রোধকল্পে সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা একটি অতি জরুরি শর্ত, তাই এসব দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকা মানুষের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। এ ছাড়া সাধারণত এসব মানুষ অহরহ নানা রোগ ও পুষ্টির অভাবে শারীরিক দুর্বলতায় ভোগে, ফলে করোনা ধরলে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা স্বল্পই থাকে। আর করোনাকালে তাদের খাদ্য প্রাপ্তি আরো দুর্লভ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে অর্থ-সম্পদে, সামাজিক অবস্থানে এবং ক্ষমতায় যারা এগিয়ে তারা নিজেদেরকে যথাযথভাবে আলাদা রাখা ও করোনা থেকে বাঁচাতে অন্যান্য করণীয় ও বর্জনীয় পালন করতে পারেন এবং করছেনও। করোনাকালে তাদের পুষ্টিকর খাবার প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। অনেকে এই সময় খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বেশি পরিমাণে সংগ্রহ করে রেখেছেন অন্যায়ভাবে। যদিও করোনা যাকে পায় তাকে ধরে কোনো বিচার ছাড়াই। আর্থসামাজিক দুর্বলতার শিকার যারা, তারাই উপর্যুক্ত বিভিন্ন কারণে ভাইরাসটির সামনে পড়েন বেশি। ফলে আক্রান্ত হন বেশি, মৃত্যুবরণ করেন বেশি। এই উপসংহার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রাপ্ত সংশ্লিষ্ট তথ্য থেকে উঠে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা আফ্রিকান-আমেরিকান, ল্যাটিনো এবং অন্যান্য অভিবাসী মানুষ দেশের মোট জনসংখ্যায় তাদের অনুপাতের চেয়ে অনেক বশি হারে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মৃত্যুবরণ করছেন। এরাই স্বাস্থ্যসেবা (বিশেষ করে নার্স ও অন্যান্য সহকারী) এবং পরিবহনসেবাসহ দেশের সব সেবাব্যবস্থায় ব্যাপকভাবে কর্মরত এসব কাজ করোনাকালে চালু রাখা জরুরি এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিশেষ করে অধিক করোনা আক্রান্ত এলাকায় (যেমন নিউ ইয়র্ক) সংশ্লিষ্টদেরকে এখন সম্মুখসমরে আরো বেশি পরিশ্রম করেতে হচ্ছে; তাদের অনেকে করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন। বৈষম্যের যে বাস্তবতা বাহ্যিক চাকচিক্যের আড়ালে ছিল তা এখন নগ্নভাবে উন্মোচিত। যুক্তরাজ্যে একই রকম কারণে একই রকম ঘটছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে প্রকাশ। এখানে দুর্ভাগাদের মধ্যে প্রথম সারিতে আছেন স্বল্পোন্নত এবং উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশ থেকে ভাগ্য গড়ার লক্ষ্যে আসা মানুষ। আসি বাংলাদেশের কথায়। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রুত বাড়লেও এখনো অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র বা স্বল্প আয়ের। এসব মানুষের ব্যাপক অংশের পারিবারিক অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে করোনার আগ্রাসনের কারণে। অসংখ্য পিছিয়ে থাকা ও খেটে খাওয়া মানুষের এখন কর্মসংস্থান নাই, আয়ের অন্য কোনো উত্স নাই। এদের মধ্যে আছেন প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষক, কৃষি-শ্রমিক, গ্রাম ও শহরের দিনমজুর, গ্রাম ও শহরের রিকশাচালক, মৎস্যজীবী, প্রতিবন্ধী, দলিত, উপকূল ও হাওরে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ, অনানুষ্ঠানিক খাতে কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্প এবং ব্যবসায়-বাণিজ্যে নিয়োজিত উদ্যোক্তা ও কর্মীবৃন্দ, বেসরকারি খাতের চাকরিচ্যুত নিম্নবেতনভুক্ত মানুষ। মোট সংখ্যা এক কথায় বিশাল। সবার কাছে প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও