করোনা চিকিতসায় ব্যবস্থা ও অব্যবস্থাপনা

করোনা মহামারীতে মানুষ জীবন ও জীবিকা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। এই মহাসংকটে আমরা দিন দিন হতাশ হয়ে যাচ্ছি। আর এই হতাশা এবং দুশ্চিন্তা থেকে উত্তরণে স্বাস্থ্য খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় শুনতে পাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়ে নানা সমালোচনা। এ ছাড়া রয়েছে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। করোনায় বাংলাদেশ এক কঠিন সময় অতিবাহিত করছে। কখন এই মহামারী সমাপ্তি হবে, কেউই আমরা বলতে পারছি না। তার পরও এই করোনা ভাইরাস থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য সরকার প্রধান নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ, সাধারণ ছুটি ঘোষণা এবং দরিদ্র ও অবহেলিত মানুষকে ত্রাণ সহযোগিতার পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য নিয়েছেন বিভিন্ন কর্মসূচি। করোনা সংকট মোকাবিলায় দ্রুত যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা চিকিৎসায় ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মীর সুরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে ত্বরান্বিত করছে। সর্বদা তিনি চিকিৎসকদের অনুপ্রাণিত করছেন। এ ছাড়া এই দুর্যোগ মোকাবিলায় চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, নার্সসহ, যেসব পরিছন্নতাকর্মী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিচ্ছেন তাদের সবাইকে পুরস্কৃত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। করোনা সংকট মোকাবিলায় গত ৪ মে দুই হাজার চিকিৎসক এবং ৭  মে পাঁচ হাজার ৫৪ নার্স এবং অনেক মেডিক্যাল  টেকনোলজিস্ট নিয়োগ দেয় সরকার। শুরুতে স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত সম্মুখযোদ্ধাদের জন্য যথাসময়ে পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) সরবরাহ করা নিয়ে সমস্যা হলেও পরে তা ভালোভাবেই সমন্বয় করা হয়। করোনা চিকিৎসায় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কমিউনিটি ক্লিনিকও গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় ভালো কাজ করছে। এ ছাড়া করোনা মোকাবিলায় তার ৩১ দফা প্রস্তাব জনসাধারণের কাছে প্রশংসিত হয়েছে, যা করোনা প্রতিরোধে বেশ কার্যকরী ভূমিকা  রেখেছে। তিনি দিন-রাত করোনা মোকাবিলায় কাজ করছে। কিন্তু স্বাস্থ্যসংশি¬ষ্ট বিভাগগুলো তেমন কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। যদি তারাও প্রধানমন্ত্রীর মতো তৎপর থাকত, তা হলেই করোনা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সহজ হতো। তাদের মধ্যে রয়েছে নানাবিধ অব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা, যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত  পেয়েছে। কিন্তু করোনা মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ বা উদ্যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম দিকে সরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার দায়িত্বে ছিল, যদিও পরে বেসরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার দায়িত্ব পায়। তার পর শুরু হয় নানা অবহেলা, প্রতারণা, অবৈধ ব্যবসা এবং ভুয়া রিপোর্ট প্রদান ইত্যাদি। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার নামে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। ভুয়া বিলের মাধ্যমে অবৈধ মুনাফা করছে রিজেন্টের মতো হাসপাতালগুলো। এ ছাড়া শত অনুরোধে করোনার টেস্ট ছাড়া ভর্তি করছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, মুমূর্ষু  রোগী নিয়ে স্বজনরা ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে। এক পর্যায়ে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করছেন  রোগী। কিন্তু তারা করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন না। বাংলাদেশে গত ৮ মার্চ প্রথম করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হয়। তার পর দিন দিন বাড়ছে সংক্রমণ, মৃত্যুর মিছিলও লম্বা হচ্ছে। সরকার শুরুতে প্রস্তুতি থাকার কথা বললেও স্বাস্থ্যসংশি¬ষ্ট বিভাগগুলোর প্রস্তুতির অনেক ঘাটতি ছিল বলে মনে হচ্ছে। এ জন্য কিছু মানুষ সুষ্ঠু চিকিৎসার অভাবে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বজন হারানোর কষ্ট- বেদনার কথা তুলে ধরেছেন, প্রকাশ করছেন তাদের ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি। যেমন টেলিভিশন চ্যানেল একাত্তর-এ প্রকাশিত এক ব্যক্তি তিনটি হাসপাতাল ঘুরে কোথায় তিনি ভর্তি হতে পারেননি। অবশেষে তিনি মারা যান, এভাবে আরও অনেক ঘটনা রয়েছে। এই মুহূর্তে শুধু করোনার জন্য নিবেদিত আইসিইউ প্রস্তুত রাখা আছে ১০০ থেকে ১৬০টি, যা সংক্রমণের এই পর্যায়ে করোনা  রোগীর চিকিৎসাসেবার জন্য যথেষ্ট