অন্যান্য জরুরি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো এক দুরূহ কর্মযজ্ঞ। এর জন্য প্রয়োজন বিরাট কলেবরের অর্থ ও ত্রাণসামগ্রী এবং তা বিতরণের জন্য যথোপযুক্ত দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। বস্তুত কর্মহীনতা ও সামাজিক সুরক্ষা ভাতার এবং জনসাধারণের জন্য স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক কার্যকর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যসহ উন্নত দেশসমূহ দুর্দশায় নিপতিত মানুষদের যথাযথ সহায়তা দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী সম্প্রসারিত করছে এবং নতুন অর্থায়নের মাধ্যমে ত্রাণ (খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি জীবন রক্ষা সামগ্রী) বিতরণ করছে। তবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ এখনো তা পাচ্ছেন না বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়। খাদ্যের দাবিতে জনগণ একসঙ্গে রাস্তায়ও নেমেছ। এ রকম চলতে থাকলে করোনা সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়বে। অবশ্য এত এত মানুষকে ত্রাণ প্রদান করে তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে সরকারি বিতরণ আরো সমন্বিত, কার্যকর এবং দ্রুততর করার সুযোগ রয়েছে। অবশ্য মানুষকে এই জীবন ধারণ সংকট থেকে উদ্ধার করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত ও সম্পন্ন ব্যক্তিদের মুক্তহস্তে এগিয়ে আসতে হবে। ইতিমধ্যে অনেকেই এক্ষেত্রে কর্মকান্ড শুরু করেছেনÑএটি আরো অনেক ব্যাপক হতে পারে, যদি সম্পন্ন সব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি তাদের সম্ভাব্য সর্বোচ্চ অবদান রাখেন। যে দেশের মানুষ এককাট্টা হয়ে অসীম সাহসে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন করেছে, সেই জাতি নিশ্চয় আবারও সবাই মিলে করোনা জয় করতে নিশ্চয়ই পারবে এবং করবে, ইনশাআল্লাহ। এখানে দুর্নীতিবাজ ও ধান্দাবাজদের কোনো স্থান নেই। যদি কেউ সেই পথ অবলম্বন করে তবে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী তাদেরকে কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্বের সর্বত্র জাতীয় ব্যবস্থা এবং সার্বিকভাবে বিশ্বব্যবস্থা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করবে তাতে আমার সন্দেহ নেই। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এই রূপান্তর কাদের স্বার্থের অনুকূলে এবং কাদের স্বার্থের বিপক্ষে যাবে। নিম্নোক্ত দুইভাবে দেশে দেশে এবং বিশ্ব পর্যায়ে বিবর্তন ঘটতে পারে। করোনাকালে বিশ্বব্যাপী আর্থসামাজিকভাবে বিধ্বস্ত দরিদ্র, পিছিয়ে থাকা এবং স্বল্প আয়ের বিশাল জনসংখ্যা আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আরো অনেক দুর্বল হয়ে পড়বেন। ধনী ও ক্ষমতাবানরা সুযোগ তৈরি করে দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবেন এবং ক্রমে আরো বিত্তবান ও ক্ষমতাবান হয়ে উঠবেন। তদুপরি তাদের নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ তাদের আরো অপ্রতিরোধ্য করে তুলতে পারে। আর্থসামাজিক এবং সম্পদ ও ক্ষমতাবৈষম্য প্রকটভাবে বাড়বে আন্তর্জাতিকভাবে এবং দেশে দেশে। টেকসই উন্নয়ন কেতাবেই থেকে যাবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের চিন্তা উবে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তন আরো প্রকট আকার ধারণ করে মানবসমাজ এবং গোটা পৃথিবীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে। অন্য ধারা এমন হতে পারে। করোনা ভাইরাস