নয়। করোনা পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনা রয়েছে। যে হারে করোনায় মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন,  সে অনুসারে শনাক্তের সুযোগ নেই। দিনে শুধু ১২-১৮ হাজার টেস্ট জনসংখ্যা অনুসারে খুবই কম। দিনে ৫০ হাজার  থেকে এক লাখ টেস্ট করানো সম্ভব হতো তা হলেই করোনার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যেত বলে মনে করছি। ইদানীং নমুনা সংগ্রহ এবং পরীক্ষার সংখ্যা আরও কমে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা শনাক্তের ফি নির্ধারণকে এ জন্য দায়ী করছে। আমি মনে করি, মানুষের করোনা টেস্টের ওপর বিশ্বাস কমেছে। কারণ জেকেজি ও রিজেন্ট যেভাবে বিনা পরীক্ষায় মনগড়া রিপোর্ট দিয়েছে, যা খুবই দুঃখজনক। রিজেন্ট ও জেকেজির ভুয়া রিপোর্টের কারণে বিশ্বে আমাদের মানসম্মান নষ্ট হয়েছে। কারণ ভুয়া কোভিড-১৯ নেগেটিভ রিপোর্ট বিক্রি এবং সেই রিপোর্ট নিয়ে আবার কিছু বাংলাদেশি বিদেশের বিমানবন্দরে ধরা পড়ছেন। কিন্তু তাদের বিমানবন্দরে অবতরণ করতে অনুমতি না দেওয়ায় আবার দেশে ফেরত আসতে হয়েছে, যা  দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে এবং স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনাকে প্রকাশ করে। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমে জানতে পারি, বাংলাদেশের সঙ্গে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত সব ফ্লাইট বাতিল করেছে ইতালি। ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বাংলাদেশ থেকে ইতালিগামী সব ফ্লাইট বা যাত্রী নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই অসাধু ও প্রতারক লোকেরা কীভাবে অনুমোদন পেল, তা নিয়ে সমাজে নানা কথা চলমান। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে মতবিরোধ সংবাদপত্রে প্রকাশ পাচ্ছে। এই দুই বিভাগ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিন সমালোচনার খবর প্রকাশ পায়। সাধারণ নাগরিকের মনে কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে, কীভাবে সাবরিনা, সাহেদের মতো প্রতারকদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর করোনা চিকিৎসার অনুমতি দিল! স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়ে নাগরিক সমাজে  নেতিবাচক মন্তব্য রয়েছে এবং তাদের কার্যক্রম মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি বলে মনে করি। আমি মনে করি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। যাতে এ ধরনের অব্যবস্থাপনা না থাকে। এ ছাড়া সাহেদের মতো যাতে আর কেউ করোনার ভুয়া সনদ প্রদানের কথা ভাবতেও না পারে। শুধু সাহেদ বা সাবরিনাকে শাস্তি দিলে হবে না, বরং যারা এ ধরনের প্রতারণার সঙ্গে  যেভাবেই জড়িত থাকুক না কেন, সবাইকে চিহ্নিত করে বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আরেক অব্যবস্থাপনা হলো দেশে ১৫ হাজারের  বেশি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ চলছে অবৈধভাবে। এর মানে, সেগুলোর বৈধ লাইসেন্স নেই। আর যাদের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে, তাদের ওপরও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা তেমন  চোখে পড়ছে না। স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এ কমিটি স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি শনাক্ত করে বিচারের ব্যবস্থা করবে; যা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। দুর্নীতিতে প্রধানমন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি এ ক্ষেত্রে বেশ কার্যকরী ভূমিকা রাখবে। আমি মনে করি, সামরিক হাসপাতালের মতো যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, সরকারি কর্মকর্তা, চিকিৎসক, ব্যাংকার এবং  পোশাক শ্রমিকদের জন্য আলাদা আলাদা পেশাভিত্তিক হাসপাতাল থাকত, তা হলে সরকারের ওপর চিকিৎসার চাপ কমে যেত এবং সরকারি হাসপাতালে সাধারণ নাগরিকদের জন্য বেশি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। এই পেশাভিত্তিক হাসপাতালগুলো নিজস্ব বা সরকারি অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা হবে, পরে তাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা হবে, যা স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে বিশ্বাস করি। তাই এ বিষয়ে সরকারকে  ভেবে দেখার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি। করোনা সংকটে জনস্বাস্থ্য বিরোধী কাজের সব তৎপরতাকে রুখে দিতে না পারলে তা হবে আমাদের জন্য মারাত্মক অব্যবস্থাপনা। সরকার বা সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের এই বিষয়ে যথার্থ এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। লেখক ঃ শিক্ষক ও সাবেক সভাপতিÑ শিক্ষক সমিতি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

আরো খবর...