বিশ্বের সব মানুষকে এমনভাবে নাড়া দিয়েছে এবং সর্বত্র ত্রাহি-ত্রাহি অবস্থা বিরাজ করছে। অতীতে সময় সময় মহামারি হয়েছে। তবে সেগুলো বিশ্বের সর্বত্র ব্যাপ্ত ছিল না, বিভিন্ন অঞ্চলে ছিল। সারা বিশ্বে এবারের মতো আন্তর্জাতিক ভ্রমণে বিঘœ ঘটে নাই এবং উত্পাদন ও বণ্টনে বিশৃঙ্খলতা সৃষ্টি হয় নাই। অবশ্য বিভিন্ন মহামারিতে মৃত্যু ঘটেছে ব্যাপক। উদাহরণ :১৯৮১ সালে শুরু হওয়া এইচআইভি/এইডসের কারণে এ পর্যন্ত সাড়ে ৩ কোটির মতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। করোনার মতো আর কোনোটা ছিল না। করোনায় সারা বিশ্বের সর্বত্র সব মানুষ উৎকণ্ঠিত। আবার সব মানুষ (যে কোনো দেশের বা এলাকার, ধনী বা গরিব, ক্ষমতাবান বা ক্ষমতাহীন, জ্ঞানী বা শিক্ষা-দীক্ষাহীন, উদ্যোক্তা বা শ্রমিক, পুঁজির মালিক বা পুঁজিহীন, নারী বা পুরুষ, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বা সাধারণ নাগরিক) মানবতার নিরিখে সমান। এই বোধ সব মানুষের মধ্যে যদি করোনা আগ্রাসন জাগিয়ে তোলে, তাহলে দেশে দেশে, বিশ্ব মাঝারে মানবিকতা ও মানবতার জয় প্রতিষ্ঠিত হবে। টেকসই উন্নয়নের ধারা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্যে সব দেশ কার্যকরভাবে নিজ নিজ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টা চালাবে এবং প্রয়োজনমাফিক জোরদার করবে। উপর্যুক্ত দুই ধারার কোনটি বাস্তবে রূপ পরিগ্রহ করে তা সময়ে জানা যাবে। আমি আশা করব, দ্বিতীয় ধারাটি যেন প্রবর্তিত হবে, কিন্তু সংকট কাটলেই বিরাজমান বৈষম্য যারা সৃষ্টি করেছেন এবং প্রকট থেকে প্রকট করে তুলেছেন তারা স্বরূপে আবির্ভূত হবেন, এমনকি আরো আগ্রাসি হয়ে সব দিক থেকে নিজের আরো আরো উদ্বোধনে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন। কাজেই প্রথম ধারার জয় হবে বলে মনে হয়। শেষ করি মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামার এক বক্তব্য উল্লেখ করে। ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি লিখছিলেন উদারতাবাদের চূড়ান্ত বিজয় ঘটে গেছে, আর কোনো আর্থসামাজিক ব্যবস্থা এই ব্যবস্থাকে হটাতে পারবে না। বেসরকারি খাতই আর্থসামাজিক ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক থাকবে, সরকার হবে একবারেই ছোটো এবং নিয়মনীতি সব শিথিল করে দিয়ে সরকার অর্থনীতিতে কোনো ভূমিকায় থাকবে না। কিন্তু বৈষম্য প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে এবং ক্রমবর্ধমান বিপুলসংখ্যক মানুষ দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন দেখে তিনি মত পালটিয়ে ২০০৪ সালে সরকারকে ফিরিয়ে আনতে বলেন। তবে, এখানে প্রশ্ন হচ্ছ যে, সরকারের হাত সম্প্রসারিত হলেই কি বাস্তবতার পরিবর্তন হবে? আসলে দরকার মানবহিতৈষী মানুষের সরকার। যা-ই হোক, বাস্তবতা হচ্ছে, অন্য কার কী হচ্ছে তার কোনো বিবেচনা না রেখে ব্যক্তিপর্যায়ে আরো আরো উচ্চতায় যেতে হবে এই ধারণায় নিবিষ্ট নব্য উদারতাবাদ শনৈ শনৈ করে এগিয়ে চলে। এই প্রক্রিয়ার আগ্রাসি কর্মকান্ডের ফলে ২০০৮ সালে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় ধস নামে এবং বিশ্বমন্দা সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেই অবস্থা সত্ত্বেও নব্য উদারতাবাদ সাময়িক সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ায় এবং এগিয়ে চলে। পাশাপাশি, কোনো কোনো দেশেকে সময় সময় বাম রাজনীতির দিকে ঝুঁকতে দেখা গেলেও, অগ্রগতি হয়নি। নব্য উদারতাবাদের ধারক ও বাহকদের মানসিকতায় পরিবর্তন আসবে কি? লেখক ঃ অর্থনীতিবিদ

 

 

আরো খবর...